Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সার্ধশতবর্ষীয় শরৎচন্দ্রলোকের সেইসব মাস্টারমশাই

সমাগত শরতে আজ স্বদেশীয় শিক্ষক দিবস। ঠিক দশ দিন পরেই ১৫ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেড়শোয় পা রাখবেন। তিনি যথার্থই মাহ ভাদরের (ভাদ্র) শারদসন্তান। বাংলার রবিসম তিনিও যে শিক্ষাকর্মে যুক্ত ছিলেন তা শরৎচন্দ্রালোকিত সাহিত্যের অছিলায় আমরা ভুলেই থাকি।

সার্ধশতবর্ষীয় শরৎচন্দ্রলোকের সেইসব মাস্টারমশাই
  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: সমাগত শরতে আজ স্বদেশীয় শিক্ষক দিবস। ঠিক দশ দিন পরেই ১৫ সেপ্টেম্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেড়শোয় পা রাখবেন। তিনি যথার্থই মাহ ভাদরের (ভাদ্র) শারদসন্তান। বাংলার রবিসম তিনিও যে শিক্ষাকর্মে যুক্ত ছিলেন তা শরৎচন্দ্রালোকিত সাহিত্যের অছিলায় আমরা ভুলেই থাকি।

Advertisement

১৯০১ সালে বীরভূমে বিশ্বকবির বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরেই ১৯০৭ সালে এই বঙ্গচন্দ্রমা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৎকালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বর্তমানে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে।
কবির মতো জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়েও শিক্ষাদানকে অধিক মহৎ বলে মনে করতেন শরৎবাবু। তাই ইচ্ছা থাকলেও ১৯২১ সালে বরিশালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে যাননি। সাহিত্যিক লীলারানী গঙ্গোপাধ্যায়কে ৩০ মার্চ চিঠিতে লিখেছেন,‘শুধু আমার নতুন পাঠশালার কাজে এমনই ব্যস্ত রইলাম যে সময় পেলাম না।’পাঠশালাটি ছিল হাওড়ার গোবিন্দপুরে, বাজে শিবপুরে থাকার ফলে যেটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় তাঁকে আমরা কলেজেও অধ্যাপনা করতে দেখি। কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে দেশবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিদ্যাপীঠ নামে 
জাতীয় কলেজে বাংলা ভাষার প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। বক্তৃতার জন্য তাঁর উপর নেতাজি সুভাষকে পীড়াপীড়ি করতে দেখা যেত সেই সময়।
কোপাইয়ের কাছে ভানুসিংহের বিশ্বভারতীর মতো শরৎচন্দ্রের ছিল হাওড়ার পানিত্রাসের সামতাবেড়। রূপনারায়ণতীরের সামতা গ্রামের প্রান্তে বা বেড়ে বসবাস ছিল বলেই এ হেন শরৎচন্দ্রিক নামকরণ। রবীন্দ্রনাথের শ্যামলী ভবনের মতো সেখানে তিনিও বানিয়েছিলেন মাটির বাড়ি। এলাকায় তাঁর নামাঙ্কিত বালিকা বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ইচ্ছা ছিল ছাত্রীনিবাস ও শিক্ষক শিক্ষণ কলেজ করবেন। স্কুলটি ছিল তাঁর প্রাণের পিদিম। তার আলোর সাক্ষী রবিপরিকর কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে লেখা ১৯৩৩ সালের একটি চিঠি। যতীর বই পেয়ে শরৎবাবু তাঁকে লিখেছেন,‘আজ রবিবারে আমাদের মেয়ে-ইস্কুলের একটা ব্যাপার আগে থেকে স্থির করা ছিল—সেটা আরম্ভ হবে আধ ঘণ্টার মধ্যে—তাই আজ এখনই এটা পড়ার সময় ত নেই।’সেদিন তিনি আরও একজন ‘পুরোনো বন্ধু’-কে পেয়েও উপেক্ষা করেছিলেন। রবির মতোই শরতের সেই বন্ধুটির ছিল অর্শ রোগ। চিঠিতে ‘রক্তপাতও মন্দ হচ্ছে না’ লিখলেও বিদ্যায়তনিক স্বার্থে তিনি ছিলেন অবিচল। একদা নিকটবর্তী বিরামপুর গ্রামেও গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য আহূত সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথও নিজের স্কুলে মেয়েদের ছাড়পত্র দিয়েছিলেন।
নিকটবর্তী পানিত্রাস হাইস্কুলে নিজের লেখা বই পাঠ্যরূপে বিবেচনার বিষয়ে আলোচনার জন্য শরৎচন্দ্র একবার সেখানে গিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক নামে শরৎকুমার এবং পদবির মতো এই প্রস্তাবের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন হলেও পারিপার্শ্বিক কারণে তা সম্ভব হয়নি। সমকালেই ১৯২৮ সালে বিদ্যালয়শিক্ষার তৎকালীন নিয়ন্ত্রক কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ.পরীক্ষার অন্যতম প্রশ্নকর্তা হতে অবশ্য শরৎচন্দ্রকে কেউ আটকাননি।
তিনি জীবনে এমন বিরল ছাত্রী লাভ করেছিলেন যে অভিজ্ঞতা রবিবাবুরও হয়নি। দ্বিতীয় স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবীকে বাড়িতে লেখাপড়া শেখাতেন শরৎবাবু। রবিপত্নীর মতোই স্বামীর কাছ থেকে বিবাহের পরে হিরণ্ময়ী নামটি উপহার পেয়েছিলেন মোক্ষদা দেবী। উভয়েই স্বামীদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের জন্য নিজেদের গয়না বিক্রি করেছিলেন। ১৯১০ সালে কবি বাল্যবিধবা প্রতিমা দেবীকে জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূরূপে পেয়েছিলেন। আর শরৎচন্দ্র সেই বছরেই মেদিনীপুরের বাল্যবিধবা মোক্ষদাকে সামতাবেড়ের শারদলক্ষ্মীতে পরিণত করেন। এদিক থেকে ভানুসিংহের তুলনায় শশী চ্যাটুজ্জে অধিক সমুজ্জ্বল।
জীবনে নানাভাবে শিক্ষকদের পাশে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। একবার গোবিন্দপুর রূপনারায়ণের বন্যায় ভেসে যাবার উপক্রম হয়েছিল। গ্রামবাসীরা ছুটে এসেছিলেন তাঁর দিদির সেজো দেবর তথা ওড়ফুলি মধ্য ইংরাজি বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক পাঁচকড়ি মুখোপাধ্যায়ের কাছে। গভীর রাতে সেই দিন শুধু নিজের বাড়ির হ্যাজাক আলো দিয়ে নয়, মাটিবাঁশ দিয়ে বাঁধবাঁধার কাজেও হাত লাগিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। 
বাজে শিবপুরে থাকাকালীন প্রতিবেশী একজন অধ্যাপকের পারিবারিক সম্ভ্রম রক্ষার জন্য নিজের চাবুক তুলে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। পাড়ার কিছু বদ ছেলে অধ্যাপককন্যাকে চিঠি দিয়েছিল। তাদের আড্ডা ভাঙতে শরৎচন্দ্রের এই প্রয়াসের জন্য পরবর্তীতে সমাজ হতে বহু অপবাদ ভেট পেয়েছিলেন।
ভারতভাস্করের মতোই পূর্ববঙ্গের সঙ্গে বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে এই ভারতচন্দ্রমার সান্নিধ্য। আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯২৫ সালের এপ্রিলে ঢাকার মুন্সিগঞ্জের সাহিত্য সম্মেলনে সাহিত্য শাখার সভাপতিত্ব করতে সেখানে গিয়েছিলেন শরৎ। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষার অধ্যাপক বন্ধু চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। সেই সম্মেলনে ইতিহাস বিভাগের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রীকে শরৎচন্দ্র কৌতুক করে ডাকতেন রমেশদিদি নামে। ১৯৩৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডি.লিট. উপাধি গ্রহণের পরে সেখানেই অসুস্থ হয়ে যান শরৎ। ঢাকার যোগেশচন্দ্র ঘোষের সর্বজ্বরবটী খেয়ে জ্বর কমেছিল তাঁর। কলকাতায় ফেরার পথে যিনি তাঁকে আগলে ‘সকল প্রকার সুখ সুবিধার প্রতি চোখ রেখেছিলেন’তিনি আর অন্য কেউ নন, ছিলেন স্বয়ং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ.এফ. রহমান সাহেব।
আশ্চর্যজনকভাবে যোগেশবাবুকে শরৎচন্দ্র অধ্যাপকরূপে পেয়েছিলেন ভাগলপুরের তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে। টাকার অভাবে সেখানে প্রথমে ভর্তি হতে না পারলে গৃহশিক্ষকতাই তাঁকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিল। তাঁর দুইজন জ্ঞাতিমামাকে পড়ানোর পরিবর্তে তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের বাবা অর্থাৎ শরৎচন্দ্রের ছোটদাদু। ছোটদিদা কুসুমকামিনী দেবীর পরিকল্পনাতেই সেদিন  শিক্ষকতায় হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর।
অন্যতম সেই প্রথম শরৎশিষ্য সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরবর্তীতে ভাগলপুরের বাঙালি স্কুল বলে পরিচিত দুর্গামোহন মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক হন। সেই কারণে শেষ জীবনে ১৯৩৪ সালেও সেই স্কুলের ঠিকানায় শরৎচন্দ্রকে আমরা চিঠি পাঠাতে দেখি। যে স্কুল তাঁর নিজের ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষা পাশের সাক্ষী, চিঠির প্রেরকরূপে সেই স্কুলের হেডমাস্টারের নাম লিখতে গিয়ে নিশ্চয়ই শিক্ষক হয়ে শ্লাঘা অনুভব করতেন তিনি।
ভাগলপুরে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ও সাহিত্যিক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় পয়সাকড়ির অভাবে অধ্যয়নত্যাগী শরৎকে এই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ১৮৯৪ সালে তাঁর প্রচেষ্টাকে সার্থক করে এন্ট্রান্স পাস করেছিলেন শরৎ।
কলেজ ও স্কুলের পাশাপাশি শরৎচন্দ্রের শিক্ষাজীবনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কথা বলতেই হয়। যাঁর হুঁকোয় তিনি তামাকের বদলে রেখে দিয়েছিলেন ইটকুচি। সেদিন বিদ্যাদাতার হাত থেকে বাঁচতে বিদ্যাদেবীর মন্দির ছেড়ে তিনি ছুটে পালিয়েছিলেন সরস্বতী নদীতীরে। সেই শরৎশিক্ষক হলেন হুগলি জেলার দেবানন্দপুরের পাঠশালার গুরুমশাই প্যারী বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্যারী পণ্ডিতের পুত্র তথা সহপাঠীর নামটি অমরত্ব লাভ করেছে শরৎচন্দ্রতপের সৃষ্টি ‘কাশীনাথ’গল্পে। হয়তো প্যারীবাবুর প্রতি উক্ত সম্বোধনটিও চিরন্তন হয়ে রয়েছে ‘পণ্ডিতমশাই’উপন্যাসে। এর প্রথমে আমরা পাই হর পণ্ডিতের নাম। কিন্তু লেখক শরৎচন্দ্রাতপের নীচে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক অন্য মূর্তিকে। তিনি হলেন বাড়ল গ্রামের বৃন্দাবন। নিজেদের চণ্ডীমণ্ডপে বিনা বেতনের পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করার পর দুপুর ও সন্ধেবেলায় চাষির ছেলেদের নিজেই পড়াতেন।‘পোড়ো’ বা পড়ুয়াদের স্লেট, পেন্সিল, কাপড়চোপড় তিনিই জোগাতেন। সন্ধ্যায় তারা পেত ঠাকুরবাড়ির প্রসাদ। বৃন্দাবন নিজে ইংরেজি শিখতেন গৃহশিক্ষক দুর্গাদাসবাবুর কাছে। দুর্গাদাসবাবু মনে করতেন, তাঁর ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র যথার্থ মানুষ হয়েছেন এই বৃন্দাবনই। তাঁর কাছে সকল সম্পত্তির বড় সম্পত্তি ছিল এই পাঠশালাটি। বিদ্যার্থীদের মধ্যে তিনি নিজের অকালমৃত পুত্র চরণকে ফিরে পেতেন। বিশ্বাস করতেন যে ভবিষ্যতে পাঠশালার একটি ছাত্রও যথার্থ মানুষ হলে তিনি পুত্রশোক ভুলতে পারবেন। কোথাও যেন সন্তানহারা রবি ঠাকুরের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল বৃন্দাবন ও তাঁর স্রষ্টা পুত্রহারা শরৎচন্দ্রের রাহুগ্রস্ত,গ্রহণক্ষয়িষ্ণু, অভিশাপিত জীবন। সংকটে বৃন্দাবনের পাশে ‘ঘরে-বাইরে’উপন্যাসের নিখিলেশের মাস্টারমশাই চন্দ্রনাথবাবুর প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন দুর্গাদাসবাবু। তাঁর মাধ্যমেই পাওয়া ‘পণ্ডিতমশাই’খেতাবকে তাই জীবনভর অপসারিত করতে পারবেন না বৃন্দাবন। শেষে নিজের গ্রাম ত্যাগ করলেও যেখানেই যাবেন কপর্দকশূন্য অবস্থাতেও সুযোগমতো বিদ্যা দান করবেন ও বিদ্যার্থীদের মধ্যেই নিজের বেঁচে থাকার প্রত্যয়ই তিনি বিদায়বেলায় প্রকাশ করেছিলেন মাস্টারমশায়ের কাছে। ঐহিক সম্পত্তির পাশাপাশি তাঁর পারমার্থিক সম্পত্তিরূপী পাঠশালার দায়িত্ব তিনি দিয়ে যান দুর্গাদাসবাবুর ভাগ্নে কেশববাবুর উপর। কেশববাবু কলেজের প্রফেসর হলেও পাঠশালার গুরুমশাই হতে কুণ্ঠিত হননি। মামার কাছে শুনে এই গ্রামে তিনি প্রথম ছুটে এসেছিলেন সেই সফল পাঠশালা দেখতে। কারণ স্বগ্রামে তাঁর উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছিল। শিক্ষাদর্শের পরাকাষ্ঠা কেশববাবু মনে করতেন যে টাকা রোজগার আর উন্নতি এক নয়। 
বর্তমানে আবহ বিরাট পরিবর্তিত হলেও একদম ছোটদের কথা ভেবে ইতি টানি শরৎচন্দ্রিম নায়ক লালুর কথা দিয়ে—‘বাড়িতে মাস্টার ডেকে আনা আর পুলিশ ডেকে আনা সমান।’
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ