তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ভারতের কাছে মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে উঠেছেন। শুরুটা করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ অর্থাৎ সংঘর্ষ থামিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে। এরপর গত বছরের আগস্ট মাসে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনে বলে ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক জরিমানা চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প! আর গত এক সপ্তাহে তিনবার নরেন্দ্র মোদি সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলল ট্রাম্প প্রশাসন, যার মধ্যে অন্তত দুটি ক্ষেত্রে ভারতের ঘুম ছুটে যাওয়ার উপক্রম। সপ্তাহের গোড়ায় ট্রাম্প বললেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নাকি ‘স্যার, আমি কি আপনার দেখা পেতে পারি’ বলে ফোন করেছিলেন। জবাবে তিনি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। এরপর অনেক বড় পদক্ষেপের কথা শোনা গেল মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারতের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক বসানোর বিলে সই করেছেন তিনি। আগামী সপ্তাহে বিলটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন আইনসভায় পেশ করা হবে। আর সপ্তাহ শেষে আবার নবতম পেরেকটি ঠুকেছেন আমেরিকার বাণিজ্য সচিব। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সই করার সুযোগ হাতছাড়া করেছে ভারত। কারণ, বলা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে ট্রাম্পকে ফোন করেননি মোদি। ঔদ্ধত্য কোন পর্যায়ে পৌঁছালে এমনটা আমেরিকা করতে পারে? এই ফোন করার প্রসঙ্গে ভারত অবশ্য অন্য কথা বলেছে।
অথচ ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির সম্পর্ক বরাবর সুমধুর। ২০২৪-তে মোদি তৃতীয়বার ক্ষমতায় বসার পর ‘বন্ধু’কে বার্তা দিয়ে আনন্দপ্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। সেই ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর মোদি প্রথম ব্যক্তি যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সংবর্ধনা জানাতে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ থামানোর দাবি থেকে তাঁকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে দেখা করতে চাওয়া— গত প্রায় এক বছরে বারবার যখন যেমন খুশি দাবি, কটাক্ষ, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ করে চলেছেন ট্রাম্প! একবারও ভাবেননি এসব করা কি তাঁর শোভা পায়? যদিও এসব নিয়ে মাঝেমধ্যে ভারতের বিদেশমন্ত্রক ‘জবাব’ দিলেও মোদি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় থেকেছেন নীরব! বিরোধীদের অভিযোগ, ‘বন্ধু’-কে ‘খুশি’ করতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতেও হয়তো পিছপা হবেন না মোদি। যেমন দামে সস্তা হলেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে ভারত। একাধিক কৃষিপণ্য আমদানিতে মার্কিন সংস্থাগুলিকে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে বেশি দামে ‘অস্ত্র’ কেনার চুক্তি করে অর্থের অপব্যয় করা হয়েছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। আমেরিকা থেকে বেশি দামে তেল কেনাও নাকি শুরু হয়েছে। ট্রাম্পকে ‘খুশি’ করতেই নানা ক্ষেত্রে ঢালাও বেসরকারিকরণ ও বিমাক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগে ছাড়পত্র দিয়েছে মোদি সরকার। ট্রাম্পকে চটাবেন না বলে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাতেও কোনও নিন্দাসূচক মন্তব্য শোনা যায়নি মোদি কিংবা সরকারের মুখে। ঘটনা হল, যে ট্রাম্পকে খুশি করতে মোদি সরকারের এই প্রাণপাত, সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে চাইছেন, ভারত পুরোপুরি বশ্যতা স্বীকার করুক আমেরিকার কাছে। যার অর্থ, উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। কিন্তু তা কি হয়? হয়তো বা ভারত এখন ঠান্ডা মাথায় ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। এখন ভারতের কৌশলী পদক্ষেপ কী হবে সেটাই দেখার।
আসলে ছলে-বলে-কৌশলে কোনও দেশকে বশ্যতা স্বীকার করানো আমেরিকার বরাবরের দর্শন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করার পর একাধিক দেশকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এই দাদাগিরির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করা। বলা বাহুল্য সেই কাজে সফল হননি ট্রাম্প। এদিকে রাশিয়ার থেকে তেল কিনছে ভারত, চীন, ব্রাজিলের মতো দেশ। আমেরিকা ভাবছে, রাশিয়াকে যুদ্ধ করতে আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্যই এইসব দেশ তেল কিনছে। তাই এইসব দেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর আইন আনছেন ট্রাম্প। অর্থাৎ কোথাও হাতে মারবে, কোথাও ভাতে মারার পরিকল্পনা নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এদেশের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোয় ইতিমধ্যেই রপ্তানি বাণিজ্য কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে। এরপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপলে রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। এর ফলে বহু বাণিজ্য সংস্থা তো মুখ থুবড়ে পড়বেই, কাজও হারাবেন বহু মানুষ। প্রশ্ন উঠেছে, এইরকম বন্দুকের নলের সামনে নতজানু হয়ে কতদিন বেঁচে থাকা যাবে? বরং যতদিন যাবে, বশ্যতা স্বীকার করানোর নিত্যনতুন ফিকির তুলতে থাকবেন ট্রাম্প। আর তা পূরণ না হলেই নেমে আসবে কোপ। এখন মোদিকেই ঠিক করতে হবে, আমেরিকার ছায়াসঙ্গী হয়ে ট্রাম্পের ইচ্ছামতো দাবি, উপেক্ষা, বিদ্রুপ, কটাক্ষ হজম করে দেশ চালাবেন, নাকি দেশের আত্মসম্মান বজায় রেখে, মাথা উঁচু করে চলবেন। বল এখন মোদির কোর্টে।