Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদি সরকারের ক্ষমা চাওয়ার সময়

অবশেষে, কেন্দ্রীয় সরকারের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সরকার বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার উপর যুক্তিসংগত জিএসটি হার চালু এবং হ্রাস করেছে। তার ফলে বর্তমান কর কাঠামো মোটামুটি ভালো এবং কিছুটা সরলও হয়েছে।

মোদি সরকারের ক্ষমা চাওয়ার সময়
  • ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: অবশেষে, কেন্দ্রীয় সরকারের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সরকার বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার উপর যুক্তিসংগত জিএসটি হার চালু এবং হ্রাস করেছে। তার ফলে বর্তমান কর কাঠামো মোটামুটি ভালো এবং কিছুটা সরলও হয়েছে। গত আট বছরে একাধিক রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ীরা, অনেক প্রতিষ্ঠান এবং কিছু ব্যক্তি (আমি-সহ) এটার পক্ষেই সওয়াল করে আসছিলেন।

Advertisement

২০১৬ সালের আগস্টে সংবিধান (১২২তম সংশোধনী) বিলের উপর বিতর্কে অংশ নিয়ে আমি রাজ্যসভায় আমার বক্তব্য রেখেছিলাম। এখানে তারই কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি—
সংগত অবস্থান
“আমি আনন্দিত যে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, ইউপিএ সরকারই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জিএসটি আনার ইচ্ছা সরকারিভাবে ঘোষণা করেছিল। এটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০০৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় বাজেট বক্তৃতা প্রদানকালে।
“স্যার, চারটি প্রধান বিষয় রয়েছে।”...
“আমি এখন বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে আসছি। ...এটি করের হার সম্পর্কিত। আমি এখন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার (সিইএ) রিপোর্টের কিছু অংশ পড়ছি ... দয়া করে মনে রাখবেন, আমরা একটি পরোক্ষ কর নিয়ে কাজ করছি। সংজ্ঞা অনুসারে, পরোক্ষ কর হল একটি পশ্চাদমুখী কর। যেকোনও পরোক্ষ কর ধনী ও গরিব উভয়ের উপর সমান প্রভাব ফেলে...প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার রিপোর্টে বলা হয়েছে: ‘উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে, গড় জিএসটি হার ১৬.৮ শতাংশ। ভারতের মতো উদীয়মান বাজার অর্থনীতিতে এর গড় ১৪.১ শতাংশ।’ সুতরাং, বিশ্বজুড়ে ১৯০টিরও বেশি দেশে জিএসটির এক অথবা অন্য রূপ রয়েছে। এটি ১৪.১ শতাংশ থেকে ১৬.৮ শতাংশের মধ্যে।...
“আমাদের কর কম রাখতে হবে। একইসঙ্গে রক্ষা করতে হবে, কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি যে রাজস্ব আদায় করে থাকে সেটাও। ...যাকে ‘রেভিনিউ নিউট্রাল রেট (আরএনআর)’ বা ‘রাজস্ব নিরপেক্ষ হার’ বলা হয় সেটি খুঁজে পেতেই আমরা এই কাজটি করতে পারি।...
“রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ১৫ শতাংশ থেকে ১৫.৫ শতাংশের মধ্যে আরএনআর নির্ধারণের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। অতঃপর পরামর্শ দিয়েছেন যে, জিএসটির আদর্শ হার হওয়া উচিত ১৮ শতাংশ। কংগ্রেস দল ১৮ শতাংশের কথা কোনও কল্পনা বলেনি। এই ১৮ শতাংশ এসেছে আপনারই রিপোর্ট থেকে।...
“...জনগণের পক্ষে কাউকে কথা বলতে হবে। জনগণের নামে, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি যে আপনার প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা যে হার সুপারিশ করেছেন, আপনি সেই হার বজায় রাখুন। অর্থাৎ, আদর্শ হার ১৮ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।...
“...রিপোর্টের ২৯, ৩০, ৫২ এবং ৫৩ অনুচ্ছেদ পড়ুন। সেখানে স্পষ্ট যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে...১৮ শতাংশের একটি আদর্শ হারই কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির রাজস্ব রক্ষা করবে, ব্যাপারটা এফিশিয়েন্ট এবং নন-ইনেফ্লেশনারি হবে, এড়ানো যাবে কর ফাঁকির প্রবণতা এবং ভারতের সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে...যদি আপনি পণ্য ও পরিষেবার উপর ২৪ শতাংশ কিংবা ২৬ শতাংশ চার্জ করতে যাচ্ছেন, তাহলে খামোকা জিএসটি বিল আনবেন কেন?...
“অবশেষে, ট্যাক্স বিলে আপনাকে একটি কর হার রাখতে হবে। আমি আমার দলের পক্ষ থেকে জোরের সঙ্গে এবং স্পষ্টভাবে দাবি করছি যে—বেশিরভাগ (৭০ শতাংশেরও বেশি) পণ্য ও পরিষেবার উপর প্রযোজ্য জিএসটির স্ট্যান্ডার্ড রেট বা আদর্শ হার ১৮ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। ওই ১৮ শতাংশের উপরে ‘লোয়ার রেট’ এবং ‘ডিমেরিট রেট’ নিয়েও কাজ করা যেতে পারে।”
আট বছর যাবৎ শোষণ
আমি ২০১৬ সালেও একই সুরে কথা বলেছিলাম এবং আজও বলছি। আমি আনন্দিত যে, কর হারগুলিকে যুক্তিসংগত করে তোলা এবং কমানোর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকার উপস্থিত হয়েছে। তবে, শুরুতেই সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে কর হার ১৮ শতাংশে বেঁধে দিলে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে, ক্ষতিটা বিশেষভাবে হবে রাজ্য সরকারগুলির। এ঩টি একটি উদ্বেগেরও বিষয় ছিল। আজ, দুটি স্ল্যাব রেট হল—৫ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ! কেন্দ্রের কর রাজস্ব বৃদ্ধির নানা উপায় রয়েছে। সেখানে যদি রাজ্য সরকারগুলির রাজস্ব 
কমে যায়, তবে যথার্থ সমাধান হল তাদেরকে ক্ষতিপূরণ প্রদান। 
গত আট বছরে, সরকার জিএসটির ননারকম হার জারি রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল—উপভোক্তাদের কাছ থেকে শেষ পয়সাটিও ‘শোষণ’ এবং ‘আদায়’ করে রাজকোষ ভরানো। প্রথম ভাগে (২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের মার্চ) সরকার প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা আদায় করেছিল। ২০২৪-২৫ সালে তারা আদায় করেছিল প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকা। উপভোক্তারা প্রতিটি পয়সা রোজগার করেন কঠোর পরিশ্রম করেই। আর সরকার তা বস্তুত চুষে নিয়েছে জিএসটি আদায়ের নামে। মশকরা করে যথার্থ নামই দেওয়া হয়েছিল—গব্বর সিং ট্যাক্স! জিএসটির চড়া হারের কারণেই মানুষ ভোগব্যয় কমিয়েছে। তাদের পারিবারিক ঋণবৃদ্ধিরও কারণ এটি। অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠেই বলা হয়েছে যে, কর কমালে ভোগব্যয় বৃদ্ধিতে মানুষ উৎসাহ পায়। 
আজ যদি টুথপেস্ট, কেশতেল, মাখন, শিশুদের ব্যবহার্য ন্যাপকিন, পেন্সিল, নোটবুক, ট্র্যাক্টর, স্প্রিংকলার প্রভৃতির উপর ৫ শতাংশ জিএসটি ভালো হয়, তাহলে গত আট বছরে কেন তা খারাপ ছিল? কেন আট বছর যাবৎ দেশবাসীকে মাত্রাতিরিক্ত কর গুনে যেতে হয়েছিল?
শেষ নয়
কর হার কমানোটা সূচনা মাত্র। এরপর আরও অনেক কিছু করতে হবে। সরকারের উচিত—
• সিঙ্গল জিএসটি রেট বা একক জিএসটি হারের জন্য রাজ্যগুলি, উৎপাদক এবং উপভোক্তাদের প্রস্তুত করা (প্রয়োজনে আরও ছাড়সহ)।
• আইন ও বিধিগুলি পাশ করার জন্য এখন যে জগঝম্প জিনিসপত্র বাতিল করা হচ্ছে, সেগুলি সহজ সরল ভাষায় পুনরায় লেখার ব্যবস্থা হোক।
• সহজ ফর্ম ও রিটার্ন নির্ধারণের পাশাপাশি ঘন ঘন ফাইলিংয়ের যন্ত্রণা থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হোক। 
• সহজ করা হোক আইন মেনে চলার দিকটি। তাহলে একজন ছোট ব্যবসায়ী বা দোকানদারকেও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের দ্বারস্থ হওয়ার সমস্যা থাকবে না।
• জিএসটি আইনগুলিকে ‘ডি-ক্রিমিনালাইজ’ বা ‘ফৌজদারি সাজামুক্ত’ করা হোক। মনে রাখতে হবে যে, এগুলি বাণিজ্য সম্পর্কিত দেওয়ানি আইন। এই আইন যেকোনও প্রকারে লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দোষীকে উপযুক্ত আর্থিক জরিমানার শাস্তি দেওয়া উচিত। 
• কর আদায়কারীদের মধ্যে এই ধারণা জাগিয়ে তোলা হোক যে, উৎপাদক এবং ব্যবসায়ীরা হলেন অর্থনীতির প্রধান শক্তি। কর আদায়কারীদের হাতে মারা পড়ে যাওয়ার মতো কোনও শত্রু তাঁরা নন।
বিজেপির উদযাপন করার মতো কিছুই নেই। এখন জনগণের কাছে সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত। এবং, আমি আশা করি, সংস্কারের বাকিটা সম্পন্ন করতে সরকার আরও আটটি বছর কালহরণ করবে না।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ