Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিমায় জিএসটি ছাড়ে স্বচ্ছতা

স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ভাষণ সাজানো ছিল একাধিক উপহারে। ওই মঞ্চ থেকেই তাঁর বার্তা ছিল, দীপাবলির আগেই জিএসটিতে বড়সড় ছাড় দেবে তাঁর সরকার।

বিমায় জিএসটি ছাড়ে স্বচ্ছতা
  • ২২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ভাষণ সাজানো ছিল একাধিক উপহারে। ওই মঞ্চ থেকেই তাঁর বার্তা ছিল, দীপাবলির আগেই জিএসটিতে বড়সড় ছাড় দেবে তাঁর সরকার। বলা বাহুল্য, বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে বিমাক্ষেত্রে জিএসটি মকুবের দাবি করে আসছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সেই প্রক্রিয়াই শুরু করল নয়াদিল্লি। বুধবারই মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকের পর জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমায় ব্যক্তিগত পলিসির উপর জিএসটি মকুব করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে এই দুই ধরনের বিমার প্রিমিয়ামের উপর ১৮ শতাংশ জিএসটি প্রযোজ্য এবং তা গুনতে হয় গ্রাহকদের। এদিনের মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে পণ্য ও পরিষেবা করের সেই হার ‘শূন্য’ করে দেওয়ার পক্ষেই সায় দেওয়া হয়েছে। ১৩ সদস্যের ওই মন্ত্রিগোষ্ঠীর আহ্বায়ক তথা বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জানান, কেন্দ্র বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রস্তাব দিয়েছে। সব রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের বক্তব্য রিপোর্ট আকারে জিএসটি কাউন্সিলের কাছে পেশ করা হবে। আগামী বৈঠকেই এই সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়বে। 

Advertisement

বস্তুত বহুদিন বাদে মোদি সরকার দেশবাসীর দাবি মেনে একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তাদের প্রশংসা প্রাপ্য। রাজনৈতিক মহলের খবর, বেশিরভাগ রাজ্যই এই সাধু প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। তাই সিদ্ধান্তটি এখন কার্যকর হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। স্বভাবতই অসংখ্য মানুষ খুশি এবং স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। আবার এখানেই আশঙ্কা, জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি মকুবের বহু কাঙ্ক্ষিত সুবিধা সাধারণ মানুষ আদৌ পাবেন তো? কারণ দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। ব্যক্তিগত পলিসিকে জিএসটির আওতার বাইরে রাখা হলে বছরে ৯,৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই ক্ষতি সংশ্লিষ্ট পক্ষ হাসি মুখে মেনে নেবে কি? এই ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়ায় ঘুরপথে বিমাকারীর ঘাড়েই তা চাপিয়ে দেওয়া হবে না তো? প্রিমিয়ামের অঙ্ক একই রাখলে কিংবা তা বাড়িয়ে দিলেই জিএসটি প্রত্যাহারের ব্যাপারটা নির্মম রসিকতা হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর দীপাবলির উপহার শোভা পাবে নিছকই ফাঁকা এক গিফট প্যাকেট হিসেবে। সাধারণ মানুষের ভয়টা একেবারে অকারণ নয়। কেননা, কথার খেলাপে মোদি সরকার ইতিপূর্বে বলে বলে দশ গোল দিয়েছে। কালো টাকা উদ্ধার, চাকরি/কর্মসংস্থান, শ্রমিক-কৃষকের আয়বৃদ্ধি প্রভৃতি ইস্যুতে দেশবাসী ধোঁকার বেশি কিছুই খায়নি। রাশিয়া থেকে ভারত সস্তা দরে রেকর্ড পরিমাণ খনিজ তেল আমদানি করেছে এবং করছে। কিন্তু এই বিপুল লাভের ছিটেফোঁটাও দেশবাসীর ভোগের হয়নি। তাঁরা কিন্তু যথারীতি অগ্নিমূল্যেই পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, কেরোসিন প্রভৃতি কিনে চলেছেন। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি বিশেষে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) মাঝেমধ্যেই রেপো রেট পরিবর্তন করে। ঋণ এবং আমানতের উপর তার যে স্বাভাবিক প্রভাব পড়ার কথা বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি গ্রাহকদের তা বেশিরভাগ সময়েই দেয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের তেমন নির্দেশ থাকলে দেশবাসী অবশ্যই তার সুবিধা পেতেন। কিন্তু সরকারের নীরবতার সুযোগ নেয় সংস্থাগুলি এবং গ্রাহকরা ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার শিকার হন। 
তাই মন্ত্রিগোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য বাংলার অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, তেলেঙ্গানার উপমুখ্যমন্ত্রী মাল্লু ভাট্টি বিক্রমার্ক-সহ অনেকেই এই ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁদের পরিষ্কার বক্তব্য, নির্দিষ্ট বিমায় জিএসটি শূন্যতার সুবিধা থেকে সাধারণ মানুষকে যেন কোনওভাবেই বঞ্চিত করা বা ঠকানো না-হয়। আমরা জানি, ভারতের কয়েক কোটি নাগরিক কোনও ধরনের বিমার আওতায় নেই। সাধারণ বিমা দূর, জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমা ক্ষেত্রেও তাঁরা প্রবেশাধিকার পাননি। তার মূল কারণ তাঁদের আয়ের তুলনায় বিমার দাম অত্যন্ত চড়া। তার উপর মোটা অঙ্কের জিএসটি চাপিয়ে মোদি সরকারই সাধারণ মানুষকে বিমাবিমুখ করে তুলেছে। এতে শুধু সাধারণ মানুষই ব্যক্তিগতভাবে সমস্যায় পড়েন না, চাপ বাড়ে সরকারি ব্যবস্থার উপর। সার্বিকভাবে গতি হারায় ভারতীয় অর্থনীতি। তাই দেখতে হবে ব্যক্তিগত জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে মোদির স্বাধীনতা দিবসের ঘোষণাটি যেন আন্তরিকভাবেই রূপায়িত হয়। কোনওভাবেই যেন হতাশ করা না-হয় একজনকেও। তবেই দেশের অর্থনীতি প্রকৃত বিমার সুরক্ষায় বেড়ে ওঠার অবকাশ পাবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ