বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট:দিন কয়েক হল পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে জড়িত তারাপীঠের জীবিতকুণ্ড সংস্কারের কাজ চলছে। পাম্প বসিয়ে বর্ধিত অংশের জল বের করা সম্ভব হলেও কিছুতেই আর খালি হচ্ছে না প্রাচীন কুণ্ডের জল! যা নিয়ে তুমুল আলোড়ন চলছে। অলৌকিক ঘটনা ভেবে ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয়রা। ইতিমধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে দূরদূরান্তেও। দীর্ঘ পথ উজিয়ে আসেছেন অনেকেই। সবার একটাই প্রশ্ন—এত জল আসছে কোথা থেকে? অলৌকিক মাহাত্ম্য ছাড়া এ জিনিস সম্ভবই নয়! অতঃপর, কুণ্ড দর্শনে পুণ্যার্জন।
তারাপীঠের গবেষক প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গ্রন্থ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, তারাপীঠের উত্তরবাহিনী দ্বারকার জল পূর্বদিকে মহাশ্মশানের ভিতর দিয়ে কৈবর্তনালায় প্রবাহিত হয়ে বর্তমান মন্দির সংলগ্ন স্থানের নীচে হ্রদ সৃষ্টি করেছিল। আগে সেই হ্রদের জল পান করলে সমস্ত অসুখ ভালো হয়ে যেত। যাকে সুধা-হ্রদ বা অমৃতকুণ্ড বলা হতো। একটি পৌরাণিক কাহিনিও রয়েছে। পালযুগের সূচনায় বীরভূমের রত্নাগড়ের বণিক জয় দত্ত দ্বারকা নদের জলপথে বাণিজ্য করতে এসেছিলেন। সাপের কামড়ে তাঁর পুত্র ধনঞ্জয়ের মৃত্যু হয়। জয় দত্ত কলার ভেলায় হ্রদের জলে ধনঞ্জয়ের দেহ ভাসিয়ে দেন। জলের স্পর্শে ধনঞ্জয় বেঁচে ওঠে। জয় দত্ত স্বপ্নাদেশ পেয়ে শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলা থেকে মায়ের শিলামূর্তি উদ্ধার করে হ্রদ থেকে ঘট ভরে মায়ের নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করেন। সওদাগরের ছেলে প্রাণ ফিরে পাওয়ার পর নাম হয় ‘জীবিতকুণ্ড’।
১২১৭ বঙ্গাব্দে সন্ন্যাসী সুখনানন্দ গোস্বামী হ্রদ সংস্কারের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে রাজা রামজীবন রায়চৌধুরিও হ্রদ কেটে বড় করেন। কথিত, এই কুণ্ডতে বামাখ্যাপা প্রত্যহ স্নান করতেন। এখনও দেবী তারাকে জীবিতকুণ্ডের জলে নিত্য স্নান করানো হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই কুন্ডের জলস্পর্শে অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পুণ্যার্থীরা এই জল মাথায় ছিটিয়ে আরোগ্য কামনা করেন।
বর্তমানে পাম্প বসিয়ে জল বের করে দেওয়ার ফলে আসল কুণ্ড বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু পাম্প চালিয়েও সেই কুণ্ডের জল শেষ করা যাচ্ছে না। সেই কারণেই অনেকে তারাপীঠে আসছেন এমন ক ঘটনার সাক্ষী থাকতে। যেমন এসেছেন শ্যামলী চট্টোপাধ্যায়। মঙ্গলবার তিনি বলছিলেন, ‘পুকুরের জল বের করার পর চারপাশ শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মূল কুণ্ডের জল কানায় কানায় ভর্তি! ওই জল কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। যা মা তারার মহিমা এবং অলৌকিক শক্তির প্রতীক।’ মন্দির কমিটির সভাপতি তারাময় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘জীবিতকুণ্ডের বর্ধিত অংশের জল বের করা সম্ভব হলেও নিচে থাকা আসল কুণ্ডের জল পাম্প চালিয়েও শেষ করা যাচ্ছে না। এটা আমাদের কাছে অলৌকিক ঠেকছে।’ যদিও গবেষক প্রবোধবাবু বলেন, ‘যেহেতু দ্বারকার জল কৈবর্তনালার মাধ্যমে এসে এই স্থানে হ্রদের সৃষ্টি করেছিল। তাই পাশে থাকা দ্বারকা নদের প্রভাব ও ভূগর্ভস্থ জলস্তরের কারণে কুণ্ডের জল শেষ হচ্ছে না।’ -নিজস্ব চিত্র