Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অপারেশন সিন্দুরের সাফল্যে সন্তুষ্টির জায়গা নেই

আমাদের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ অনিল চৌহান কিংবা বায়ুসেনা প্রধান অমৃতপ্রীত সিং অপারেশন সিন্দুরের অভাবনীয় সাফল্যের পর পুরস্কৃত হননি, পদোন্নতিও হয়নি। ওকথা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি।

অপারেশন সিন্দুরের সাফল্যে সন্তুষ্টির জায়গা নেই
  • ২৫ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: আমাদের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ অনিল চৌহান কিংবা বায়ুসেনা প্রধান অমৃতপ্রীত সিং অপারেশন সিন্দুরের অভাবনীয় সাফল্যের পর পুরস্কৃত হননি, পদোন্নতিও হয়নি। ওকথা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি। পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে যুদ্ধে হারলেও সেনাপ্রধানের কপাল খোলে! নিমেষে পদোন্নতি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতার ষোলোআনা দখলও হাতে চলে আসে অল্প সময়ে। আটটি বিমান ঘাঁটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরও যে মুলুকে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শালের মর্যাদা পেয়ে যান সেই দেশটির নাম নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জেনারেল আসিম মুনির। পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল। পহেলগাঁও হামলার আগে যিনি বলেছিলেন, কাশ্মীর পাকিস্তানের গলার শিরা। তাকে দখল করতেই হবে। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের কথা। তার পরই রক্তাক্ত বৈসরণ। কারণ নির্বিচারে হিন্দু হত্যাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্রের একমাত্র চালিকাশক্তি। বাকি সব ব্রাত্য।

Advertisement

ঠিক এই কারণেই অপারেশন সিন্দুরে জিতলেও আত্মসন্তুষ্টির কোনও জায়গা নেই ভারতের সামনে। টালমাটাল পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের জন্য মোটেই স্বস্তির খবর হতে পারে না। দুই রাষ্ট্রই কট্টর মৌলবাদী আর ইসলামিক সেনা শাসনে যাওয়ার অর্থ জঙ্গিদের বাড়বাড়ন্ত। ভারত বিরোধী জিগির এবং সীমান্ত পেরিয়ে এপারে হামলার নতুন নতুন ব্লুপ্রিন্ট। যার নিট ফল, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দূরে সরিয়ে ক্রমশ অশান্ত সীমান্ত। বেআইনি অনুপ্রবেশ। গোলা-গুলি, লোকক্ষয়। দুই দেশই জানে  মুখোমুখি লড়াইয়ে ভারতের সঙ্গে পেরে ওঠা তাদের পক্ষে আগামী একশো বছরেও সম্ভব নয়। ধুরন্ধর সুযোগসন্ধানী চীন যতই অস্ত্র দিক, আধুনিক যুদ্ধবিমান পাঠাক, ড্রোনের মালা পরিয়ে দিক, তা ব্যবহারের মতো প্রশিক্ষিত সেনা নেই পাকিস্তানে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই ইসলামাবাদের সেই অসহায়তা প্রত্যক্ষ করেছে উন্নত বিশ্ব। মুখ থুবড়ে পড়েছে চীনের যুদ্ধবিমান ও ড্রোন। এখন হতাশা ঢাকতে বৈশাখী সেলের মতো ৫০ শতাংশ ছাড়ে বেজিং দ্রুত জে ৩৫এ যুদ্ধবিমান দিলেও বিশেষ লাভ হওয়ার নয়। তবু বার বার হেরেও আক্কেল হয় না পাকিস্তানের। সোজাসুজি লড়াইয়ে পেরে ওঠা সম্ভব নয় বুঝেই ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রতিনিয়ত হামলার ব্লুপ্রিন্ট তৈরিতে মেতে ওঠে সেনা ও জঙ্গি নিয়ন্ত্রিত সরকার। অপারেশন সিন্দুরে সাফল্যের পরও তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ পাকিস্তানের আঁচড়ানো কামড়ানো বন্ধ হবে না। ভবিষ্যতেও পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকার মতো কোনও নিভৃত পর্যটক স্থল, ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা ধর্মীয় স্থান যে এভাবে রক্তাক্ত হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? আবার ভূস্বর্গে বেড়াতে গিয়ে হিমেল অপরাহ্নে কেউ স্বামীকে হারাবে, কেউ সন্তান, নিকট প্রিয়জন! দেশবাসীর হৃদয়ে তৈরি হবে গভীর ক্ষত। ‘ধর্ম পুছ কর হত্যা’ চলতেই থাকবে। আজকের ‘সিন্দুর’ সেদিন আরও বড় ‘বারুদ’ হয়ে হয়তো ঝরে পড়বে। রাফাল, তেজস, সুখোই ঝাঁপিয়ে পড়বে শত্রু ভূখণ্ডে। কিন্তু যতদিন মানচিত্রে পাকিস্তান থাকবে এই উপদ্রব সমাপ্ত হওয়ার নয়। যেমন থামবে না ওদেশের সেনা অভ্যুত্থানের কিস্‌সা। ওই ভয়েই কি শাহবাজ শরিফ দ্রুত সেনাপ্রধানকে প্রমোশন দিলেন?
বিগত সাড়ে সাত দশকের স্বাধীনতা উত্তর ইতিহাসে গণতন্ত্রের ছদ্ম ঘোমটার আড়ালে পাকিস্তানের আসল ক্ষমতা সেনা আর জঙ্গি সংগঠনের হাতেই ন্যস্ত। চিররুগ্ন গণতন্ত্র সদা আইসিইউতে। স্বাধীনতার পর পরই সৈয়দ আয়ুব খান প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। সেটা ছিল ১৯৫৮-৫৯। তারপর বারে বারে ইসলামাবাদে সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ করেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চ। অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে নির্বাচিত সরকার। আয়ুব খানের পর ইয়াহিয়া খানের পরিণতিও সবার জানা। পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো নির্বাচনে জিতেও পুরো মেয়াদ থাকতে পারেননি। সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা চলে গিয়েছে জেনারেল জিয়া উল হকের হাতে। শেষপর্যন্ত ভোটে কারচুপির অপরাধে ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছে রাওয়ালপিন্ডির জেলে। ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল।  ভুট্টো কন্যা বেনজিরেরও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। প্রচার চলাকালীন গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর শরীর। বেনজিরের স্বামীই বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাও শূন্য, আগাগোড়া সেনার হাতের পুতুল!
এই মুহূর্তে পাকিস্তানে পারভেজ মোশারফের ভূতই তাড়া করছে নওয়াজের ভাই শাহবাজ শরিফকে। কারগিল যুদ্ধে পরাজয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশারফ। গদিচ্যুত হয়েছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রীর দাদা নওয়াজ শরিফ। সেই ঘটনারই আতঙ্ক তাড়া করছে শাহবাজকে। সেই কারণেই গণতন্ত্রকে আর একটু অক্সিজেন দিতে সেনা প্রধানকে তুষ্ট রাখার চেষ্টা। অপারেশন সিন্দুরে পাকিস্তান পর্যুদস্ত। অন্তত আটটি বায়ুসেনা ঘাঁটি বিপর্যস্ত। জঙ্গি শিবির ধ্বস্ত। অথচ সেনাপ্রধান এবং পহেলগাঁও হামলার প্রধান মাথা জেনারেল আসিম মুনির হিরো। এই ঘটনাই প্রমাণ করে নওয়াজ শরিফের ভাইও ২৬ বছর আগের মতোই যে কোনওসময় সেনা অভ্যুত্থানের ভয়ে কাঁটা। সেই আতঙ্ক থেকেই পরাজিত সেনাপ্রধানকে প্রমোশন দিয়ে একটা ভারসাম্য রক্ষার মরিয়া চেষ্টা চালালেন বটে। তবে রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ যেমন সহজে পোষ মানে না তেমনি ফিল্ড মার্শাল হয়েই আসিম মুনিরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে থেমে যাবে তাও হলফ করে বলা যায় না। তিনিও যে সৈয়দ আয়ুব, জিয়া উল হক, পারভেজ মোশারফের মতো কিছুদিনের মধ্যে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরবেন না, তা কে বলতে পারে! পাকিস্তানের রাষ্ট্রশক্তির প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে সেনা ও জঙ্গির যুগলবন্দিতে। এবং কট্টর ভারত বিরোধিতায়। ওইটাই পাকিস্তানের ডিএনএ। তাই আবার বলছি, কারগিলের পর যেমন জঙ্গি কার্যকলাপ কমেনি তেমনি অপারেশন সিন্দুরের সাফল্যে ভারতের বিন্দুমাত্র আত্মসন্তুষ্টির জায়গা নেই। আবার প্রতিবেশী বাংলাদেশেও অন্তর্বর্তী সরকারের মাথা ইউনুস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এবং সেখানেও সেনা প্রধান ওয়াকারউজ্জামান রিংয়ের বাইরে অপেক্ষা করছেন ক্ষমতা দখলের জন্য। বাংলাদেশেও আগামী ডিসেম্বরের পর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার অধিষ্ঠিত হয় কি না সেদিকেই দিল্লির শাসকের কড়া নজর থাকবে। দেখতে হবে ইউনুসের হালও হাসিনার মতো হয় কি না?
১০ মে অপরাহ্নে হোয়াইট হাউসে বসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লিখেছিলাম পাকিস্তানকে কোনওমতে বিশ্বাস করা যায় না। ইতিহাসই তার প্রমাণ। আজ বলছি, ক্রমশ ইসলামিক মৌলবাদের দিকে ঢলে পড়া বাংলাদেশেরও সেই একই অবস্থা। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই কথাটা সত্যি হয়ে গেল। বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ফিরবে নাকি সেনার হাতেই ক্ষমতা যাবে তা কোটি টাকার প্রশ্ন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে গণতন্ত্র, নির্বাচিত সরকার এসব চিরদিনই সোনার পাথরবাটি। শুধু মুখ আর কাঠামো বদল হয়, ভিতরের মৌলবাদী আত্মার বিনাশ নেই। 
সেই কারণেই হেরেও পাকিস্তানের রণংদেহি হুঙ্কার বন্ধ হয় না। দু’দেশের চলমান উত্তেজনার আবহে পাক সেনার মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরি প্রকাশ্য সভায় ভারতকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমরা যদি আমাদের জল আটকে রাখো, আমরা তোমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেব!’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী দু’দিন আগেই স্পষ্ট বলেছেন, পৃথিবীর কোনও শক্তি সিন্ধু জলচুক্তি ফের চালু করার ব্যাপারে রাজি করাতে পারবে না। এর পরিণাম, ভারতের ‘ওয়াটার স্ট্রাইক’-এ আগামী দিনে উত্তেজনা বাড়বে। এই অবস্থায় ফের নিজের স্বার্থে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়িয়েছে চীন। পাক বায়ুসেনাকে মজবুত করতে বিপুল সংখ্যায় পঞ্চম প্রজন্মের লড়াকু জেট সরবরাহ করতে চলেছে সামান্য দামে। চলতি বছরের আগস্টের মধ্যেই চীনের জে-৩৫এ লড়াকু জেটের প্রথম ব্যাচ হাতে পাবে পাক বায়ুসেনা। মোট ৪০টি যুদ্ধবিমান কিনেছে ইসলামাবাদ। চীনের এ হেন ‘উদারতা’র নেপথ্যে একাধিক কারণের কথা বলেছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। ফৌজি অফিসারদের দাবি, ‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং তাকে কেন্দ্র করে চার দিনের ‘যুদ্ধে’ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ড্রাগন দেশের হাতিয়ার। বিশ্ব বাজারে হু-হু করে কমেছে চীনা অস্ত্রের চাহিদা। পাক বিমানবাহিনীর ব্যবহার করা ওই ব্যর্থ হাতিয়ারটির নাম পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র। ভারতের লড়াকু জেটকে ধ্বংস করতে বড় মুখ করে অস্ত্রটি যে ছোড়া হয়েছিল, কাজে আসেনি। সাংবাদিক বৈঠকে করে তা স্বীকার করে নিয়েছে ইসলামাবাদ। গোটা বিশ্ব সুনাম করছে ভারতের তৈরি ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ ও দুর্দান্ত ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের। বেজিং তা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। আবার ভারতকে স্থায়ী যুদ্ধে ব্যস্ত রাখতে পারলে উন্নয়ন থমকে যাবে। অর্থনীতির গতি রুদ্ধ হবে। তাই চীনের উদ্দেশ্য বিবিধ। পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা থেকে ভারতকে বিরত করা।
এসবই একটু দূরের কথা। কিন্তু যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, যাঁদের সিঁদুর মুছে গিয়েছে নিষ্পাপ নিস্তরঙ্গ বৈসরণ উপত্যকায়, তাঁরা বাকি জীবনটা কাটাবেন কোন সান্ত্বনায়? ‘মালা জমতে জমতে যেমন পাহাড় হয়, ফুল জমতে জমতে পাথর।’ এ তো বিখ্যাত কবির উপলব্ধি ও উচ্চারণ। কিন্তু আমাদের মতো জঙ্গি হামলায় উজাড় হওয়া সাধারণ পরিবারের শোক? সিঁদুর জমতে জমতে বারুদ, সেও রাজনীতিকের হুঙ্কার! জঙ্গি রাষ্ট্র পাকিস্তানের স্বরূপ শুধু বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরলেই হবে না। প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েই চলতে হবে। মনে রাখতে হবে ভারতের আর্থিক, সামাজিক ও সামরিক উন্নয়নে চীন ঈর্ষান্বিত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতকে যুদ্ধের কানাগলিতে ব্যস্ত রাখাই ড্রাগনের দেশের বড় কৌশল। ভারতের শত্রুদেশের হাতে গোটা অস্ত্রসম্ভার তুলে দিতেও তাই ওরা কার্পণ্য করবে না। সতর্ক থাকতেই হবে। কিন্তু দোহাই আপনাদের, সেনাবাহিনীর এই শৌর্য ও সাফল্যকে কেউ যেন ভোট কিনতে ব্যবহার না করেন। তাহলে গোটা দেশের মানুষের ঐক্য আবার ভেঙে যাবে। আমরা আবার বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যাব। কোনটা ট্রেলার আর কোনটা পিকচার এই গোলকধাঁধাতেই যেন আমাদের জীবন না কাটে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ