ঠাকুর হরিনাথকে সঙ্গে লইয়া পঞ্চবটীতলায় বেড়াইতে বেড়াইতে আরও বলিলেন, “শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন। ‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা’—আগে শুনলে। তারপর মনন—বিচার করে মনে মনে পাকা করলে। তারপর নিদিধ্যাসন—মিথ্যা বস্তু জগৎ হতে মন তুলে নিয়ে সদ্বস্তু ব্রহ্মের ধ্যানে লাগালে। কিন্তু তা না করে শুনলুম, বুঝলুম, কিন্তু যেটা মিথ্যা সেটাকে ছাড়তে চেষ্টা করলুম না; তাহলে কি হবে? সেটা হচ্ছে সংসারীদের জ্ঞানের মত। ওরকম জ্ঞানে বস্তুলাভ হয় না। ধারণা চাই, ত্যাগ চাই, তবে হবে। তা না হলে মুখে বলছ বটে ‘কাঁটা নেই, খোঁচা নেই।’ কিন্তু যেই হাত দিয়েছ অমনি প্যাঁট করে কাঁটা ফুটেছে, আর উঃ করে উঠেছ। মুখে বলছ, ‘জগৎ নেই, অ-সৎ, একমাত্র ব্রহ্মই আছেন’ ইত্যাদি। কিন্তু যে জগতের রূপরসাদি সামনে এল অমনি সেগুলো সত্য বলে জ্ঞান হল আর বন্ধনে পড়লে!
একবার পঞ্চবটীতে এক সাধু এল। সে লোকজনের সঙ্গে খুব বেদান্ত-টেদান্ত বলে। তারপর একদিন শুনলুম, একটা মাগীর সঙ্গে নটঘট হয়েছে। তারপর ওদিকে শৌচে গিয়েছি। দেখি, সে বসে আছে। বললুম, তুমি এত বেদান্ত-টেদান্ত বল, আবার এসব কি? সে বললে, তাতে কি? আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি তাতে দোষ নেই। যখন জগৎটাই তিন কালে মিথ্যা হলো তখন ঐটেই কি সত্য হবে? ওটাও মিথ্যা।’ আমি শুনে বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘তোর অমন বেদান্তজ্ঞানে আমি মুতে দিই।’ ওসব হচ্ছে সংসারী বিষয়জ্ঞানীর জ্ঞান। ও-জ্ঞান জ্ঞানই নয়।” সেদিন হরিনাথের সঙ্গে ঠাকুরের এই পর্যন্ত কথাই হইল। ইতঃপূর্বে হরিনাথের ধারণা ছিল উপনিষদ, পঞ্চদশী ইত্যাদি নানা জটিল গ্রন্থ না পড়িলে, সাংখ্য-ন্যায়াদি দর্শনে ব্যুৎপত্তি না হইলে বেদান্ত কখন বুঝা যাইবে না এবং মুক্তিলাভ সুদূরপরাহত থাকিবে। ঠাকুরের সেদিনকার কথাতেই হরিনাথ বুঝিলেন, বেদান্তের যত কিছু বিচার সব ঐ ধারণাটি হৃদয়ে দৃঢ় করিবার জন্য। বহু দর্শনশাস্ত্র ও বিচারগ্রন্থ পড়িয়া যদি কাহারও মনে ব্রহ্মের সত্যত্ব ও জগতের মিথ্যাত্ব অনুভূত না হয় তবে ঐসকল পড়া না-পড়া উভয়ই সমান। হরিনাথ সেদিন ঠাকুরের নিকট বিদায় গ্রহণপূর্বক কলিকাতায় ফিরিবার পথে স্থির সংকল্প করিলেন, তখন হইতে শাস্ত্রপাঠাদি অপেক্ষা সাধনভজনে অধিক মনোনিবেশ করিবেন। সংকল্প অনতিবিলম্বেই কার্যে পরিণত হইল। হরিনাথ সাধন সাগরে ঝাঁপ দিলেন।
উক্ত ঘটনার কিছুকাল পরে ঠাকুর একদিন বাগবাজারে বলরাম বসুর বাটীতে পদার্পণ করিলেন। তাঁহার আগমন-সংবাদ পাইয়া বাগবাজার অঞ্চলের গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রভৃতি ভক্তগণ অনেকে উপস্থিত হইলেন। হরিনাথের গৃহ অতি নিকটেই ছিল। আসনগ্রহণান্তে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে ছেলেটি (হরি) কোথা গা? তাকে একবার ডাক না।” জনৈক প্রতিবেশী যুবক যাইয়া তৎক্ষণাৎ হরিনাথকে ডাকিয়া আনিলেন। বলরাম বসুর বাটীর দ্বিতলস্থ প্রশস্ত বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়াই হরিনাথ ভক্তমণ্ডলীপরিবৃত ঠাকুরকে দর্শন করিলেন এবং তাঁহাকে প্রণামপূর্বক নিকটেই একপার্শ্বে বসিলেন। ঠাকুরও তাঁহাকে সহাস্যে কুশলপ্রশ্নমাত্র করিয়াই ঈশ্বরকৃপা সম্বন্ধে বলিতে লাগিলেন। ঠাকুরের দু-একটি কথার ভাবেই হরিনাথ বুঝিতে পারিলেন, তিনি উপস্থিত সকলকে বুঝাইতেছেন—জ্ঞান, বল, ভক্তি বল, দর্শন বল, কিছুই ঈশ্বরকৃপা ভিন্ন হইবার নহে। শুনিতে শুনিতে তাঁহার মনে হইতে লাগিল, ঠাকুর তাঁহার মনের ভুল ধারণাটি দূর করিবার জন্যই উক্ত প্রসঙ্গ তুলিয়াছেন। তাঁহার মনে হইল, ঠাকুর ঐ সম্বন্ধে যাহা কিছু বলিতেছেন সব তাঁহাকেই লক্ষ্য করিয়া।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দের ‘স্বামী তুরীয়ানন্দ’ থেকে