সম্প্রতি প্রকাশিত (৩১ মার্চ, ২০২৫/ বর্তমান) একটি খবর এইরকম: কয়েকমাসে প্রশাসনের উদ্যোগে হাওড়ার উলুবেড়িয়া-১ ব্লকে একাধিক নাবালিকার বিয়ে আটকানো সম্ভব হয়েছে। ওইসঙ্গে তারা বয়ঃপ্রাপ্ত বা সাবালক না-হওয়া পর্যন্ত তাদের বিয়ে দেওয়া হবে না বলেও অভিভাবকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে মুচলেকা। নাবালিকার বিয়ে রুখতে প্রশাসন নানাধরনের সচেতনতামূলক পদক্ষেপ করছে। তবে অভিভাবকদের একাংশের অসহযোগিতার কারণে সবসময় এমন অবাঞ্ছিত বিবাহ আটকানো যাচ্ছে না। ৩০ মার্চ বিডিও অফিসে এই বিষয়েই একটি বৈঠক ডাকা হয়। ছিলেন বিডিও, বিএমওএইচ, পঞ্চায়েত সমিতি ও বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিরা এবং ইমাম, মুয়াজ্জিনরা। বিডিও সকলের উদ্দেশে বলেন, ‘নাবালিকার বিয়ে ঠেকাতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একযোগে এবং আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। এই বৈঠক সেই বার্তা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেই।
বলা বাহুল্য, বাল্যবিবাহ ভারতীয় সমাজের একটি মস্ত সমস্যা। অতীতে ন’বছরে ‘গৌরীদান’ বা ন’বছরের মধ্যে কন্যার বিবাহকে শ্রেষ্ঠ বিবাহ বলে গণ্য করা হতো। সার্বিক সাক্ষরতা অভিযান চলছে কয়েক দশক যাবৎ। নারীশিক্ষারও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে ইতিমধ্যে। তারপরেও হিন্দুসমাজ এই কুপ্রথা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। বিপদটি জাঁকিয়ে রয়েছে অন্যান্য সমাজেও। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন কঠোরতর করা হয়েছে। বাল্যবিবাহের কারণ নির্মূল করার জন্যও নানা সময়ে নেওয়া হয়েছে একাধিক ব্যবস্থা। দেখা গিয়েছে, এই কুপ্রথার একটি বড় কারণ আর্থিক। গরিব পরিবার কন্যাকে ‘দায়’ হিসেবে মনে করে। ভাবে, মেয়েকে পাত্রস্থ করা মানেই মা-বাবার দায়মুক্তি। তার খাওয়া-পরার খরচটা অন্তত বাঁচবে। এই ধারণা থেকে বের করে আনতে নারীশিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। বোঝানো হয় যে মেয়েরা শিক্ষিত এবং উপযুক্ত চাকরিজীবী বা পেশাজীবী হয়ে উঠলে তাদের সঙ্গে ছেলেদের আর গুণগত তফাত কিছু থাকবে না। যে মেয়েকে ‘দায়’ ভাবা হয় সেই ‘সম্পদ’-এ রূপান্তরিত হবে। একজন পুরুষের মতোই একজন মহিলাও সংসারের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ ও পালনে সক্ষম। মেয়েদের শিক্ষার সামনে যাবতীয় বাধা দূর করতে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প চালু করেছেন। তাঁর সরকার আরও চালু করেছে ‘স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড’। উপযুক্ত সময়ে বিবাহে উৎসাহ দিতে এরপর চালু করা হয়েছে ‘রূপশ্রী’ প্রকল্পও। প্রকল্পগুলি দেশে-বিদেশে শুধু প্রশংসিতই হয়নি, ভারতের একাধিক রাজ্য অনুকরণ করেছে।
কিন্তু তারপরেও বাংলাসহ সারা দেশেই রয়ে গিয়েছে বাল্যবিবাহের অভিশাপ। সরকারি আইন অগ্রাহ্য করে লুকিয়েচুরিয়ে কিছু নাবালিকাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে। কিছু সাহসী মেয়ে সরাসরি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আরও পড়াশোনা এবং বড় হয়ে চাকরি করতে চায় জানিয়ে তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছে। সুখের কথা এই যে, প্রশাসনও তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগী মানুষও সহায় হচ্ছেন ওই সচেতন মেয়েদের। কিন্তু তারপরেও লাগাম টানা যাচ্ছে না সর্বত্র। যেমন একটি খবর সামনে এসেছে (জুন ২, ২০২৫) যে, মালদহে চারমাসে ২৪ জন নাবালিকাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে! এসব ঘটনায় ২৩টি এফআইআর করেছে জেলা প্রশাসন। প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও মালদহে গতবছরের তুলনায় এবার নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ! এবছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ২৪ জন নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। তাদের বয়স ১৪-১৭ বছর। ২৩ জন মেয়ের পরিবার এবং তাদের শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানাগুলিতে এফআইআর করেছে প্রশাসন। এই আবহেই মিলল সুখবর, বনগাঁ মহকুমা প্রশাসন গত ছ’মাসে ৪৭ জন নাবালিকার বিয়ে রুখে দিয়েছে। অনিয়মের খবর পেলেই তৎপরতার সঙ্গে লাগাতার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা। এই ঘটনাকে বাল্যবিবাহ রুখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে। এই অনন্যসাধারণ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা এবং রাজ্যজুড়ে সম্প্রসারণ চাই। অন্য রাজ্যগুলিও অনুসরণ করুক। তবেই ‘টিনএজ মা’ নামক অধ্যায়ে ইতি পড়বে। দেশ পাবে সুস্থ সবল শিশু। সুনাগরিক পেতে ভালো শিশুর জন্মদান ভীষণ জরুরি। একমাত্র যথার্থ ‘কন্যাশ্রী’রাই ভারতের এই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে।