বাংলা আর বাঙালির প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এত আবেগ, দরদ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে যদি রাজ্যবাসী ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের গন্ধ পান, তাহলে তাঁদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাধারণভাবে আরএসএস-বিজেপিকে লোকে হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণে বলিপ্রদত্ত একটি রাজনৈতিক দল বলে মনে করে। এই মনে করার মধ্যে কোনও ভুল নেই। মূলত, গো-বলয়ের দল হিসেবে পরিচিত এই হিন্দুত্ববাদীদের প্রধান আরাধ্য দেবতা যে রামচন্দ্র তা নিয়েও কোনও বিতর্ক নেই। এই রামের নামে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই বিজেপির ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন। এতদিন মানুষ বুঝেছে তাদের ভাবনায় সেই রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু মুসলিমদের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু স্বয়ং ইষ্টদেবতাই বোধহয় ভক্ত বিজেপির এই উগ্র আস্ফালনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তার ফল ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে পাওয়া গিয়েছে হাতেনাতে। খোদ রামচন্দ্রের জন্মভূমি অযোধ্যায় হারতে হয়েছে বিজেপিকে। গোটা দেশে ২৪০টি আসনে থেমে গিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে বিজেপি। আর এই বাংলায় আসন খুইয়ে শেষপর্যন্ত ১২টিতে নেমে এসেছে গেরুয়াবাহিনী। এই পরিসংখ্যান মাথায় রেখে ‘দূরদর্শী’ প্রধানমন্ত্রীর হয়তো মনে হয়েছে, এ রাজ্যে রামকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে লড়াইয়ের শুরুতেই পিছিয়ে পড়তে হবে। অতএব বাঙালির ঘরে ঘরে পূজনীয় মা দুর্গা, মা কালীর নাম জপ করে বাংলা ও বাঙালির বন্দনায় গা-ভাসিয়ে দিয়েছেন মোদি। কিন্তু কৌশল হিসেবে এই পরিবর্তনে ২৬-এর ভোটে আরও একবার বিজেপির বিসর্জন আটকানো যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
অথচ কিছুদিন আগে পর্যন্তও হিন্দু মুসলমানকে নিয়ে চেনা প্রচারে সরগরম ছিল রাজ্য রাজনীতির ময়দান। অচিরেই যেন তাতে থাবা বসিয়েছে বাঙালি-বিদ্বেষের বিষ। শেষ মাসাধিক কালের ছবিটা হল, মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি ও বাংলাভাষীদের চূড়ান্ত হেনস্তার কাহিনি। বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি এই ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করে বাঙালিদের উপর অত্যাচার শুরু হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকের গুচ্ছ প্রমাণপত্র দেখালেও নিস্তার মিলছে না। অনুপ্রবেশকারীর অজুহাতে প্রধানত বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘টার্গেট’ করা হয়েছে। এই অযাচিত হেনস্তা-অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন। অনেকের ঠিকানা হচ্ছে পুলিসি হেফাজত, হয়তো বা ডিটেনশন ক্যাম্পে। এই সর্বগ্রাসী বাঙালি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে এই রাজ্য। ইতিমধ্যেই এর প্রতিবাদে পথে নেমেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের শাসকদলের সাংসদরা দিল্লিতে একটি বাঙালি-প্রধান বস্তিতে ধর্নায় বসেছেন। প্রতিবাদে পথে নেমেছে বাম-কংগ্রেস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সংগঠন। এই প্রেক্ষিতে আগামী বিধানসভা ভোটে তাই ‘বাঙালি-ইস্যুই’ যে প্রচারের অন্যতম অস্ত্র হতে চলেছে, তা ভালোই বুঝেছে বিজেপি। অতএব ক্ষতে প্রলেপ দিতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ‘রামকে’ ছেড়ে দুর্গা-কালীর নাম জপতে শুরু করেছেন। যদি দুই নারীশক্তির আশীর্বাদে ভোট মেলে।
শুরুটা করেছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকের মঞ্চের পিছনে ছিল কালীঘাটের কালী মায়ের প্রতিচ্ছবি। শুক্রবার দুর্গাপুরের জনসভায় সেই সূত্র ধরেই মোদি বক্তৃতা শুরু করেন ‘জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা’ স্লোগানে। তারপর তাঁর বক্তৃতার অর্ধেক জুড়ে শুনিয়েছেন বাংলা ও বাঙালির গর্বের ইতিহাসের কথা। পালে বাঘ পড়লে যা হয়, অনেকটা সেইরকম। প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে বিজেপির সম্পর্ক কত গভীর। বিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে স্বাধীনতার পর বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, প্রথম বাঙালি এমবিবিএস চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, বাঙালি কবি বিষ্ণু দে, বাঙালি শিল্পপতি স্যার বীরেনের নাম স্মরণ করে মোদি বোঝাতে চান, বিজেপির কাছে বাঙালির অস্মিতা সবার উপরে। এই অস্মিতাকে আগলে রাখার ‘গ্যারান্টি’ও দিতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে। শুধু বক্তৃতা নয়, মোদির সভার ব্যবস্থাপনা থেকে মঞ্চসজ্জা, এমনকী উপহারও— সবেতেই বাঙালিয়ানা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা ছিল। এই সভার জন্য যে প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে তাতে লেখা ছিল ভারতমাতার জয়, জয় মা দুর্গা, জয় মা কালী। মঞ্চও সাজানো হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ভারতমাতার ছবি দিয়ে। গাঁদা, গোলাপের জায়গায় মোদিকে বরণ করা হয় রজনীগন্ধার মালায়। এত বাঙালি বন্দনা, রাজ্যে ‘পরিবর্তন’ এনে বাংলাকে ভরিয়ে দেওয়ার চেনা প্রতিশ্রুতি, বাঙালি অস্মিতা রক্ষার স্বঘোষিত ঠিকাদার হওয়ার অঙ্গীকারের অনেক কথাই শোনা গেল। কিন্তু ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলিতে যে প্রকৃত বাঙালি নাগরিকদের বেছে বেছে হেনস্তা করা হচ্ছে, অত্যাচার করা হচ্ছে, দেশ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে— তা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না রাতারাতি বাঙালি দরদি হয়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী! বললেন না উন্নয়নের স্বার্থে বাংলার বকেয়া পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার কথা! মুখ আর মুখোশটা বোধহয় এখানেই পরিষ্কার হয়ে গেল।