


কাজের জন্য সাতসকালে নাকেমুখে গুঁজে ছুট। সারাদিন একঘেয়ে কাজের পরিবেশ ঠেলে ঘরে ফেরা। ঘরে ফেরার যে খুব তাড়া, তাও নয়। কারণ ঘর এতটাই এলোমেলো, অগোছালো অবস্থায় পড়ে রয়েছে যে মনে হয়, চার দেওয়ালের ওই চেনা ছকেও যেন মন বসছে না। তখন কেউ ভাবেন ঘরটাই পাল্টাবেন। কেউ ভাবেন অন্য চাকরি নিয়ে শহর ছাড়বেন। কেউ চারদিন বেরিয়ে এসে একঘেয়েমি কাটান। এই উপায়গুলোর কোনওটাই কারও হাতে না থাকলে দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাবেন কীভাবে?
মেরি কোন্ডো বলছেন, ঘরদোর গুছিয়ে মন ভালো রাখুন, একঘেয়েমি হারিয়ে যাবে। কে তিনি? জাপানি লাইফস্টাইল গুরু। তাঁকে কেউ কেউ বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষজ্ঞ। শোনা যায়, বছর পাঁচেকের মেরি তাঁর মায়ের লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনের পাতা উল্টেপাল্টে দেখত। ঘরদোর গুছিয়ে রাখা বা নিজের চারপাশটা পরিপাটি রাখা নিয়ে লেখাপত্তর পড়তে তার ভালো লাগত। পরবর্তীকালে এই বিষয়ে মেরি নিজেই হয়ে উঠলেন বিশেষজ্ঞ। লিখে ফেললেন বেশ কিছু বই। ‘দ্য লাইফ চেঞ্জিং ম্যাজিক অব টাইডিয়িং আপ’, ‘টাইডিয়িং আপ উইথ মেরি কোন্ডো’ এবং ‘স্পার্কলিং জয় উইথ মেরি কোন্ডো’ সেই সব জনপ্রিয় বইয়ের কয়েকটি।
চারপাশের সবকিছুই যখন অগোছালো হয়ে থাকে, তখন সমাধান খুঁজতে জোর করে অন্য কিছু করলেও আনন্দ পাওয়া যায় না। মেরি বলছেন, চারপাশটা যেমনই থাকুক, মনকে প্রশ্ন করো, যা ঘটছে সেটা থেকে তুমি কি আনন্দ পাচ্ছ? মেরি সেখান থেকেই মনের চাপ হালকা করার কথা বলেন। বলেন, ‘স্ট্রেস ফ্রি ক্লিনিং’-এর কথা।
ঘরবাড়ি সাফসুতরো রাখো, গুছিয়ে রাখো— নিজের ক্লান্তি ভুলে প্রাণশক্তি ফিরে পাও। মোদ্দা কথা এটাই। এই একঘেয়েমির চক্করে আপনি কী কী ভালো পারেন, কী কী করলে আপনার মন প্রফুল্ল থাকে, সেটাই হয়তো ভুলে গিয়েছেন। জানেন তো, কোনও কিছু গুছিয়ে তোলার মধ্যে একটা ছন্দ আছে। একটা ফিরে পাওয়াও আছে। চারপাশে সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সেগুলো আপনার উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় সুষ্ঠুভাবে স্থান পেল। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মধ্যে অদ্ভুত সন্তুষ্টি তৈরি হয় মনে।
কী বললেন, পুরনো জিনিসপত্র রাখতে ভালো লাগছে না? রাখবেন না। ঘরের কোণে পড়ে থাকা কোনও পুরনো জিনিস দেখে যদি মনের শান্তি নষ্ট হয়, সরিয়ে দিন সে জিনিস। যে শাড়ি বা যে ঝুটো গয়না তিক্ত স্মৃতি জ্যান্ত করে, মায়া করে যেগুলো তবু রেখেই দিয়েছিলেন, সেসব আর রাখবেন না, বিলিয়ে দিন। প্রাথমিক কষ্ট পেরিয়ে দেখবেন মন হালকা লাগছে। এখন আপনার রুচি অনুযায়ী যেমন জিনিস পছন্দ করেন, বেছে নিন তেমন নতুন কিছু। আবার দেখবেন এমন অনেক জিনিস অযত্নে পড়ে আছে বাড়িতে, যেগুলো আপনি আদতে ভালোবাসেন। সময়াভাবে সেগুলোর দিকে তাকানো হয় না। ধুলো ঝেড়ে সেগুলো সামনে নিয়ে আসুন। মন ভালো হবেই। মেরি এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘কোন মেরি মেথড।’ যা যা জিনিস আছে আপনার আশপাশে, যেগুলো আপনার পছন্দের, সেগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। প্রতিবার অন্তর থেকে গুছিয়ে তোলার প্রক্রিয়ার মধ্যে শামিল করুন নিজেকে।
ঘর সুন্দর করে গুছিয়ে তোলার পরে দেখবেন কাজের শেষে আপনার ফিরে আসার সেই আস্তানাটি ততটা খারাপ লাগছে না। ঘরে ঢুকে মন অকারণেই ভালোলাগা খুঁজে পাবে। গোছানোর পর্বে মনের মর্জি মেনে নিয়ে আসুন এমন কিছু সামগ্রী যেটা আপনাকে ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করবে। সেটা হতে পারে আপনার নিজেরই মুখে চওড়া হাসি ছড়ানো কোনও ছবি অথবা কোনও ওয়াল হ্যাঙ্গিং-এ ঝোলানো প্রিয় কয়েকটা লাইন। হতে পারে সুগন্ধি মোম অথবা একগোছা ফুল। বাড়িতে মন ভালো থাকলে কর্মস্থলও দেখবেন ততটা বিরক্তিকর লাগবে না। দেখুন, চারপাশে আপনি কোনও কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কিন্তু আপনার মন সবসময় সেটাই করতে চায়। যে কারণে আপনার সবসময় মনে হয়, মনমতো কিছুই হচ্ছে না। গোছানোর কৌশলের মধ্যে নিজের ওপর একটা নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। সেটা আপনাকে আনন্দ দিতে পারে। গোছানো জীবন বলতে আমরা বুঝি একটা নিয়মানুবর্তী জীবন। নিয়মের শিকল নয়, একটা সুস্থ সুষ্ঠু পারিপার্শ্বিক আপনার সব কাজের মধ্যেই একটা ছন্দ তৈরি করে দেয়। যার মাধ্যমে আপনার মনে হতাশা, নিরাশা বা একঘেয়েমি দূরে সরে যায়।
মেরি বলেন, ভেবে নিন কোন জীবনটা আপনার জন্য আদর্শ? নিজের মনে তার একটা পাকাপোক্ত ছবি তৈরি করুন। সেইটাই আপনাকে মোটিভেট করবে বাড়িঘর সাজিয়েগুছিয়ে রাখার জন্য। সঙ্গে নিজের জন্য তৈরি করুন একটা ডেডলাইন। অর্থাৎ দু’মাস বা তিন মাসে আমি একটা কাজ নিজের জন্য ঠিক করব এবং সেটা শেষ করব সময় মেনে। যেমনটা মনে মনে ভেবেছিলেন সেটা যখন নিজে হাতে, নিজ উদ্যোগে করবেন, দেখবেন কী অসম্ভব তৃপ্তি পাচ্ছেন। ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করে রোজ একটু একটু করে গোছান। একদিনে সবটা করে ফেলব ভাবলে ভুল করবেন। উৎসব উপলক্ষ্যে বা বাড়িতে অতিথি আসার কথা হলে আমরা দুদ্দাড় করে ঘর গোছানোর তোড়জোড় করি। তারপর একদিনে তুমুল কাজ করে হাঁপিয়ে যাই। এটা ঠিক নয়। এতেই গুছিয়ে রাখার স্পৃহা হারিয়ে যায়।
আপনি বরং ঋতু অনুযায়ী ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার কথা ভাবতে পারেন। একটু একটু করে সময় জমিয়ে এক এক ঋতুতে সাজিয়ে তুলুন নিজের মনমাফিক ঘর। ঘর গোছানোর মধ্যে শুধু বহিরঙ্গের পরিবর্তনটাই মুখ্য, এটা ভাববেন না। ঘর গোছানোর মধ্যে দিয়ে আপনার মনের স্বচ্ছতাও বাড়ে। চারদিক পরিষ্কার থাকলে কোনও কাজে যখন বসবেন, দেখবেন সেই কাজেও অনেক বেশি মন দিতে পারছেন। কাজ তখন আপনাকে ক্লান্ত করবে না। উদ্যম জোগাবে, নতুন জীবনীশক্তি দিয়ে আপনি কাজের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাবেন।
অন্বেষা দত্ত