মানব সভ্যতার একেবারে আদি থেকেই আমরা দেখতে পাই—বিশ্ব রহস্য জানবার জন্য মানবের চেষ্টা চলেছে। একদিকে, সে যেমন জটিল ক্ষেত্রসমূহ ও অসংখ্য জীবসমেত প্রকৃতি যেমন প্রতীয়মান তার বিশ্লেষণে প্রয়াসী, অন্যদিকে তেমন বিশ্বের আদি কারণ অনুসন্ধানেও সচেষ্ট। মানব মনের এই চির-পুরাতন প্রশ্ন নিয়েই শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের শুরু:
ব্রহ্মবাদিগণ পরস্পর আলোচনা করছেন: জগৎ কারণ কি? ব্রহ্মই কি কারণ? আমরা কোথা হতে উৎপন্ন হয়েছি? কেন, কার দ্বারা জীবিত আছি? আমাদের শেষ বিশ্রাম কোথায়? কার পরিচালনাধীনে আমাদের মতো ব্রহ্মবিদের সুখ-দুঃখ ভোগের ব্যবস্থা হয়ে থাকে? পরের শ্লোকে, পরস্পর জিজ্ঞাসারত ঐ ব্রহ্মবাদিগণ সম্ভাব্য জগৎ কারণ সম্বন্ধে আলোচনা করছেন। কাল, স্বভাব, নিয়তি, যদৃচ্ছা, ভূত, বস্তু, তেজ, মন বা অহংকার জগৎ-কারণ হতে পারে কি না, তা বিচার করেন ও সিদ্ধান্তে আসেন যে, এরা বা এদের সংহতি কারণ হতে পারে না। কেন না এরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল। শুধু যুক্তি বিচারের দ্বারা ঐ মূল প্রশ্নগুলির সমাধান পাওয়া সম্ভব নয় বুঝে ব্রহ্মবাদিগণ ধ্যান অভ্যাস করতে থাকেন। তাঁরা গভীর ধ্যান সহায়ে সব জীবে স্ব-প্রকাশ-শক্তি অবিকারী পরমাত্মা—ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেন; কাল থেকে অহং পর্যন্ত সব কিছুর কার্যাবলী তাঁরই অধীনে হয়ে থাকে। এই পরমাত্মার স্বরূপ কি? আমরা দেখতে পাই যে, বৈদিক যুগের শুরু থেকেই হিন্দু ঋষিগণ এই বিষয় নিয়ে জল্পনা কল্পনা করছেন। ঋক্ বেদের ‘নাসদীয় সূক্তে’ বলা হয়েছে:
তখন অসৎ ছিল না সৎ-ও ছিল না, পৃথিবীও না, তার পারে অন্তরীক্ষও না। কে আবরণ করবে? কোথায়ই বা করবে? কে আশ্রয় দেবে? অগাধ জলরাশি ছিল কি? তখন মৃত্যু ছিল না, অমৃতত্বও না; দিন রাত্রির চিহ্নও সেখানে ছিল না। তিনি একাই শ্বাসহীন হয়েও নিজ স্বভাবে শ্বাস নিতেন—অন্য কিছুই ছিল না। তখন আঁধার ছিল, প্রথমে সবই আঁধারে ঢাকা অভিন্ন এক সত্তা ছিল। তখন সব কিছুর অস্তিত্ব ছিল সত্তাহীন ও রূপহীন, তপস্যার প্রভাবেই ঐ এককের উৎপত্তি হলো।
উপরোক্ত শ্লোকগুলি ব্রহ্মের সৃষ্টি-পূর্ব অদ্বৈত স্বরূপ বর্ণনা করেছে। শুদ্ধ জ্ঞানাতীত সত্তার ধারণাও যেন অদ্বৈত সত্যকে সীমিত করে ফেলে। তাই পরবর্তী কালে উপনিষদে দেখা যায় যে, পরম সত্যকে ‘নেতি’ ‘নেতি’ বলে বোঝান হয়েছে। সাংখ্যদর্শন নামে আর এক চিন্তাধারায় সত্য বস্তুর ধারণা অন্যরকম। সাংখ্য মত হিন্দু দর্শনের খুবই প্রাচীন, হয়তো প্রাচীনতর মত। এর প্রভাব অন্যসব দার্শনিক মতের উপর পড়েছিল। সাংখ্যের মনোবিজ্ঞান হিন্দুধর্মের প্রায় সব মতেই স্বীকার করে থাকে। সাংখ্যের দুটি মূল ভাগ হলো পুরুষ ও প্রকৃতি। পুরুষকে আত্মা এবং প্রকৃতিকে মন, ইন্দ্রিয়াদি সহ সকল পদার্থের মূলাধার বলা হয়।
স্বামী যতীশ্বরানন্দের ‘ধ্যান ও আনন্দময় জীবন’ থেকে