সুর বাঁধা হয়েছিল বছরখানেক আগেই। ২০২৪-এ নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় বসার পরই ১৮তম লোকসভায় রাষ্ট্রপতির ভাষণে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাকে সংবিধানের উপর সরাসরি আক্রমণের সবচেয়ে বড় ও অন্ধকারতম অধ্যায় বলে বর্ণনা করা হয়। সেসময় প্রায় একইরকম বক্তব্য রেখেছিলেন লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। এমনকী লোকসভায় একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছিল। এরপরেই আসরে নামেন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিত্ব নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ২৫ জুন জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, এই দিবস পালন সংবিধানকে পদদলিত করার কথা মনে করিয়ে দেবে। সেই সময় কী হয়েছিল, তা স্মৃতি হিসেবে থাকবে। তারপর বছর ঘুরে গেলেও এবছর জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২৫ জুন সব রাজ্যকে ওই দিবস পালনের জন্য বার্তা পাঠিয়েছে কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রক। প্রদর্শনী, মিছিল সহ কী কী কর্মসূচি পালন করতে হবে ওইদিন, তাও বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন জারি হওয়া ২১ মাসের জরুরি অবস্থা ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা ‘কালো অধ্যায়’। একজন শাসক স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে দেশের চেহারাটা কেমন হতে পারে, ১৯৭৫-১৯৭৭ সালের মধ্যকার ২১ মাস প্রতিটি ভারতবাসীকে তা হাড়েহাড়ে টের পাইয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সেই সময়ে নির্বাচনকে নিষিদ্ধ করে, বিপক্ষের রাজনীতিবিদদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার, সমস্ত নাগরিক অধিকার স্থগিত বা খর্ব করে, মিডিয়াকে সেন্সর করে, বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বৈরাচারী শাসনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা! এর ফল অবশ্য হাতেনাতে পেয়েছিলেন তিনি ও কংগ্রেস। দেশজুড়ে প্রবল গণ আন্দোলনের চাপে ১৯৭৭ সালে গদিচ্যুত হয় প্রবল পরাক্রমশালী ইন্দিরার কংগ্রেস। জীবদ্দশায় কৃতকর্মের জন্য ইন্দিরা ক্ষমা না চাইলেও তাঁর নাতি রাহুল গান্ধী কিন্তু সে পথে হাঁটেননি। এখন থেকে বছর চারেক আগে তিনি স্বীকার করে নেন, তাঁর ঠাকুমার নেওয়া জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত একেবারেই ঠিক ছিল না। সে সময়ে যা যা হয়েছে তা ভুল। ঠাকুমা যা বলেছিলেন, সেগুলিও ঠিক ছিল না।
নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ৫০ বছর আগের সেই ‘কালো অধ্যায়’কে এখন সামনে এনে নিজেদের ‘অপকর্ম’ আড়াল করার চেষ্টা করছে। কারণ গত এগারো বছরের ইতিহাস সাক্ষী, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করেও স্বৈরাচারের যেন এক নতুন চেহারা দেখা যাচ্ছে এ দেশে। বলা ভালো, জরুরি অবস্থায় ইন্দিরা যা করেননি, ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থায়’ মোদি সরকার তা করে দেখাচ্ছে। ইন্দিরার সময়ে সংবিধানে হাত পড়েনি, স্বশাসিত সংস্থা কব্জা করার চেষ্টাও হয়নি। ঘোড়া কেনা-বেচা করে এখনকার মতো কোনও নির্বাচিত রাজ্য সরকার ফেলে দেওয়া হয়নি। মোদি জমানায় এ খেলা চলছে নিরন্তর। মোদির ‘বিকশিত ভারতে’ গণতন্ত্রের হাল-হকিকত বলছে, বিশ্বের ১৬১টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এখন ১৪১তম। আর্টিকেল ১৯ পত্রিকার ২০২৪-এর ‘গ্লোবাল এক্সপ্রেশনস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ভারতের ৫৩ শতাংশ মানুষ মতপ্রকাশের অধিকারজনিত সঙ্কটে আক্রান্ত। গণতন্ত্রের পক্ষে সওয়াল করে গত তিন বছরে বহু সাংবাদিক জেলে গিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা হয়েছে। কোভিড মহামারীর সময় মানবিক সঙ্কট নিয়ে প্রতিবেদন লেখায় ৫৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, বলছে দিল্লির ‘রাইটস অ্যান্ড রিস্ক অ্যানালিসিস গ্রুপ। একাধিক প্রচারমাধ্যম রাজরোষের শিকার এই জমানায়। মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করতে একাধিক আইন সংশোধন করা হয়েছে। তথ্যের অধিকার আইনকে প্রায় নখদন্তহীন করে ফেলা হয়েছে। অন্তত ২৬টি সরকারি সংস্থাকে তথ্যের অধিকার আইনের বাইরে করে দেওয়া হয়েছে। আবার ইডি, সিবিআইয়ের মতো এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন বিরোধী নেতা-নেত্রীদের যথেচ্ছ ধরপাকড় করা হয়েছে, তেমনই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত অন্তত ২৫ জন বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ বিজেপিতে যোগ দিয়ে ‘মুক্ত’ হয়েছেন। এইসব কারণেই ‘ফ্রিডম হাউস’ তার মূল্যায়নে ভারতকে ‘আধা মুক্ত’ দেশের তকমা দিয়েছে। ইকনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট ঘোষিত গণতন্ত্রের সূচকে ২০২২-এ ভারতের স্থান ছিল ৪৬, যা ২০১৪ সালে ছিল ২৭। এমন আরও অসংখ্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলছে, ভারতের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র আজ বিপন্ন, ক্রমশ আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই জানিয়ে দিয়েছেন, কেন্দ্রের নতুন ফরমান তাঁর সরকার মানবে না। তাঁর মতে, মোদি জমানার যা হাল, তাতে প্রতিদিনই ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করা উচিত। যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিদিন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে তাদের এ বিষয়ে কর্মসূচি নেওয়ার নৈতিক অধিকার নেই। আর নোটবন্দির দিনটিকে তো ‘ব্ল্যাক মানি ডে’ ঘোষণা করা উচিত ছিল। বাস্তব সত্য হল, এ সবই আসলে নির্মম বাস্তব থেকে নজর ঘোরাতে মোদি-শাহের রাজনৈতিক কৌশল।