Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিকার বিদেশি অতিথিও!

২০২৩ সালে সারা দেশে মহিলাদের উপর সংঘটিত যেসব অপরাধের ঘটনা পুলিশে নথিভুক্ত হয়েছিল তার সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে চার লক্ষ! সারা দেশে সংঘটিত অপরাধের উপর এনসিআরবি প্রতিবছর একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করে।

শিকার বিদেশি অতিথিও!
  • ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০২৩ সালে সারা দেশে মহিলাদের উপর সংঘটিত যেসব অপরাধের ঘটনা পুলিশে নথিভুক্ত হয়েছিল তার সংখ্যাটি প্রায় সাড়ে চার লক্ষ! সারা দেশে সংঘটিত অপরাধের উপর এনসিআরবি প্রতিবছর একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সর্বশেষ রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে গত ১ অক্টোবর। নারীনির্যাতনের এই কদর্য পরিসংখ্যানটি তা থেকেই উদ্ধৃত। ওই রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী দু-বছরের তুলনায় ২০২৩ সালে দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে মহিলারা সার্বিকভাবে কিছুটা বেশিই হিংসার শিকার হয়েছেন। ওই রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৩ সালে মহিলাদের উপর সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা ৪,৪৮,২১১। সংখ্যাটির লক্ষণীয় বৃদ্ধির পরিমাণ পূর্ববর্তী দু-বছরের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়: ২০২২ সালে ৪,৪৫,২৫৬ এবং ২০২১ সালে ৪,২৮,২৭৮। পূর্ববর্তী বছরগুলির সঙ্গে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০২৩ সালেও নারীঘটিত অপরাধের শীর্ষে ছিল যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ। শুধু যোগীরাজ্যেই সে-বছর মহিলাদের উপর সংঘটিত ৬৬,৩৮১টি অপরাধের ঘটনা পুলিশে নথিভুক্ত হয়েছিল। 

Advertisement

অপরাধগুলির শ্রেণিবিভাগও তাৎপর্যপূর্ণ: অপহরণের সংখ্যা ৮৮,৬০৫ বা শিকার প্রতি এক লক্ষ মহিলার মধ্যে ১৩-১৪ জন। শ্লীলতাহানির মতলবে নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল ৮৩,৮৯১টি বা প্রতি এক লক্ষে ১২-১৩ জন তার শিকার! ধর্ষণ/গণধর্ষণের মতো চূড়ান্ত নারীনির্যাতনের সংখ্যাটিও ভয়াবহ—২৯,৬৭০ বা প্রতি এক লক্ষে ৪-৫ জন নির্যাতিতা! সরাসরি এমন হিংসার শিকার না-হয়েও মারাত্মক অভিজ্ঞতাসহ অপমানিত হয়েছেন প্রায় ৯ হাজার মহিলা। ওই মহিলাদের এমনভাবে অপমান করা হয়েছিল, যা তাঁদের সম্ভ্রমহানির পক্ষে যথেষ্ট। পকসো আইনে শিশুদের ধর্ষণের মামলার সংখ্যাটিও মন খারাপ করে দেওয়া—৪০ হাজারের বেশি! সব মিলিয়ে এই ছবি আমাদের অহংকারের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা, আমাদের দেশকে মায়ের আসনে বসিয়ে রেখেছি আমরা। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করি, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’! সনাতন ভারতবাসীর কাছে দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী, বৈষ্ণোদেবী, ভগবতী, অন্নপূর্ণা, কামাখ্যা, জগদম্বা প্রভৃতি দেবী আরাধ্য। আমাদের নদীগুলিও গঙ্গা, সরস্বতী প্রভতি কোনও না কোনও দেবীর নামাঙ্কিত। আমাদের বিশ্বাস, মা সরস্বতীর কৃপা ভিন্ন আমরা বিদ্যালাভ করতে পারি না। মা লক্ষ্মী প্রসন্ন না-হলে আমাদের আর্থিক সমৃদ্ধি আসে না। আমরা দুর্গানাম নিয়েই যেকোনও যাত্রারম্ভ করে থাকি। কিন্তু বাস্তব জীবনে নারীর স্থান কোথায় এই ভারতীয় সমাজে? উত্তরটা এনসিআরবির রিপোর্টেই পরিষ্কার নয় কি? এতে আমাদের মাথা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে নীচুই হয়ে যায়। 
অপরাধ একটি আদিম প্রবণতা। এই ব্যাধি নির্মূল হওয়ার নয়। কিন্তু আমাদের জীবনে শিক্ষা-সংস্কৃতির একটা ইতিবাচক ভূমিকা তো থাকা দরকার। যে শিক্ষা অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে মানুষকে সুসভ্য হয়ে উঠতে সাহায্য করে না, তার মান এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। যে সরকার এবং প্রশাসনের অধীনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসে না, সেই সরকার ও প্রশাসনকেও দাঁড় করাতে হবে কাঠগড়ায়। শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে সরকার-প্রশাসনের বিরুদ্ধে তর্জনী বেশি করে ওঠা উচিত, যখন বিদেশি অতিথিরাও রেহাই পান না। ভুলে গেলে চলবে না, ভারতবর্ষের প্রাচীন সংস্কৃতি অতিথিকেও নারায়ণ বা ভগবানের আসনে বসিয়েছে। সেখানে কী দেখলাম আমরা? ইন্দোরে অস্ট্রেলিয়ার দুই মহিলা ক্রিকেটার শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন! বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের এই ভয়াবহ ঘটনায় সারা দেশের মাথা হেঁট গিয়েছে। অপরাধীরা আর দেশীয় মা-মেয়েদের টার্গেট করে ক্ষান্ত নয়, তাদের কালো হাত বিদেশি অতিথিদের দিকেও প্রসারিত—ভাবা যায়! আইসিসি মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে একমাস ধরে ভারতে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া টিম। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছে তারা। আগের দিনের খেলায় সহজ জয় এসেছে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তাই কিছুটা রিল্যাক্সড মুডে ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল সকাল দুই সদস্য বেরিয়ে পড়েছিলেন ইন্দোরের পাঁচতারা হোটেল থেকে। গন্তব্য কাছেই এক কাফেটেরিয়া। সকাল ১১টা তখন। রাস্তাও জনবহুল। তাই নিরাপত্তাকর্মী সঙ্গে নেননি। হেঁটেই যাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু দিনের আলোতেই লুকিয়েছিল বিপদ। তাঁদের পিছু নেয় এক বাইকচালক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনের শ্লীলতাহানি করে সে চম্পট দেয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গিয়েছে, সাদা জামা ও কালো টুপি পরে বাইকে বসে রয়েছে অভিযুক্ত। সে প্রথমে এক ক্রিকেটারের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। কিন্তু দুজনে একসঙ্গেই বাধা দেন। তারপর ফের বাইক ঘুরিয়ে এসে অপর ক্রিকেটারের শরীর খারাপভাবে স্পর্শ করে পালিয়ে যায় ওই দুষ্কৃতী। এই ঘটনায় কেবল মোদি-শাহ জুটির সাধের ডবল ইঞ্জিন রাজ্যটি কলঙ্কিত হয়নি, সারা ভারতের মুখে চুনকালি পড়েছে। এত ‘মন কি বাত’ করেন যে-মোদিজি তিনি এক্ষেত্রে নীরব কেন? দেশে অপরাধীরা এত বেপরোয়া কার দুর্বলতায় কিংবা মদতে, তার জবাব দেশের সরকারকেই দিতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ