


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধরী, শ্রীরামপুর: ‘৮০ টাকার হাওয়াই চটি, ৩০০ টাকার শাড়ি। ১০ লাখের স্যুটের থেকেও অনেক বেশি ভারি’!
বটতলার মোড় থেকে উত্তর দিকে এগতে, শাসকদল তৃণমূলের দেওয়াল লিখন চোখ টানছে সাধারণ মানুষের। হাওয়াই চটি আর ছাপোষা শাড়িতে দিন কয়েক আগেই শ্রীরামপুরে এসে আগুনঝরা বার্তা দিয়ে গিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১০ লাখি স্যুটের জন্য বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অ্যান্ড কোম্পানিকে তুলোধোনা করেছেন চোখা বাক্যবাণে। তার জবাব দিতে এখনও পদ্ম শিবিরের কোনো বহিরাগত বড়কর্তা আসরে নামেননি। তাই এমনিতেই চনমনে হয়ে রয়েছে তৃণমূল। সঙ্গে যোগ হয়েছে মেজাজি দেওয়াল লিখন ও চড়া প্রচার। তবু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে গা ভাসিয়ে দিতে রাজি নন জোড়াফুল প্রার্থী তন্ময় ঘোষ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটছেন তিনি। এদিকে, তৃণমূল প্রার্থীকে বহিরাগত ছাপ দিয়ে আসর মাতাতে চাইছেন বিজেপি প্রার্থী ভাস্কর ভট্টাচার্য। প্রচারে পিছিয়ে নন তিনিও। নিজেকে ভূমিপুত্র প্রমাণে তিনি যেমন মরিয়া, তেমনই মাছে-ভাতে বাঙালির একজন হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে ইতিমধ্যেই প্রচারে বেরিয়ে বাজারে গিয়ে মাছ কিনেছেন ভাস্করবাবু। সেই মাছ রাস্তায় দাঁড়ানো বৃষ্টির ঘোলা জলে ছেড়েও দিয়েছেন। তৃণমূল অবশ্য বলছে, বিজেপি ঘোলা জলে মাছ ধরুক বা ছাড়ুক, ভোটবাজারে সুবিধা করতে পারবে না। সত্যিই কি জেতার জায়গায় আছে তৃণমূল?
রিষড়ার পশ্চিমপাড়ে সুভাষনগরে তৃণমূলের পার্টি অফিসে বসে প্রচারপর্ব তদারকি করার পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগে ব্যস্ত ছিলেন রিষড়া পুরসভার চেয়ারম্যান বিজয়সাগর মিশ্র। বললেন, যে এসআইআর নিয়ে বিজেপি খেলা ঘোরানোর তালে ছিল, সেটাই তাদের কাছে ব্যুমেরাং হয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষকে যেভাবে তারা নাজেহাল করেছে, তার যোগ্য জবাব বিজেপি পাবে ইভিএমে। তাঁর হিসাব, এই বিধানসভা এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। এদিকে, গত বিধানসভায় এখানে তৃণমূল জিতেছিল প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার ভোটে। বিজয়সাগর মিশ্রের চ্যালেঞ্জ, গতবারের তুলনায় মার্জিন এক ভোট হলেও বেশি হবে এবার।
বামেদের আগমার্কা রাজনীতির সময়েও কংগ্রেসের খাসতালুক ছিল শ্রীরামপুর বিধানসভা এলাকা। তৃণমূলের জন্মের পর থেকে এই এলাকা জোড়াফুলের দুর্গ হয়ে যায়। কোনো রাজনৈতিক হাওয়া টলাতে পারেনি শ্রীরামপুরকে। ভোটারদের সেই আস্থার রিটার্ন গিফট হিসাবে দু’হাত ভরে উন্নয়ন পৌঁছে দিয়েছে শাসকদল। রিষড়ার তিন নম্বর জলের ট্যাংক থেকে নয়াবস্তি পর্যন্ত রাস্তা দেখিয়ে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, এইসব এলাকায় একসময় মানুষজন যেত না। সমাজ বিরোধীদের দাপটে বড়ো আতঙ্কের দিন ছিল সেই সময়। এখন সেসব গল্পকথা মনে হয়। এত মজবুত চওড়া রাস্তা আর আলোয় সেসব আতঙ্ক সাফ হয়ে গিয়েছে। কিছুটা দূরেই দেখা গেল, লালকুঠিতে নতুন করে তৈরি হচ্ছে রাস্তা। অবাঙালি অধ্যুষিত রিষড়া বাঙ্গুর পার্ক এলাকা, যা মূলত বিজেপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত, সেখানেও রাস্তাঘাটের ভোল বদলেছে পুরসভা।
এসব উন্নয়নকে সামনে রেখে ভোটে নামতে রাজি নন তন্ময়বাবু। শ্রীরামপুরের মানুষকে আরও একবার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তিনি। এলাকাবাসীকে বলছেন, ‘যে শহরের আনাচে-কানাচে ইতিহাস কড়া নাড়ছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা হয়, সেই এলাকা কেন দার্জিলিং, দীঘার সঙ্গে এক আসনে বসবে না? কেন এখানকার পর্যটন শিল্প নিয়ে গর্ব করবেন না এলাকার মানুষ? কেন দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এসে এখানকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবেন না?’ আর নাগরিক পরিষেবা? ‘এক ফোনে তন্ময়’ নামে অভিনব নাগরিক পরিষেবা চালুর উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নিয়েছেন তিনি। জানালেন, নির্বাচন কমিশনের অনুমতির অপেক্ষায় আছে তাঁর উদ্যোগ। নাগরিকরা সরাসরি তাঁদের অভাব-অভিযোগ জানাবেন তাঁকে।
বিজেপি অবশ্য ধরেই নিয়েছে, তারা জিতে গিয়েছে। এখন মার্জিনের অঙ্ক কষছে তারা। বামেরা চলছে দুলকি চালে। এবারের ভোটেও বড়ো একটা ভরসা নেই তাদের। এসব দেখে মুচকি হাসছেন তন্ময়। পরিষেবা দিতে রাস্তায় নামতে এখন থেকেই আস্তিন গোটাচ্ছেন তিনি।