Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সারা দেশকেই সতর্ক হতে হবে

দেশের মানচিত্র থেকে অচিরেই মুছে যেতে পারে হিমাচল প্রদেশ! এমনই আশঙ্কার কথা শোনাল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই চরম উদ্বেগের নেপথ্যে রয়েছে পরিবেশ নিয়ে মানুষের যথেচ্ছাচারের সম্ভাব্য পরিণাম।

সারা দেশকেই সতর্ক হতে হবে
  • ৪ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের মানচিত্র থেকে অচিরেই মুছে যেতে পারে হিমাচল প্রদেশ! এমনই আশঙ্কার কথা শোনাল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই চরম উদ্বেগের নেপথ্যে রয়েছে পরিবেশ নিয়ে মানুষের যথেচ্ছাচারের সম্ভাব্য পরিণাম। পৃথিবী জুড়েই মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কোনও কোনও অঞ্চলে তা জনবিস্ফোরণের চেহারা নিয়েছে। মানুষের সংখ্যা, চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ-লালসা বাড়লেও পৃথিবীর আকার আয়তন স্থির। আমরা আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, তাই জনবসতি বৃদ্ধি আর সম্পদ আহরণের জন্য মানুষ থাবা বসাচ্ছে সবখানে। সমতলের সঙ্গে রেহাই পাচ্ছে না কৃষিজমি, জলাজমি, বনভূমি, পাহাড়, মালভূমি, মরুভূমি প্রভৃতিও। ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি’র দোহাই দিয়ে এবং তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর মোড়কে মানুষ যে কাণ্ড করে চলেছে, তার জন্য চাপ বাড়ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর। মানুষের এই ‘কর্মযজ্ঞ’ চলেছে ধারাবাহিকভাবে এবং এর গতিপ্রকৃতি বেড়েও চলেছে। সব মিলিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য প্রতিনিয়ত ব্যাপক হারে নষ্ট হচ্ছে এবং রুষ্ট হচ্ছে প্রকৃতিও। খারাপ থেকে আরও খারাপ হচ্ছে দেশের পাহাড়ি রাজ্যগুলির পরিস্থিতি। তার মধ্যে অবশ্যই রয়েছে হিমাচল প্রদেশের মতো একটি অতিসুন্দর রাজ্যও। সেইদিন আর দূরে নয়, যখন ভারতের মানচিত্র থেকে মুছেই যাবে গোটা হিমাচল প্রদেশ! সম্প্রতি এই ভাষাতেই পাহাড়ি রাজ্যটিকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, হিমাচলে দুর্যোগের জন্য প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এজন্য মানুষই দায়ী। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটনকে আরও ‘উন্নত’ করতে গত কয়েকবছরে হিমাচলে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে বেড়েছে। চার লেনের হাইওয়ে, রোপওয়ে, সুড়ঙ্গ এবং বসতি বিস্তারের মতো অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার নিয়মগুলি মানা হয়নি। পর্যটনই হিমাচলের আয়ের মূল উৎস। কিন্তু পর্যটনের বেলাগাম বৃদ্ধি পরিবেশের ক্ষতি করছে। তাই এই রাজ্যকে বাঁচাতে এখনই সঠিক এবং দ্রুত পদক্ষেপ করা উচিত। আদালতের মত, হিমালয়ের কোলের এই রাজ্যে যেকোনও উন্নয়নমূলক কাজের আগে ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং বাসিন্দাদের মতামত নেওয়া জরুরি। 

Advertisement

শীর্ষ আদালতের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব, লাগাতার ভূমিধস, বনাঞ্চল ধ্বংস ও অপরিকল্পিত নির্মাণই এই সঙ্কটের মূল কারণ। জুন মাসে রাজ্যের কিছু এলাকাকে ‘গ্রিন এরিয়া’ বলে ঘোষণাসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল হিমাচল সরকার। সেই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে আর্জি জমা পড়ে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টে। সংগত কারণেই উচ্চ আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। সিদ্ধান্তটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সম্প্রতি পিটিশন দাখিল হয় সুপ্রিম কোর্টে। গত বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানিতে বিচারপতি জে বি পার্দিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ জানায়, হিমাচল প্রদেশের পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর জন্য কেবল প্রকৃতিকে দায়ী করা উচিত নয়, মানুষই বিপর্যয়ের মূল কারণ। রাজ্যে নানা প্রকার নির্মাণ কাজ চলছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়াই এসব করার ফলে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। কোর্টের পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন রাজ্যের উপর দৃশ্যমান এবং উদ্বেগজনক প্রভাব ফেলছে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রকে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, রাজস্ব সংগ্রহই শেষকথা নয়, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে রাজস্ব সংগ্রহ অনুচিত। এই ধারা চলতে থাকলে হিমাচল প্রদেশ ভারতের মানচিত্র থেকেই মুছে যাবে। সেইদিন কিন্তু আর দূরে নেই। ঈশ্বরের কাছে আমাদের প্রার্থনা, এমন যেন না-হয়। উল্লেখ্য, হাইকোর্টের নির্দেশের উপর শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ করেনি।
পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে উচ্চ এবং শীর্ষ আদালত নতুন কিছু বলেনি। পরিবেশ রক্ষায় ভারতের স্থান সবার নীচে নেমে গিয়েছে আগেই। সারা পৃথিবীর ১৮০টি দেশের উপর তৈরি এনভায়রনমেন্টাল পারফর্ম্যান্স ইনডেক্সে (ইপিআই) ভারতের স্থান ১৮০তম হয়েছিল ২০২২-এ। একচক্ষু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিবেশকর্মীরা সোচ্চার কয়েক দশক যাবৎ। কিন্তু রাষ্ট্র সে-সবে কান দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করেনি। পরে আন্তর্জাতিক মহল দেশীয় পরিবেশকর্মীদের আর্তনাদেই সিলমোহর দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও যে সরকার বাহাদুরের সংবিৎ ফেরেনি সেটাই পরিষ্কার হল সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্যে। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, এই চেতাবনির লক্ষ্য আসলে সারা দেশই, একা হিমাচল নয়। কারণ গোটা দেশই বারুদের স্তূপের উপর বসে আছে। আর এখানেই অন্তিম প্রশ্ন, দেশটাকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সরকার এখনও কি আন্তরিক উদ্যোগ নেবে, নাকি পাশ কাটিয়ে যাবে বরাবরের মতোই, সংকীর্ণ রাজনীতিকে হাতিয়ার করে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ