মৃণালকান্তি দাস: তাজের নির্মাণ শেষ হওয়ার এগারো বছর পরে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়া লিখেছিলেন, এটাই বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য, মিশরের পিরামিডের চেয়ে অনেক এগিয়ে। সে যুগে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমা দেওয়ার ব্যাপার ছিল না, তবু অনায়াসে ৩৭২ বছর আগেই তাজমহল পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য হয়ে উঠেছিল।
অথচ, এ দেশের শাসকদল তথা গেরুয়া শিবির আজ মনে করে, তাজমহল ভারতীয় সভ্যতার বৃহত্তম কলঙ্ক। এই কলঙ্ক সমূলে উৎপাটন জরুরি— কেউ কেউ ঠারেঠোরে এমনও উসকানি দেন। এর অর্থ একটাই, বাবরি মসজিদের মতো তাজমহল ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও! বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার তো প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, তাজমহল আসলে ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি হিন্দু মন্দির, যা
দখল করে মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর পত্নীর সমাধি তৈরি করেন।
বিজেপির টার্গেট স্পষ্ট: বাবরি মসজিদের মতো করে তাজমহলের নিষ্পত্তি যদি সহজ না হয়, তবে হিন্দু মন্দির হিসেবে তাকে ‘অধিকার’ করা জরুরি। একটি মুসলিম স্থাপত্য নিয়ে দেশ-দুনিয়ার বিস্ময় মেনে নিতে পারছে না গেরুয়া শিবির। তারা তাজমহলকে দেশের সাংস্কৃতিক প্রতীক বানাতে নারাজ। একটাই পথ, ইতিহাস বিকৃত করো। ঘৃণা ছড়িয়ে দাও। গৈরিক ফেট্টিশোভিত সংঘীয় নেতারা দেশের সংখ্যাগুরু অংশকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তাঁরাই একমাত্র তাজমহলের ‘গোপন’ ও ‘সত্য’ ইতিহাসটি জানেন। বাকি দেশবাসী ৩৭২ বছর
ধরে সম্পূর্ণ ভুল জেনে এসেছেন। এই ভুলটা নির্মূল করাই পবিত্র কাজ। এই ঘৃণাবাদী রাজনৈতিক-সংস্কৃতির বিস্তারে গেরুয়া শিবিরের মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘বলিউড’।
বলিউডের এই নয়া হিন্দুত্ববাদী পণ্য ও বিভাজনের রাজনীতির উদাহরণ ‘দ্য তাজ স্টোরি’! সিনেমায়
ধর্মীয় বিদ্বেষকে কাজে লাগানোর অপচেষ্টা বলিউডে নতুন নয়। কিছুদিন আগে ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’
নিয়ে হইচই করার চেষ্টা হয়েছিল। লাভ হয়নি।
যেমনটি হয়েছিল ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ বা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ নিয়েও। এবার ‘দ্য তাজ স্টোরি’তে
অভিনেতা পরেশ রাওয়ালকে মুখ্য চরিত্র বানিয়ে পরিচালক তুষার গোয়েল তাজমহলের বিরুদ্ধে সংঘ পরিবারের পুরোনো ‘গল্প’গুলিতে বাড়তি জ্বালানি জোগাতে চেয়েছেন।
বলিউডের হিন্দুত্ববাদী পণ্য ‘দ্য তাজ স্টোরি’র প্রযোজকের নাম স্বর্ণিম গ্লোবাল সার্ভিসেসের সুরেশ ঝা। এই সংস্থার কার্যালয় রয়েছে মহারাষ্ট্রে। সুরেশ ঝা এর আগে বানিয়েছেন ‘মোদি কা গাঁও’। ২০১৭ সালে গুজরাত নির্বাচনের আগে এই সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। বিষয়বস্তু শুধুই প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা। সুরেশ ঝা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা বানালেও গুজরাতে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মোদির আমলে যে গণহত্যা হয়, সেই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন। সিনেমা দেখলে বুঝতেই পারবেন না, মোদি কোনওদিন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই সুরেশ ঝা তাজ স্টোরিতে কী বলতে চাইবেন, সেটা অনুমান করা কঠিন নয়!
সমকালীন ভারতে ৩১ অক্টোবর একটা বিশেষ দিন। ইন্দিরা গান্ধীকে দুই শিখ এদিন হত্যা করে এবং পালটা প্রতিশোধ হিসেবে শিখবিরোধী হিংসা শুরু হয়। এই দিনটিতেই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্ম। এবার তাঁর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। সংঘ পরিবার এই দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উদ্যাপন করতে চেয়েছে। আর সেই উদ্যাপনে যুক্ত হয়েছে নতুন এক শিল্পকলাও। ‘দ্য তাজ স্টোরি’ মুক্তি পেয়েছে এই দিনই। যা ইতিমধ্যে ভারতীয় ইসলামি শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন তাজমহল নিয়ে বহুচর্চিত বিতর্ক উসকে দিয়েছে। সিনেমা মুক্তির আগেই যে পোস্টার বাজারে ছাড়া হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে, পরেশ রাওয়াল তাজমহলের সর্বোচ্চ গম্বুজ খুলছেন আর তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে শিবের মূর্তি। এই রকম একটা পোস্টারের টার্গেট ছিল সহজবোধ্য: তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদী গল্প ও মিথ উসকে দেওয়া। যেখানে বলা হয়েছে, মোগল সম্রাট তাজমহল নির্মাণ করিয়েছিলেন একটা হিন্দু মন্দিরের উপর।
এ দেশে তাই ইতিহাস যা স্বীকৃতি দেবে সংঘ পরিবার! তাই তেজো মহালয়া বিষয়টি পুরোনো মতে ঐতিহাসিক কি না, এই সংশয় তোলার জায়গা নেই এ দেশের সাধারণ নাগরিকদের। অথচ, তেজো মহালয়া বস্তুটির উল্লেখ কোনও মান্য ইতিহাসে নেই। একমাত্র ১৯৮৯ সালে পি এন ওক নামে এক বিতর্কিত স্বঘোষিত ‘ইতিহাস-জ্ঞানী’ এমন দাবি তুলে বই লিখে ফেলেছিলেন। এত দূরই তর্কটি গিয়েছিল যে, ২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কেবল তেজো মহালয়া নস্যাৎ হয়নি, তার দাবিদারও বদ্ধ উন্মাদ বলে বিবেচিত হয়েছিলেন! শুধু তাই-ই নয়, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ২০১৭ সালে জানিয়ে দেয়, তাজমহলের ভিতরে বা নীচে কোনও হিন্দু মন্দির নেই বা ছিলও না। এই বিষয়ে ব্রিটিশদের তরফ থেকে ১৯০৪ থেকে তাদের হাতে আসা যাবতীয় কাগজপত্র দেখানো হয়। এরপরও গেরুয়া শিবির তাদের অবস্থান থেকে এতটুকু সরেনি। বরং বলিউডকে ব্যবহার করে সেই বিতর্ক আবার গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। আদালতকে প্রভাবিত করতে তারা সামাজিক জনমত তৈরির পথ বেছে নিয়েছে। ইতিহাস চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে নানা সামাজিক রূপকথা ও গল্পের মাধ্যমে। ঐতিহাসিক তথ্য ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কল্পনা দিয়ে। যখনই এই রকম অপচেষ্টা প্রত্নতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখনই আবার ধর্মীয় আবরণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়কে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষমূলক প্রচার আকারে হাজির করা হচ্ছে ভোটের রাজনীতিতে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরের বছরই তাজমহল নিয়ে রাজনীতি শুরু করে বিজেপি। সেই সময় আগ্রায় তারা এই বিষয়ে সাতটি মামলা দায়ের করে। সেখানে দাবি করা হয়, তাজমহলকে যেন হিন্দুদের পুজোর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। মামলায় এ–ও দাবি ছিল তাজের কক্ষগুলি যেন পরীক্ষা করে দেখা হয়— সেখানে অন্য ধর্মের কোনও চিহ্ন আছে কি না। মামলাকারীরা আগবাড়িয়ে এমনও দাবি করেছিলেন, তাঁদের কাছে শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে। এসবই ছিল বিষয়টিকে সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়ার রাজনৈতিক প্রচারধর্মী বয়ান মাত্র। বাস্তবে ওই সব মামলা নিয়ে আগ্রার আদালত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। কিন্তু গেরুয়া শিবির থেমে যায়নি। ২০২২ সালে তাঁরা এলাহাবাদে একই ধরনের মামলা করে। সেখানেও তাজমহলের বিশেষ ২০টি কক্ষ খোলার জন্য আর্জি জানানো হয়। এসব কক্ষ কেন খোলা হয় না, নিশ্চয়ই তাতে হিন্দুধর্মীয় কোনও স্মারক আছে, এই ছিল মামলাকারীদের প্রশ্ন। সেবারও আদালত কোনও রায় দেয়নি। এই সময় গেরুয়া শিবিরের প্রচারে বাড়তি গতি দিতে জয়পুরের শেষ রাজা দ্বিতীয় মান সিংয়ের নাতনি দিয়া কুমারী বলেছিলেন, তাজমহল তাঁদের পরিবারের জমিতে নির্মিত! দিয়া বিজেপির ঘরের লোক। রাজস্থানের উপমুখ্যমন্ত্রী। কোর্ট বুঝতে পেরেছিল, মূলত মোগলদের তৈরি বলে তাজমহলে কলঙ্ক লেপনের জন্যই এ রকম বলা হচ্ছে। এলাহাবাদের দুই বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় ও সুভাষ বিদ্যার্থী তখন মন্তব্য করেছিলেন, এভাবে ‘জনস্বার্থে মামলা’ চলতে থাকলে একদিন হয়তো আমাদের চেম্বারও খুলে দেখতে চাওয়ার আর্জি জানানো হবে।
সংঘ পরিবার চাইছে বড়ো কোনও ইস্যু, যা দিয়ে ভারতজুড়ে সংখ্যাগুরুকে আবার নাড়িয়ে দেওয়া যাবে। তাজমহল যেহেতু মোগল জমানার বড়ো এক প্রতীক এবং মোগলদের আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখানো যেহেতু গেরুয়া শিবিরের রাজনীতির প্রধান এজেন্ডা, সেই কারণে তাজকে তারা এখন ব্যাপক প্রচারে আনতে চাইছে। একই প্রকল্পের পাইপলাইনে আছে কুতুব মিনার, লালকেল্লাও। আর গেরুয়া শিবিরের এই রাজনীতির ছায়ায় অনেক উচ্চাভিলাষী লেখক-শিল্পী-অভিনেতা নিজেদের ভাগ্য বদলে নিতেও সচেষ্ট হচ্ছেন। কেউ কেউ তো বলেই ফেলেছেন, আসলে পরেশ রাওয়াল তাজ স্টোরির মাধ্যমে আবার বিজেপির নির্বাচনী টিকিট পেতে চাইছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব আহমেদাবাদ আসনে জিতলেও বিজেপি দ্বিতীয়বার তাঁকে সেই সুযোগ না দিয়ে দিল্লিতে এনএসডির (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা) সভাপতি করে দেয়। ৭০ বছর বয়সে এখনও এই দায়িত্বে আছেন। তাজ স্টোরি তাঁর জন্য তাই বড়ো বাজি। তাঁর অজানা নয়, রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডাধর্মী সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করায় তিনি উদারপন্থী শিল্পী সমাজে সমালোচিত হতে পারেন। তবুও তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন বড়ো কিছুর আশায়। এর জন্য জাতীয় শিল্পীর স্বাভাবিক নির্মোহতা ছুড়ে ফেলে দিতেও তিনি রাজি। তাঁর কাছে তাজমহল ‘গণহত্যার প্রতীক’। ঘৃণার এই রকম প্রকাশ মূলত সংখ্যাগুরুদের সিনেমা হলে টানতে। না হলে, পরেশ রাওয়াল কেন বলবেন, ‘এবার দেখি কতজন হিন্দু ভাই আমার সিনেমাকে সমর্থন করবেন?’ আসলে তিনি গল্পের যে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেই বিষ্ণু নামে এক গাইড হিন্দুত্ববাদীদের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। শুধু তাই-ই নয়, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে বিশ্বাস বনাম তথ্যের সংঘাতকে উসকে দিয়ে বিষ্ণু তাজমহলের ডিএনএ পরীক্ষারও দাবি তুলেছেন!
প্রশ্ন হল, যে ইশ্যুতে সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া যাবতীয় বিতর্কের ইতি টেনে দিয়েছে, সেই তাজমহল নিয়ে আবার নতুন করে বিভাজনের রাজনীতি কেন? এই প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকায় উদ্বেগ প্রকাশ করতেই হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জমানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞান, হিন্দুত্ববাদী কার্যকলাপগুলিকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে পরিণত করা। ঐতিহাসিক সৌধের দাবি নিয়ে যখন টানাটানি চলে অথবা কেউ সেখানে সরাসরি ঢুকে পড়ে অধিকার কায়েম করতে চান, তখন প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সরকারের অগাধ নীরবতাকে হিরণ্ময় বলে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। নাগপুরের একশৈলিক ভারতের ধারণা আসলে তেমনই— সেখানে স্বর থাকবে কেবল সংখ্যাগুরুর, অবশিষ্ট সব ‘অপর’ হবে তুচ্ছ-অস্তিত্বহীন!
তবুও চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন, ধর্মের দোহাই দিয়ে আমরা কি ভুলে যাব রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতা: একবিন্দু নয়নের জল/ কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/ এ তাজমহল।