নিজস্ব প্রতিনিধি, শিলিগুড়ি: তিনবছর আগে সিকিমে দক্ষিণ লোনক হ্রদ বিপর্যয় কিংবা এবার নেপালে হড়পা বানের বিধ্বংসী পরিণতি ভাবাচ্ছে উত্তরবঙ্গকেও। প্রশ্ন উঠছে, দার্জিলিং কিংবা কালিম্পং পাহাড়ে যেভাবে বেআইনি নির্মাণ বাড়ছে, পাহাড় কেটে রাস্তা, টানেল তৈরি হচ্ছে কিংবা নদীতে বাঁধ দিয়ে যেভাবে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ব্যারেজ নির্মাণ হচ্ছে, নদীখাতে দিনের পর দিন যেভাবে বসতি, হোটেল-রিসর্ট বাড়ছে, তাতে যেকোনো দিন উত্তরের বুকে আছড়ে পড়তে পারে ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এমনটাই আশঙ্কা করছেন ভূ-বিশেষজ্ঞ থেকে নদী ও পরিবেশবিদরা। সেক্ষেত্রে মুহূর্তের মধ্যে ছারখার হয়ে যেতে পারে গ্রামের পর গ্রাম। নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে বিস্তীর্ণ জনপদ।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান সুবীর সরকার বলছেন, সিকিম হোক বা নেপাল, এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে ভাবার সময় এসেছে, উত্তরবঙ্গ কিন্তু মোটেই সুরক্ষিত নয়। পাহাড়ের কতটা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে কিংবা তিস্তার মতো খরস্রোতা নদীতে আদৌও আর বাঁধ দেওয়া উচিত কি না বা পাহাড়-ডুয়ার্সে নদীর কোল ঘেঁষে যেসব নির্মাণ হচ্ছে, সেগুলি চলতে দেওয়া হবে কি না, এসব নিয়ে অবিলম্বে সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন।
পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের বিভাগীয় প্রধান শশাঙ্ককুমার গায়েনেরও মন্তব্য, নেপালের দৃষ্টান্ত অশনিসংকেত। নদীর জায়গা ছেড়েই সুস্থায়ী উন্নয়নে নজর দিতে হবে। প্রকৃতির প্রতিশোধ কিন্তু ভয়ংকর।
উত্তরের ৬৯টি নিত্যবহ নদী হিমালয়ের হিমবাহের জলে পুষ্ট। হিমবাহ দিনকে দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের নদীখাতের ধার দিয়ে ক্রমশ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বাড়ি, রিসর্ট, রেস্তরাঁ। সাধারণ বন্যায় ধীরে ধীরে এলাকা প্লাবিত হয়। কিন্তু হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ক্ষেত্রে তার শক্তি অনেক বেশি। জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ধ্বংসলীলা চালিয়ে চলে যায়।
এমনিতেই উত্তরের তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা, কালজানিসহ বহু নদীর নাব্যতা কমে গিয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পলি, বালি, পাথরে এইসব নদীর বেড উঁচু হয়ে গিয়েছে কয়েক ফুট। তার উপর তিস্তার আপার কোর্সে বহুবছর ধরে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। নীচের দিকে তৈরি করা হয়েছে ব্যারেজ ও মাইলের পর মাইল নদীবাঁধ। প্রযুক্তির জোরে নদীর নিজস্ব জায়গায় ঢুকে পড়েছে মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা বিপজ্জনক।
তিস্তার উৎপত্তি জেমু হিমবাহ থেকে। গিরিখাত বেয়ে সমতলে নেমে এসেছে। এই তিস্তার উপরে একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া জলপাইগুড়ির গজলডোবায় রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ। তথাকথিত উন্নয়নে রঙ্গিত এবং ডিকচু নদীকেও রেয়াত করা হয়নি। ড্যাম ভেঙে বিপর্যয়ের বহু নজির রয়েছে। তারপরও সংযত নই আমরা। সব মিলিয়ে প্রমাদ গুনছেন বিশেষজ্ঞরা।