শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: খোদ হাওড়ার ডিআরএম অফিসে বসেই চলছিল চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার কারবার। ইস্যু করা হচ্ছিল জাল নিয়োগপত্র। প্রার্থীদের হাজিরা দেওয়ার জন্য ভুয়ো ‘অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার’ পর্যন্ত রাখা থাকত ওই অফিসে! অন্যতম অভিযুক্ত তীর্থঙ্কর মিত্র হাওড়া রেল পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতেই সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। উদ্ধার হয়েছে রেলেওয়ে রিক্রুটমেন্টে বোর্ডের ভুয়ো ফর্ম, মেডিকেল সার্টিফিকেট, জাল হাজিরা খাতা ও বিভিন্ন আধিকারিকের নকল স্ট্যাম্প।
রেল পুলিশ সূত্রে খবর, ৯ সেপ্টেম্বর এক যুবক হাওড়ার ডিআরএম অফিসে ঢুকে একটি হাজিরা খাতায় সই করেন। সন্দেহ হওয়ায় ওই যুবককে আরপিএফ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে, রেলে চাকরি পেয়েছেন তিনি। তাঁকে চাকরি করে দিয়েছেন তীর্থঙ্কর মিত্র নামে ডিআরএম অফিসেরই এক কর্মী। এরপর ওই অফিস থেকেই ধরা হয় তীর্থঙ্করকে। আরপিএফের অভিযোগের ভিত্তিতে হাওড়া জিআরপি একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে।
রেল পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, গড়িয়ার বাসিন্দা তীর্থঙ্করের মা রেলে কর্মাশিয়াল বিভাগে কাজ করতেন। হাওড়া সহ তাঁর পোস্টিংয়ের জায়গাগুলিতে নিয়মিত যেত ছেলে। সেই সূত্রেই বিভিন্ন আধিকারিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। রেলে কীভাবে নিয়োগ হয়, অফিসারদের হাতে কাদের নিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে, কারা গ্রুপ ডি সহ বিভিন্ন পদের নিয়োগপত্র দেন—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা ছিল তার। সেলসের কাজে সাফল্য না পেয়ে তীর্থঙ্কর রেলে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা শুরু করে বলে অভিযোগ। পরিচিত এক শিক্ষককে দিয়ে চাকরির পরীক্ষার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলায়। সেখানে আসা পড়ুয়াদের মধ্য থেকে প্রার্থী জোগাড় করা হতো। সেন্টারের শিক্ষকই রেলে নিশ্চিত চাকরির প্রস্তাব দিয়ে বলতেন, আগ্রহী হলে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আর খরচ হবে ১০-১২ লক্ষ টাকা।
হাওড়া স্টেশনে আরপিএফের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়া যুবকও জানান, শিক্ষকের কাছ থেকেই তিনি টাকার বিনিময়ে নিশ্চিত চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। এরপর তীর্থঙ্কর গত জুন মাসে যোগাযোগ করে তাঁকে হাওড়ার ডিআরএম অফিসের সামনে দেখা করতে বলে। তিনি সেখানে হাজির হলে তাঁকে অফিসের ভিতরে এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যায় তীর্থঙ্কর। সেই ব্যক্তির কাছে বায়োডেটা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা করেন যুবক। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা শেষে মেডিকেল টেস্টও করানো হয়। তারপর নিয়োগপত্র দিয়ে বলা হয়, ডিআরএম অফিসেই পোস্টিং। তীর্থঙ্কর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে হাজিরা খাতায় সই করাত।
তীর্থঙ্করকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রেল পুলিশ জানতে পারে, রেলে একাধিক আধিকারিকের সঙ্গে পরিচিতির দৌলতেই সে ডিআরএম অফিসে নিয়মিত বসত। অফিসে বসেই যে সে প্রতারণা চালাত, তার প্রমাণ মিলেছে ক্যামেরার ফুটেজে। চাকরিপ্রার্থীরা তাকে টাকা দিতেন নগদে। এখনও পর্যন্ত তীর্থঙ্করের কাছে গোটা দশেক ভুয়ো নিয়োগপত্র মিলেছে। তবে সংখ্যাটা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। রেলের কোনও অফিসার এই চক্রে জড়িত কি না, খতিয়ে দেখা চলছে।