মৃণালকান্তি দাস: জ্যারেড কুশনার কে? গোটা দুনিয়ায় তাঁর একমাত্র পরিচয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাই হিসেবেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কার সঙ্গে বিবাহসূত্রে কুশনার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পেয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলেন, তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান অপরিপক্ব। ইতিহাস সম্পর্কেও জ্ঞান সীমিত। তবে কুশনার ‘কিছুই জানেন না’ এমনটা ভেবে তাঁকে হালকাভাবে নেওয়াও ভুল। কারণ, তাঁর কাজের মধ্যে একটি বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। যা একুশ শতকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’-এর নতুন চেহারাকে প্রতিফলিত করে। এমনই মনে করেন ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক রঞ্জন সলোমন।
কুশনার আসলে স্বতন্ত্র কোনও ব্যক্তি নন। বরং তিনি এমন একটি ব্যবস্থার প্রতিনিধি, যারা বহুজাতিক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ও রাষ্ট্রশক্তি মিলে জমি দখল, জনগণকে দমন এবং অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। এর অন্যতম উদাহরণ— প্যালেস্তাইন ভূখণ্ড গাজা। কুশনারের তথাকথিত ‘শতাব্দীর চুক্তি’ একটি আশ্চর্যজনক পরিকল্পনা। তাঁর পরিকল্পনা, গাজার কিছু অংশকে ‘ভূমধ্যসাগরীয় সিঙ্গাপুর’ বা ‘গাজা রিভিয়েরা’ বানানো। খোলা চোখে একে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দারিদ্র্যের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পরিকল্পনা বলে মনে হলেও, বাস্তবে এটা প্যালেস্তাইনের জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রকল্প। প্যালেস্তিনীয়রা তাঁদের নিজেদের জমিতে কম বেতনের পরিষেবাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত হবে, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখান থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি মুনাফা নিয়ে চলে যাবে।
এটা ডেভিড হার্ভের ‘সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে পুঁজি’ বানানোর ধ্রুপদি উদাহরণ। মানুষের কষ্টকে লাভে পরিণত করা। কুশনারের স্লোগান মনে রাখবেন, ‘গাজা রিভিয়েরা: খোলা আকাশের কারাগার থেকে পর্যটকদের খেলার মাঠ’। এটা আধুনিকতার আড়ালে সার্বভৌমত্ব চুরি করা। ‘গাজা রিভিয়েরা’ একটা দেশের জমি দখলের নান্দনিক রূপের প্রদর্শন। সম্প্রতি সংবাদসংস্থা মিডলইস্ট মনিটর-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে রঞ্জন সলোমন লিখেছেন এই ভাষাতেই।
কুশনার আব্রাহাম চুক্তিকে ‘শান্তি’ অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তি আরব প্রতিরোধকে দুর্বল করার, প্যালেস্তাইনকে পাশ কাটিয়ে ইজরায়েলের দখলদারি স্বাভাবিক করার একটি পরিকল্পনা। রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটা অভিজাত শাসক ও বিদেশি শক্তির মধ্যে একটি চুক্তি। এখানে অভিজাত শাসকরা দেশের মধ্যে বৈধতা হারানো সত্ত্বেও বিদেশি শক্তির কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পায়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরিন, মরক্কো ও সুদানকে এমন চুক্তিতে টেনে আনা হয়েছে। এতে প্যালেস্তিনীয়দের কোনও লাভ হয়নি। বরং আরব লিগ ও ২০০২ সালের আরব শান্তি উদ্যোগ দুর্বল হয়ে গিয়েছে। এটা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একুশ শতকের সংস্করণ। এখানে সরাসরি সামরিক শক্তির সাহায্যে কোনও দেশে দখলের বদলে, আমেরিকা এমন চুক্তি চাপিয়ে দেয়, যেখানে অভিজাত শাসকরা জনগণের রাজনীতিকে দমন করে বাজার, জমি ও অন্যান্য সুবিধা বিদেশি শক্তির কাছে তুলে দেয়। তবে এই ধরনের চুক্তি সব সময়ই নড়বড়ে হয়। কারণ, স্বৈরশাসকরা চিরকাল জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না।
১৯৫০-এর দশকে সিআইএ-র প্ররোচনায় অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ পর্যন্ত মার্কিন নীতি সব সময়ই ছিল স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ আরব শক্তিকে আটকানো। কুশনারের পরিকল্পনা সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ। কুশনারের দল শুধু জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর করেনি, তারা মানচিত্রও বদলে দিয়েছে। গোলান মালভূমিকে ইজরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সেটিকে ‘ট্রাম্প মালভূমি’ নাম দেওয়া হয়। কুশনারের নীতি একটাই— প্যালেস্তাইনকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা এবং বসতি স্থাপনকে স্বাভাবিক করা। আইন ব্যবহার করে মানুষের জমির অধিকার কেড়ে নেওয়া। এই নীতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, বাড়াবেও।
কুশনারের প্রকল্প শুধু জমি ও জ্বালানি তেলের জন্য নয়! তাঁর প্রকল্পের মূল বিষয়— একটি কর্পোরেট ও উপনিবেশবাদী সভ্যতা। পবিত্র শহর থেকে শরণার্থীশিবির পর্যন্ত সবকিছুকে ব্যবসার পণ্য হিসেবে তুলে ধরা। আমেরিকা আদিবাসীদের থেকে চুরি করা জমির উপর গড়ে উঠেছে। দেশটি ২২৫টি যুদ্ধে জড়িত হয়েছে। কিন্তু কখনও ন্যায়যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি। বরং দেশটি দক্ষ হয়ে উঠেছে ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে। এই কারণে মার্কিন সাম্রাজ্য নৈতিকভাবে দুর্বল। তাত্ত্বিকরা বলেন, এমন শাসনব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের রাজনীতির দিকেই এগতে থাকে।
গত ফেব্রুয়ারিতে একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিও পোস্ট করে গাজাকে মার্কিন দখলে নিয়ে ‘আরব দুনিয়ার রিভিয়েরা’ বানানোর স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সময় তার ‘গাজা রিকনস্ট্রাকশন, ইকোনমিক অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন ট্রাস্ট প্রকল্পে গাজাকে দুবাই-স্টাইলের রিসোর্টে রূপান্তরের কল্পনা করা হয়, যেখানে থাকবে স্কাইস্ক্র্যাপার, কৃত্রিম দ্বীপ, ‘ট্রাম্প রিভিয়োরা’ এবং ‘ইলন মাস্ক স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং জোন’। ৫ লাখ প্যালেস্তিনীয়কে ৯ হাজার ডলারের ‘রিলোকেশন প্যাকেজ’ দিয়ে ‘স্বেচ্ছায়’ অন্য দেশে সরানোর পরিকল্পনা ছিল। আরব রাষ্ট্রনেতারা ও রাষ্ট্রসংঘ একে ‘পাগলামি’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। এমনটি ইজরায়েলে জনপ্রিয়
দৈনিক হারেৎজ ‘ট্রাম্পিয়ান গেট-রিচ-কুইক স্কিম’ বলে উপহাস করে। কিন্তু থেমে থাকেনি মার্কিন
বিদেশ দপ্তর!
গত ২৯ সেপ্টেম্বর গাজায় শান্তি ফেরাতে হোয়াইট হাউস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা পেশ করে। ঠিক তার আগের দিন ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ ‘গাজা ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজিশনাল অথরিটি’ (জিআইটিএ)-এর পরিকল্পনা নথি প্রকাশ করে দেয়। জিআইটিএর ২১ পৃষ্ঠার এই ‘গোপন’ পরিকল্পনা সম্পর্কে হারেৎজ জানায়, এর নেপথ্যে রয়েছেন প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তদন্তে উঠে আসে, ব্লেয়ারের ‘টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ’ (টিবিআই) কিছু ইজরায়েলি ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলে ‘গাজা ইকোনমিক ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি করে এবং ইজরায়েল পরিচালিত ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন’-এর (জিএইচএফ) নিরাপত্তা প্রধান তথা প্রাক্তন সিআইএ অফিসার ফিল রিলে সেই সময় ব্লেয়ারের সঙ্গে লন্ডনে দেখা করে প্রজেক্ট পিচ করেন। সেই ব্লেয়ারের নামই গাজার ‘ট্রানজিশনাল অথরিটি’র ডিরেক্টর হিসেবে প্রস্তাব করেছেন ট্রাম্প। ব্লেয়ারের কাজ একটাই— জ্যারেড কুশনার এবং ইজরায়েলি বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি তৈরি করে দেওয়া। বিশ্লেষকদের ধারণা, জিআইটিএ-র নামে আমেরিকা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় একটি বিদেশি-নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা গড়তে চায়। এই পরিকল্পনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের একটি পুনরাবৃত্তি— যেখানে প্যালেস্তিনীয়দের কণ্ঠ দমিয়ে বিদেশি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, গাজা শাসনে ব্লেয়ারের কেন এত আগ্রহ?
বিশ্লেষকদের ধারণা, ব্লেয়ারের এই পরিকল্পনার পিছনে রয়েছে তাঁর ইজরায়েলপন্থী অতীত আর ব্যক্তিগত স্বার্থ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসে তিনি বেলফোর ঘোষণার (১৯১৭) ধারাবাহিকতা বহন করেন, যা ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্যালেস্তাইনের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। এরপর আসে ১৯৪৮-এর নাকবা এবং গাজার দীর্ঘ দুর্ভোগের সূচনা। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ব্লেয়ার অসলো চুক্তিতে ইজরায়েলের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি এহুদ বারাক ও ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বটে, কিন্তু ইজরায়েলি বসতি বন্ধ করতে কোনও পদক্ষেপ নেননি। বরং ২০০৭-২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে প্যালেস্তাইনে গিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, এই উন্নয়নের পিছনে তাঁর ব্যবসায়িক লাভ জড়িত ছিল। টাইম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘জেপিমর্গান’ ও পরামর্শক কোম্পানির সঙ্গে এখানে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে।
বিশেষ করে, ‘ওয়াতানিয়া চুক্তি’র কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে ব্লেয়ার জড়িত ছিলেন। ওয়াতানিয়া নামে ওয়েস্ট ব্যাংকে একটি প্যালেস্তিনীয় মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির জন্য ব্লেয়ার তখন ইজরায়েলের কাছ থেকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। যেন ওয়াতানিয়া দ্বিতীয় প্যালেস্তিনীয় মোবাইল অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করতে পারে। ব্লেয়ার তখন জেপি মর্গানেরও উপদেষ্টা, যে কোম্পানি ওয়াতানিয়ার মূল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু ইজরায়েল ওয়াতানিয়ার জন্য ফ্রিকোয়েন্সি ছাড়ার বিনিময়ে প্যালেস্তিনীয় নেতৃত্বের কাছে শর্ত দেয়, ২০০৮-০৯ সালের ‘অপারেশন কাস্ট লেড’-এর সময় গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধ অপরাধের তদন্ত রাষ্ট্রসংঘে স্থগিত রাখতে হবে। ব্যবসায়িক সুবিধার বিনিময়ে প্যালেস্তিনীয়দের ন্যায়বিচারের দাবি ত্যাগ করতে হয়েছিল। যার মধ্যস্থতা করেন টনি ব্লেয়ার। এই চুক্তি থেকে জেপি মর্গান আর্থিকভাবে লাভবান হয়, উপদেষ্টা হিসেবে যেই লাভের ভাগীদার হন ব্লেয়ার নিজেও। যদিও ব্লেয়ারের দাবি, তিনি ওয়াতানিয়া ও জেপি মর্গানের মধ্যে সম্পর্কের কথা জানতেন না।
প্যালেস্তিনীয়-আমেরিকান বিশ্লেষক ওমর বদ্দার বলেছেন, ‘ব্লেয়ার ও ট্রাম্পের রেকর্ড অপরাধমূলক। ব্লেয়ার ইরাক আক্রমণের মিথ্যার অজুহাতের নায়ক ছিলেন। আর ট্রাম্প ওয়েস্ট ব্যাংকে অবৈধ বসতি স্থাপন, গোলান মালভূমি দখল, জেরুজালেম ইজরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার সমর্থক।’ লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের মতে, ‘ব্লেয়ারের মধ্যপ্রাচ্যে থাকাই উচিত নয়— তাঁর ইরাক সিদ্ধান্ত হাজার হাজার জীবন কেড়েছে।’ ব্লেয়ারকে বলা হয় ২০০৩-এর ইরাক যুদ্ধের ‘স্থপতি’। চিলকট রিপোর্ট প্রমাণ করে, ব্লেয়ার শান্তিপূর্ণ বিকল্প চূড়ান্ত না করে যুদ্ধে যান, যা লাখ লাখ জীবন শুধু নয়, একটা দেশকেই ধ্বংস করেছে। আফগানিস্তান (২০০১) এবং যুগোস্লাভিয়া (১৯৯৯) যুদ্ধেও ব্লেয়ারের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। নথিতে উল্লেখ রয়েছে, জিআইটিএ পরিকল্পনা কসোভোতে রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া মডেল থেকে অনুপ্রাণিত। কে না জানে, সেই মডেল কসোভোতে বিদেশি তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শান্তি এনেছিল বটে, কিন্তু জাতীয় সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিয়েছিল। ব্লেয়ার নিশ্চয় গাজায় সেই পরিকল্পনা প্রয়োগ করে ইরাক যুদ্ধের ‘নোংরা’ ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে চান, যা তাঁর ব্যবসায়িক লাভ নিশ্চিত করবে, আবার ইজরায়েলের দখলদারিও বহাল থাকবে।
কিন্তু গাজার মানুষ তো রিসর্ট বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র চায় না। তারা চায় স্বাধীনতা, সম্মান আর নিরাপত্তা। ব্লেয়ারের পরিকল্পনা তাদের এই স্বপ্নকে আরও একবার ধ্বংস করবে। নিশ্চিত। তাই গোটা দুনিয়া বলছে, গাজায় শান্তি ফেরাতে ট্রাম্পের বিশ দফা প্রস্তাব বিশটি ‘পয়জন পিল’ ছাড়া কিছু নয়!