দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতি নতুন দিকে বাঁক নিতে শুরু করে। খোলা বাজার অর্থনীতির ধারণা জনপ্রিয় হতেই, বৃহৎ অর্থনীতিগুলির ডাকে তাতে শামিল হয় বহু উন্নয়নশীল দেশও। ভারত দীর্ঘদিন মিশ্র অর্থনীতির বর্ম পরেছিল। অবশেষে ১৯৯১ সালে আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে মুক্ত অর্থনীতির অংশ হতে সম্মত হয়। পুরনো ধ্যানধারণা আঁকড়ে থাকা আরও একাধিক দেশও বাধ্য হয় শেষমেশ এই স্রোতে গা ভাসাতে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথা বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চূড়ান্ত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে স্পেশালাইজেশনের। সিঙ্গল ভার্টিকালি-ইন্টিগ্রেটড ম্যানুফ্যাকচারারদের দিন সত্যিই গত হয়েছে। অতীতে এই ধরনের সংস্থাগুলি একটি ফিনিশড প্রোডাক্ট তৈরির সবক’টি ধাপ একাই সামলাত এবং সুসম্পন্ন করত। তার মধ্যে পণ্যের নকশা তৈরি থেকে যাবতীয় কাঁচামাল জোগাড়, বিভিন্ন পার্টস প্রস্তুত এবং সেসব অ্যাসেম্বল করাসহ সব কাজই পড়ত। প্রযুক্তি খুবই জটিল এবং এক জায়গায় প্রয়োজনীয় সমস্ত দক্ষতার সমাবেশ ঘটানো অসম্ভব। অতএব, পারস্পরিক সহযোগিতার নীতিই আজ উন্নয়নের হাতিয়ার। যে-দেশ যে-ধরনের পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনে উৎকর্ষ অর্জন করেছে সেই দেশকে সেই কাজটিই মন দিয়ে করতে হবে। এরপর চলবে বন্ধুত্বের নীতিতে পারস্পরিক আদান-প্রদান। তাতে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রের সেরা ‘ফিনিশড’ পণ্য ও পরিষেবা কমবেশি উৎপাদনে সক্ষম হবে। এই নীতির মধ্যে স্বচ্ছতা থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলিরও প্রতারিত বা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকার কথা নয়। কিন্তু এই আশঙ্কাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রবল হচ্ছে একাধিক বৃহৎ শক্তির মর্জিতে। তাদের মধ্যে পয়লা নম্বর নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ এতদিন মানিয়েগুছিয়ে চলা সম্ভব হচ্ছিল। ট্রাম্প জমানায় ব্যাপারটা কিছু দেশের জন্য এককথায় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু ফালতু অজুহাতে যেসব দেশকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, ভারত, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি বৃহৎ অর্থনীতি। প্রথমোক্ত দুটি দেশের পণ্য ও পরিষেবার উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে। ট্রাম্প জমানায় এটাই সর্বোচ্চ শুল্ক হার। বস্তুত ব্যাপারটাকে ‘পানিশমেন্টের’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভারতকে এই শাস্তি প্রদানের হেতু কী? ভারত কোনও কথা শুনছে না! হোয়াইট হাউস থেকে বার বার ফতোয়া দেওয়া সত্ত্বেও মোদি সরকার রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ সস্তার খনিজ তেল কিনে চলেছে। তাতে বিপুল আর্থিক লাভ হচ্ছে ভারতের। এই ‘মহা অন্যায়’ ট্রাম্প সাহেব বরদাস্ত করতে রাজি নন। অতএব কিছু তো এক করতেই হবে। শুল্ক-মহাযুদ্ধে অবতীর্ণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের উপর সর্বোচ্চ শুল্ক চাপিয়ে বসে আছেন। অথচ তিনি চেপে যাচ্ছেন, কোন নীতিতে তাঁর ‘মহাশত্রু’ পুতিনের দেশ থেকেই পারমাণবিক শিল্পের জরুরি উপাদানগুলি ক্রয় করছেন! রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহেও রাশিয়া থেকে আমেরিকার ইউরেনিয়াম, হেক্সাফ্লোরাইড, প্যালাডিয়াম এবং নানারকম সার ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি অব্যাহত রয়েছে।


