প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজীব গান্ধী ভারতবাসীর চোখ খুলে দিয়েছিলেন। তিনি সখেদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সরকারের দেওয়া প্রতিটি টাকার মাত্র ১৫ পয়সা প্রকৃত বেনিফিসিয়ারির কাছে পৌঁছয়। মাঝপথেই নয়ছয় হয়ে যায় বাকি অর্থ।’ সে ১৯৮৫ সালের ঘটনা। তিনি তখন দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। এহেন দেশনেতা দেশবাসীর দুঃখকষ্ট চর্মচক্ষে পরখ করতে চেয়ে পৌঁছেছিলেন ওড়িশার কালাহান্ডিতে। তখন সেখানে জারি কংগ্রেসের শাসন এবং গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রবীণ নেতা জানকীবল্লভ পট্টনায়ক মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে। কিন্তু সেই রাজ্যের মানুষের চরম দুর্দশা দেখে তিনি এমন বিমর্ষ ও ক্ষুব্ধ হলেন যে, তা প্রকাশ করে ফেললেন জনসমক্ষে। পরবর্তীকালে দেশের একাধিক আদালত, দুর্নীতি মামলার বিচারে রাজীবের ওই মন্তব্য উদ্ধৃত করে তাদের পর্যবেক্ষণ কিংবা রায় দিয়েছে। রাজীব গান্ধী সেদিন নতুন কিছু বলেননি। এদেশের একটি শিশুর কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার। কিন্তু নতুন যেটা, তা হল একজন প্রধানমন্ত্রীর তরফে প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে নেওয়া। রাজীবের খাঁটি জনদরদ এবং স্বচ্ছ মনের প্রকাশ ঘটেছিল ওই ঘটনায়। একথা বলা দরকার যে, তাঁর আগে এবং পরে কোনও দেশনেতাকে এমন ভূমিকায় আমরা পাইনি। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনীতির কারবারিদের বিষোদ্গার থেমে নেই। সঙ্গে চলছে ‘আমরা-ওরা’ কিংবা ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন-ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বের অনুশীলন। তার ফলে সরকারি পর্যায়ে রকমারি তদন্ত এবং আদালতে আদালতে বিচার চললেও প্রকৃত দোষীরা অধরাই থেকে যাচ্ছে। দুর্নীতি-বিরোধী যুদ্ধের নামে ভারতের এই আজগুবি কাণ্ড অবশ্য আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এড়ায়নি। স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে ভারতের স্থান এজন্য বরাবরই একেবারে নীচের দিকে থাকছে। ক্রমান্বয়ে দু-দশ ধাপ উত্তরণই প্রত্যাশা করে সুস্থ সমাজ। কিন্তু ভারতবাসী এমনই মন্দকপাল যে, অধিকাংশ বছর আমাদের অবনমনই ঘটছে দু-চার ধাপ করে।
এই প্রসঙ্গে চলে আসে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের (মনরেগা) কথা। আমরা জানি, গরিব গ্রামবাসীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য ইউপিএ সরকার এই যুগান্তকারী প্রকল্পটি চালু করেছিল। এই প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রমিকরা দাবি করামাত্রই সরকার বছরে কমপক্ষে ১০০ দিনের কাজ দিতে বাধ্য। অর্থাৎ এই প্রকল্পে গ্রাম ভারতের গরিব মানুষের হাতে কিছু টাকা যায়। তার মাধ্যমে তাদের সংসারে কিছু সুরাহা হয় এবং পরোক্ষে চাঙ্গা হয় গ্রামীণ বাজার। কিন্তু চোর-ছ্যাঁচড়দের থেকে সরকারি প্রকল্প রক্ষা করা সবসময়ই কঠিন। মনরেগাও এই ব্যাধিমুক্ত নয়। অসাধু রাজনীতির কারবারিরা ভুয়ো জব কার্ড দিয়ে এই প্রকল্পের কিছু টাকা হাতিয়ে নেয়। এই অনাচার কমবেশি সারা দেশেই চলে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। যেমন গত অর্থবর্ষে (২০২৪-২৫) অনেকগুলি রাজ্যে ভুয়ো জব কার্ড চিহ্নিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিহার (৮,১১১), ওড়িশা (৭,৫৬৬), অসম (৭,৩৪১), ছত্তিশগড় (৬,৮৮৮), উত্তরপ্রদেশ (৩,৪২১), মহারাষ্ট্র (১,৪০১), গুজরাত (৯৮৮), মধ্যপ্রদেশ (৮০৪), ত্রিপুরা (২৮৩), পশ্চিমবঙ্গ (২)। সংসদে মোদি সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গোটা দেশে গত অর্থবর্ষে ৫৮,৮২৬টি ‘ফেক জব কার্ড’ বাতিল হয়েছে। তার মধ্যে ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যেই ৪২,৭৩৮টি। তার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা রীতিমতো ইতিবাচক। এখানে মাত্র ২টি ভুয়ো জব কার্ড পাওয়া গিয়েছে।
অথচ ‘গেরুয়া’ রাজ্যগুলির বিষয়ে দিল্লিওয়ালাদের কোনও হেলদোল নেই। ‘অস্পৃশ্য’ একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা। মাত্র দুটি ভুয়ো কার্ডেই বাংলায় মনরেগার কাজ বন্ধ। শুধু গতবছর নয়, টানা সাড়ে তিনবছরেরও বেশি সময় যাবৎ বাংলার লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের সঙ্গে বঞ্চনা চলছে। কিন্তু কেন? কেন্দ্রের অভিযোগ, বেহাত হয়েছে সরকারি অর্থ। রয়েছে জাল জব কার্ড। কিন্তু ফেক জব কার্ডের সংখ্যা কত? লোকসভায় জানতে চেয়েছিলেন তৃণমূলের মালা রায়। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কমলেশ পাসোয়ান তার যে জবাব দিয়েছেন তাতেই স্পষ্ট বৈষম্যের সর্বকালীন রেকর্ড গড়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলায় একটিও ভুয়ো জব কার্ড থাকা কাম্য নয়। একইসঙ্গে এই বৈষম্যের নীতিতে এখনই ইতি পড়ুক। না-হলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। অচিরে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং ঐক্য-সংহতি রক্ষার প্রয়াসও।