Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্প সাহেবই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

বেশিরভাগ অভিধান অনুসারে, ‘ট্যারিফ’ বা ‘শুল্ক’ একটি বিশেষ্য পদ এবং এর অর্থ একটি দেশে আমদানির উপর আরোপিত কর। কখনও কখনও রপ্তানির উপরও কর ধার্য করা থাকে।

ট্রাম্প সাহেবই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন
  • ১৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: বেশিরভাগ অভিধান অনুসারে, ‘ট্যারিফ’ বা ‘শুল্ক’ একটি বিশেষ্য পদ এবং এর অর্থ একটি দেশে আমদানির উপর আরোপিত কর। কখনও কখনও রপ্তানির উপরও কর ধার্য করা থাকে। ‘শুল্ক’ শব্দটির ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার দেখা যায় খুব কমই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌজন্যে সেই ব্যতিক্রমী ব্যবহার এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। তিনি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশকে ‘ট্যারিফড’ বা ‘শুল্কবিদ্ধ’ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে দুটি দ্বীপও—হার্ড এবং ম্যাকডোনাল্ড। এই দুই স্থানে পেঙ্গুইনই হল একমাত্র জীবন্ত প্রাণী। সবাই জানে, পেঙ্গুইনরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনও কিছুই রপ্তানি করে না।

Advertisement

সাতটি রাজ্যের আবেশ
ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের উপর আরোপিত চড়া শুল্কই ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলবে’। অর্থাৎ তাঁর ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ (এমএজিএ বা ম্যাগা) স্লোগানকে সার্থক করে তুলবে। ২ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে তিনি শুল্কের একটি তালিকা প্রকাশ করেন। তালিকাটি প্রকাশ হওয়ামাত্রই স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুল্কের এই ‘ক্যালকুলেশনটি’ করা হয়েছিল একটি সহজ সূত্রের উপর ভিত্তি করে। সেটি এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে যে অতিসাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারবে। এক-একটি টার্গেট‍ দেশের জন্য শুল্ক ধার্য করা হয়েছে এই নিয়মে: ওই দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির অর্ধেক পরিমাণকে, টার্গেট দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যত পণ্য রপ্তানি করে তার মূল্য দিয়ে ভাগ করার পর যে ভাগফল দাঁড়ায় সেই পরিমাণ।
২০২৪ সালে দুটি উপকূলের মধ্যবর্তী বিশাল আমেরিকায় চারটি রাজ্যকে বাদ দিলে বাকিটা দখলে রেখেছে ‘রিপাবলিকান রেড’। ২০২৪ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন একটিমাত্র প্রশ্নে ঘুরপাক খেয়েছে—সাতটি সুইং স্টেট অথবা বেশিরভাগ রাজ্যে জিতবেন কে? ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, মিশিগান, নেভাডা, উত্তর ক্যারোলিনা, পেনসিলভেনিয়া এবং উইসকনসিন—এই সাত রাজ্যের সবক’টিতেই জয় পতাকা উড়িয়েছেন। ওইসঙ্গে ৯৩টি ইলেক্টোরাল ভোটও আসে তাঁর ঝুলিতে। আলোচ্যমান সাতটি সুইং স্টেট হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী অঞ্চল। তাদের মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল—শিল্পায়নের গঙ্গাপ্রাপ্তি এবং উচ্চ বেকারত্ব। এছাড়া রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, অভিবাসন এবং শ্বেতাঙ্গ পুরুষ শিল্প-শ্রমিকদের পছন্দসই বিষয়গুলি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা। ট্রাম্প সাহেব ওই সাত রাজ্যেই জয়লাভ করার সুবাদে বিশ্বাস করেন যে, ওই রাজ্যগুলির উদ্বেগের বিষয়সমূহই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়। অতএব তিনি সেগুলির সমাধান করতে বাধ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আট দশকে শ্রম, পণ্য ও পরিষেবার অবাধ চলাচলের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। এই ‘ফ্রি মুভমেন্টের’ দরুন সর্বাধিক উপকৃত দেশটির নাম নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকাই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী এবং সর্বাধিক উদ্ভাবনী ক্ষমতা-দক্ষতাসম্পন্ন দেশ। বিশ্বের সেরা কোম্পানি, সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, সেরা ল্যাবরেটরি এবং সেরা ক্রীড়াবিদ রয়েছে আমেরিকার। মার্কিন ডলার সর্বজনস্বীকৃত এবং এটাই বিশ্বের ‘রিজার্ভ কারেন্সি’। মার্কিন গ্রিন কার্ড এবং মার্কিন পাসপোর্ট হল সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বা ঈর্ষণীয় নথি। চীন এবং ভারতসহ বেশিরভাগ দেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য অংশ বিনিয়োগ করে মার্কিন বন্ডে। তারই ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা রাজকোষ ঘাটতি (ফিসকাল ডেফিসিট) নিয়ে চিন্তিত নয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই সমস্ত ‘সর্বোচ্চ স্বীকৃতি’ তাঁদের জীবনে কোনও মঙ্গল বয়ে আনেনি বলে যাঁরা মন খারাপ করেন, তাঁরা কেবলমাত্র ওই সাতটি রাজ্যের ভোটদাতা। তথ্যের সত্যতাকে ছাপিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু তাঁদের প্রতিই অনুগত।
জোরালো ধাক্কা
কাজকর্মের ক্ষেত্রে মোচড় মারতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কাণ্ড করে বসে আছেন তার ফল সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিভাধর ব্যক্তিদের অভিবাসন বন্ধ না-হলেও, তা শ্লথ হয়ে যাবে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পণ্য বাণিজ্য। ধাক্কা খাবে সরবরাহ শৃঙ্খল। অন্তত সাময়িকভাবেও বিপর্যয় আসবে পরিষেবা বাণিজ্যে। শুল্ক এবং পাল্টা শুল্কের নয়া ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ‘ক্যাপিটাল ফ্লো’ কালহরণ করবে। সোজা কথায়, স্বাভাবিক গতি হারাবে মূলধন। পুঁজিকে অনুসরণ করার কারণে কিছু পরিষেবাও বাধাপ্রাপ্ত হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা নীতির সামনে অনেক উন্নত দেশ প্রশংসনীয় সংযমের পরিচয় দিয়েছে। এটা স্পষ্ট যে ট্রাম্প সাহেব নিজেই বেশ বিভ্রান্ত এবং তিনি ধোঁকাও দিচ্ছেন। তিনি ও আমেরিকার জনগণ—উভয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত ভোগ‌্যপণ্যের উপর চড়া শুল্ক বহন করতে পারবেন না। এই ডামাডোলে সরবরাহ ব্যাহত হবে, দেখা দেবে মুদ্রাস্ফীতি এবং চাকরি খোয়াতে হবে বহু মানুষকে। আমেরিকানরাই ক্ষুব্ধ হবেন। এমনকী, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ বা ‘ম্যাগা-আমেরিকানরাও’ মুদ্রাস্ফীতির আঁচ টের পাবেন। 
হাজার হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই আমেরিকার বড় শহরগুলির রাস্তায় নেমে এসেছেন। এখন মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলে রাস্তায় নেমে আসবেন আরও হাজারে হাজারে নারী-পুরুষ। ধোঁকাবাজি ধরা পড়ে যাওয়া মাত্রই পিছু হটবেন ট্রাম্প সাহেব, যেমনটি তিনি ৯ এপ্রিল করতে বাধ্য হয়েছেন—চীন ছাড়া বাকি সমস্ত দেশের জন্য তাঁকে ‘পজ বাটন’ (সাময়িক বিরতির ঘোষণা) টিপতে হয়েছে। এই গল্পের সামনের দিকে আরও ‘বিস্ময়কর পরিবর্তন’ অপেক্ষা করে আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দুটি জিনিস দেখবেন—‘ম্যাগা-আমেরিকানদের’ প্রতিক্রিয়া কেমন হচ্ছে এবং মার্কিন বন্ডের উপর সুদের হার বিষয়ক বক্ররেখা (ইল্ড কার্ভ অন ইউএস বন্ডস)। যখন এই দুটিই তাঁর বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে দেখবেন, তখন তিনি নির্লজ্জভাবেই তাঁর নীতির উল্টো দিকে হাঁটা লাগাবেন।
জয়ী হবে অর্থনীতি
আমেরিকার আঘাতের লক্ষ্য হয়েও কানাডা ও ইউরোপ রয়েছে গিয়েছে শক্তিশালী, দৃঢ় এবং দায়িত্বশীল। পাল্টা শুল্ক চাপানোর ব্যাপারে চীন কিন্তু অনড়। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক-যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তবে চীন মোটেই পিছু হটবে না। ভারত শুল্ক-যুদ্ধের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ভারত কোনও ভীরুতার পরিচয় দিতে পারে না। ভারত এই ভানও করতে পারে না যে বিশ্ব অর্থনীতির কী হতে পারে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। ভারতকে অবশ্যই একটি অবস্থান নিতে হবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে উরসুলা ভন ডের লেইন, মার্ক কার্নি, কেয়ার স্টারমার এবং আরও কিছু নেতা রয়েছেন—ভারতের উচিত তাঁদের অনুসরণ করা।
ঘোষিত শুল্ক কার্যকর করার উপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্থগিতাদেশ বিশ্বজুড়ে এই আশা জাগিয়েছে যে, তাঁর অর্থনৈতিক বোধবুদ্ধি ফিরবে। তবে, ট্রাম্প সাহেব যদি ‘পজ’ বা ‘বিরতি’ প্রত্যাহার করেন এবং ২ এপ্রিল ঘোষিত শুল্ক আরোপ করেন পুনরায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিকেই ধ্বংস করে দেবেন তিনি। বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ যেটি ঘটতে পারে তা হল—মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, রপ্তানি হ্রাস, ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট (এফপিআই) এবং ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) কমে যাওয়া মিলিয়ে এক করুণ পরিস্থিতি। ভারতকে বেছে নিতে হবে তার বন্ধুদের। নতুন মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে হবে। আর এইভাবেই প্রতিহত করতে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অশুভ প্রয়াসকে। শেষমেশ অর্থনীতির নিয়মই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করবে। বিজয়ের সেই মুহূর্তে পরাজিতের পাশে ভারতকে দাঁড়াতে দেখা যাবে না।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ