দেশজুড়ে নয়া বিতর্কের কেন্দ্রে সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিল। বিলটি আপাতত যৌথ সংসদীয় কমিটির (জেপিসি) কোর্টে। বিরোধীরা জেপিসি বয়কট করলেও সংসদে ওই বিল পাশ আটকাবে না বলেই দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। অমনি রাজ্যে রাজ্যে অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। যেন শাহের কথা ফলাতেই, বিল পাশের আগেই টার্গেট বিরোধীরা! বাংলায় তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার পর, কেন্দ্রীয় এজেন্সির ফাঁদে আপের সৌরভ—মানে দিল্লির প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সৌরভ ভরদ্বাজ। রাজ্যে রাজ্যে অভিযানে মরিয়া শাহের এজেন্সিগুলি। বাংলার পর দিল্লি, ত্রিপুরা—তৃণমূল, আপ, সিপিএম—একের পর এক বিরোধী নেতাদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে ইডি। এই নিখুঁত চিত্রনাট্য নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে দেশজুড়ে। জেপিসির হাত ঘুরে আসার পর সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেই বিলটি পাশ করিয়ে নিতে চায় মোদি সরকার। আর তার আগে সংসদের বাইরেও প্রাথমিক প্রস্তুতি সেরে রাখা হচ্ছে কি? মোদি-শাহের যা ট্র্যাক রেকর্ড তাতে বিরোধীদের এমন আশঙ্কা আর অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আগামী বছর পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই বিরোধী নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে এজেন্সিরাজ জারি হয়ে গিয়েছে। এরপর অধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তখন তাঁরা ৩০ দিনের বেশিকাল ফাটকে কাটালেই তাঁদের পদচ্যুত করার গেরুয়া মতলবটি হাসিল হবে সুচারুরূপেই। সব মিলিয়ে বিরোধীদের মধ্যে বিশেষ ভীতির সঞ্চার করাটা হয়ে যাবে জলভাত!
দিল্লি থেকে বহু দূরে ত্রিপুরার খয়েরপুরে পবিত্র কর, কাঞ্চনপল্লিতে পরিতোষ ভৌমিক, ক্যাম্পের বাজারে স্বরূপ বণিক, নলছড়ে হারাধন বৈদ্যের মতো বাম নেতাদের বাড়িতেও লম্বা তল্লাশি চালিয়েছে ইডি। হিমাচল প্রদেশে একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিরাট দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখুর বিরুদ্ধেও তদন্ত চেয়েছে বিজেপি। ফলে হিমাচলেও এজেন্সির দাপাদাপির আশঙ্কা করছে রাজনৈতিক মহল। আপ-সহ সমস্ত বিরোধী দলের অভিযোগ, এই প্রবণতার পিছনে রয়েছে বৃহত্তর চক্রান্ত। বিরোধী দলের বিধায়ক এবং কাউন্সিলারদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে অভিযান। পরবর্তী টার্গেট বিরোধী রাজ্যের মন্ত্রী, এমনকী মুখ্যমন্ত্রীরাও। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দলের মতে, আইনের রক্ষক হয়ে অপরাধীদের মতো কাজ করার জন্য সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ইডির সমালোচনা করেছে। গত পাঁচবছরে তারা পাঁচ হাজারেরও বেশি কেস করেছে। সেখানে সাজা হয়েছে ০.১ শতাংশের, যাকে যৎকিঞ্চিৎ আখ্যা দিলেও বেশি বলা হয়! এরপরও কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতিসক্রিয়তা কেন? সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিলকে আগামী দিনে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্যই নয় কি? এখন যদি বিরোধীরা কিংবা একজন গণতন্ত্রপ্রেমী নাগরিক ভাবেন যে, সংবিধান (১৩০তম সংশোধনী) বিলের লক্ষ্য দেশের গণতান্ত্রিক যুগের অবসান ঘটানো, তবে তাঁরা কতটা ভুল? যত দুর্নীতি কি সব বিরোধী শিবিরেই? আহা, বিজেপি সাক্ষাৎ ধোয়া তুলসীপাতা! অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের টিকি ছোঁয়ার সাহস দেখালে ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’ সম্পর্কে মানুষ অন্যরকম ভাবা শুরু করতে পারত। (এছাড়া আর্থিক কেলেঙ্কারি, যৌন কেলেঙ্কারিসহ গুচ্ছ অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্ত আরও বহু গেরুয়া নেতা। তাদের কথা না-হয় আপাতত ছেড়ে দেওয়া গেল।)
স্বভাবতই গত ২০ আগস্ট সংসদে এই বিল উত্থাপন হতেই বিরোধীদের দিক থেকে নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছে। তাঁরা এটিকে ‘একটি অতি জরুরি অবস্থা এবং ভারতে গণতান্ত্রিক যুগের চির অবসানের পদক্ষেপ’ আখ্যা দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বেগ প্রকাশসহ বলেছেন, ‘বিলটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে পদদলিত করেছে। জনগণের রায়ের উপর হস্তক্ষেপে কেন্দ্রকে অন্যায় ক্ষমতার অধিকারী করে তোলার অপচেষ্টা রয়েছে এতে। নির্বাচিত রাজ্য সরকারের কার্যক্রমে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ জোরদার হবে এর দ্বারা।’ ইডি, সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে—যাদেরকে সুপ্রিম কোর্ট ‘খাঁচাবন্দি তোতাপাখি’ বলে ইতিপূর্বেই ভর্ৎসনা করেছে, তাদেরকেই অন্যায় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে এই বিলে। বিলটি সেই অর্থে ভারতের মহান সংবিধানের মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অশুভ উপায়ে প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্যায় ক্ষমতা প্রদানেরই একটি পদক্ষেপ। বিলটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, রাজ্যগুলির পৃথক ক্ষমতার অনুশীলন এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার উপর আঘাত হেনেছে। এই ভয়ংকর অসংসদীয় পদক্ষেপ স্রেফ সংখ্যার জোরে সংসদে মান্যতা পেলে ভারতে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মৃত্যুপরোয়ানা নিশ্চিত করবে। বৃহত্তম গণতন্ত্রের পবিত্রতা এবং মহান সাংবিধানিক ব্যবস্থা অক্ষত রাখার জন্যই এই বিপজ্জনক উদ্যোগকে প্রতিরোধ করতেই হবে। সংসদে শাসক পক্ষেরও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সদস্যদের উচিত, এই সারসত্য উপলব্ধিসহ যথাযথ পদক্ষেপ করা।