সন্দীপন দত্ত, নির্মাল্য সেনগুপ্ত, সোমেন পাল, মালদহ, রায়গঞ্জ, হরিরামপুর: গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বে ফুটবল হাতে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার্তা দিতেন ‘খেলা হবে’। প্রতিটি নির্বাচনি জনসভায় এটা কার্যত রীতি হয়ে উঠেছিল সেই সময়। এবারের নির্বাচনে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মেগা জনসভা সেরে ফেলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। ‘যতই কর হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভোটের ময়দানে নেমে পড়েছে জোড়াফুল শিবির। এই আবহে শুক্রবার তৃণমূল সুপ্রিমো জানিয়ে দিলেন, ‘খেলা এবারও হবে। দুরন্ত খেলা!’ হাজার হাজার জনতাকে সাক্ষী রেখে মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে তুলে দৃপ্ত কণ্ঠে বাংলার অগ্নিকন্যার ঘোষণা, ‘আমরাই আবার ক্ষমতায় ফিরব।’
শুক্রবার উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর এবং মালদহ জেলার মালদহ বিধানসভা কেন্দ্রে জনসভা করেন তিনি। তিনটি সভা থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়ান তিনি। কোন অঙ্কে ‘খেলা’ হবে, বক্তব্য রাখতে গিয়ে তার আভাসও দিয়েছেন মমতা। বলেছেন, ‘যে বিজেপি মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাদের এবার যোগ্য জবাব দেবে বাংলার মানুষ।’ তাঁর আহ্বান, ‘হয়রানি, হেনস্তা, বঞ্চনার জবাব বিজেপিকে দিতে হবে। আপনারা দেবেন। ইভিএমে। রাজনীতির ময়দান থেকে মুছে দিন বিজেপিকে।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মমতা স্মরণ করিয়ে দেন, ‘২০২৪ সালে যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন, আজ যদি তাঁরা অনুপ্রবেশকারী হন, তাহলে ওই ভোটের মাধ্যমে যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি কী? কাউকে অনুপ্রবেশকারী বলার আগে উনি নিজে পদত্যাগ করুন।’ যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চলবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নেত্রী। তাঁর আশ্বাস, ‘ভয় পাবেন না। আমি বেঁচে থাকতে কাউকে ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে দেব না। বরং আপনাদের বলব, যারা বাংলার মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে, তাদের জব্দ করুন। বিজেপি বাবলা কাঁটা। ওরা বিভাজন ছাড়া কিছু জানে না। মা আর আম্মার মধ্যে ফারাক করে। ওদের ধর্ম হল আসলে অধর্ম। আর আমাদের মানবধর্ম। এখন ওরা আবার নতুনভাবে বাংলাকে ভাগ করতে চাইছে। বিল আনবে। বিহারের কয়েকটি জেলার সঙ্গে বাংলার কিছু জেলা কেটে আলাদা রাজ্য করবে।’
‘অগণতান্ত্রিকভাবে’ ভোটে জেতার জন্য বিজেপি যেভাবে বাংলাকে ‘টার্গেট’ করেছে, তার কিছু তথ্য ইতিমধ্যে সামনে এনেছে তৃণমূল। সেখানে রাজ্যের শাসক দলের তরফে রীতিমতো তথ্য পেশ করে দেখানো হয়েছে, অন্য রাজ্যের ভোটারদের বাংলার তালিকায় নাম ঢোকানোর জন্য কীভাবে চক্রান্ত চলছে। মমতার কথায়, ‘বিহারের অনুকরণে বাংলা দখলের টার্গেট নিয়েছে বিজেপি। তার জন্য বাংলার প্রকৃত ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। সামনে থেকে না পেরে পিছন থেকে খেলায় নেমেছে বিজেপি। আগের ভোটে বাইরে থেকে লোক, টাকা নিয়ে এসেছিল। কেন্দ্রীয় এজেন্সিকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এবারও তাই করছে।’ মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ, ‘সিআরপিএফের গাড়িতে করে টাকা আসছে। আমার কাছে সব খবর আছে। ট্রেনে করে অস্ত্র, টাকা ঢুকছে। সেই টাকা কোথায় কার কাছে যাচ্ছে, সব রেকর্ড আছে। সময় মতো জানাব।’
এতসবের পরেও সর্বসাধারণের জন্য বাংলার মা-মাটি-মানুষের সরকার যে উন্নয়ন করেছে, তার নিরিখেই রাজ্যের মানুষ তৃণমূলের পাশে থাকবে বলে আত্মবিশ্বাসী মমতা। এই সূত্রে তাঁর মন্তব্য, ‘বিগত পাঁচ বছর আমি বাংলাকে পাহারা দিয়েছি। এবার ভোটের সময় আমাকে আপনারা পাহারা দেবেন। তাতে মানুষের হয়ে কথা বলতে বাড়তি অক্সিজেন মিলবে। আমিও বাংলার মেয়ে। আমরাই থাকব। তৃণমূল কংগ্রেস জিতবে।’ দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তৃণমূল নেত্রীর বার্তা, ‘অতিরিক্ত উত্তেজিত হবেন না। কেন্দ্রীয় বাহিনী যদি ভোট দিতে বাধা দেয়, তাহলে প্রতিবাদ করুন। মহিলারা প্রয়োজনে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নামুন।’