Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গেরুয়া শিবিরের ভারতদর্শন!

যে বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়, সেই ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিনে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জন্ম নিয়েছিল আরও একটি সংগঠন।

গেরুয়া শিবিরের ভারতদর্শন!
  • ১৪ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: যে বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়, সেই ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিনে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জন্ম নিয়েছিল আরও একটি সংগঠন। ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে, সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর আদর্শ নিয়ে। সংগঠনটির নামকরণ হয় পরের বছর, রামনবমীতে। হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জন্ম নেওয়া সংগঠনটির নাম রাখা হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)।

Advertisement

জন্ম মুহূর্তেই এই সংগঠনের তৎকালীন মূল কর্ণধার ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, রাজনীতি থেকে দূরে থেকে মূলত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করাই হবে আরএসএসের লক্ষ্য। যদিও আরএসএস-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য বরাবরই থেকেছে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো 
চরম রাজনৈতিক এক বিষয়, তবুও সে সেই লক্ষ্য অর্জনের দীর্ঘ পথে এক সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত শক্তি হিসেবে ‘কিছুটা পিছন থেকে’ কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেছে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনকে দেশের পক্ষে ক্ষতিকারক এবং প্রতিক্রিয়াশীল মনে করত আরএসএস। তাই তারা দেশকে স্বাধীন করার কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিল। শুধু তাই-ই নয়, ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার পর সত্যাগ্রহের নামে ‘অরাজকতার নিন্দা’ করে গেরুয়া শিবির ব্রিটিশের প্রতি ‘গভীর আনুগত্যের’ শপথ নিয়েছিল। ব্রিটিশ রাজের ভারত আগমনকে প্রণতি জানিয়ে তারা বলেছিল, ‘ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আর্যজাতির গুরুত্বপূর্ণ দু’টি শাখা যা সুদূর অতীতে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, আবার এক হতে পেরেছে। এক জাতি অপরটিকে রাজনৈতিক পথনির্দেশ এবং সুরক্ষা প্রদান করছে। যে সাম্রাজ্যের সূর্য কখনও অস্ত যায় না, তার প্রজা হিসাবে আমরা গর্বিত এবং এই প্রাপ্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রমাণ করতে আমরা সর্বদাই সচেষ্ট।’
১৯২১–২২ সালে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন গোটা দেশে তীব্র রূপে ফেটে পড়েছিল। ধর্ম–বর্ণ–সম্প্রদায়গত পার্থক্য গৌণ করে হাজার হাজার মানুষ এক হয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন। অবিভক্ত বাংলাতেও এই আন্দোলন প্রবলভাবে আছড়ে পড়েছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতা সহ হাজার হাজার সত্যাগ্রহীকে ব্রিটিশ পুলিস গ্রেপ্তার করে। ঠিক সেই সময় এই গণসংগ্রামের মধ্যে আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ হেডগেওয়ার দেখতে পেলেন ‘অশুভ শক্তির জাগরণ’। তাঁর কথায়, ‘মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে দেশে উৎসাহ (জাতীয়তাবাদের জন্য) ক্রমে শীতল হয়ে যাচ্ছিল এবং এই আন্দোলন সৃষ্ট অশুভ শক্তিগুলি সমাজজীবনে বিপজ্জনকভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছিল। ...অসহযোগের দুগ্ধ পান করে বেড়ে ওঠা যবন–সর্প তার বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে দেশে দাঙ্গার প্ররোচনা দিচ্ছিল।’ এই ছিল অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে হেডগেওয়ারের বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
একই কারণে, ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। ১৯২৯ সালে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লি অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করলেন। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে আলফ্রেড পার্কে (১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি) পুলিসের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হলেন বিপ্লবী নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ। ১৯৩১ সালে ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরুকে ফাঁসি দিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গোটা দেশ যখন উত্তাল, সেই সময় আরএসএস স্বাধীনতার আন্দোলনে শরিক হল না। ১৯৩০ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বিনয়–বাদল–দীনেশের ঐতিহাসিক অলিন্দ যুদ্ধ, ১৯৩০–৩২ সালে চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, প্রীতিলতার শহিদ হওয়া— কোনও কিছুতেই আরএসএস বিপ্লবের পাশে দাঁড়ায়নি। ১৯৪২–এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসারদের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে নৌ–বিদ্রোহ, ওই বছরের ২৯ জুলাই দেশব্যাপী ধর্মঘট— প্রতিটি লড়াইয়ে আরএসএসের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ইংরেজ প্রভুদের খুশিই করেছে। ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে তার ইঙ্গিত!
ইতিহাস আরও জানায়, আরএসএস-বিজেপির আইকন হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর প্রথম জীবনে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করলেও অল্পদিনের মধ্যেই সে পথ ছেড়ে দেন। ১৯২০-এর দশকের সমসাময়িককাল থেকে তিনি ‘হিন্দুত্বের’ তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ব্রিটিশ বিরোধিতা ত্যাগ করেন। এই সময় তিনি ব্রিটিশের কাছে মুচলেকাও দেন। তাঁর স্লোগান ছিল, ‘রাজনীতির হিন্দুকরণ এবং হিন্দুধর্মের সামরিকীকরণ।’ যখন গোটা দেশের জনগণ ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়ে আন্দোলনে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, আজাদ হিন্দ বাহিনী নেতাজি সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে জীবনপণ করে লড়ছে, সেই সময় সাভারকর ১৯৪১-এ হিন্দু মহাসভার ভাগলপুর অধিবেশনে বলছেন, ‘ভারত সরকারের সমস্ত যুদ্ধ প্রস্তুতিকে হিন্দুদের অবশ্যই দ্বিধাহীন চিত্তে সমর্থন করতে হবে’ (সাভারকর সমগ্র, খণ্ড ৬, মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দুসভা প্রকাশিত, পৃঃ ৪৬০)। সাভারকরের না জানার কথা নয় ব্রিটিশের হয়ে যুদ্ধ মানে তখন উত্তরপূর্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা। এই গোলামির পুরস্কার হিসেবে ভাইসরয়ের প্রতিরক্ষা কাউন্সিলে সাভারকরের পছন্দমতো লোক মনোনীত করা হয়েছিল। তিনিও ভাইসরয়কে টেলিগ্রাম করে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
সঙ্ঘ পরিবারের ব্রিটিশ সহযোগিতার আরও স্পষ্ট প্রমাণ মেলে ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তর থেকে। ১৯৪০ সালের ২ ডিসেম্বর বম্বে প্রদেশের স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আরএসএস নেতা অভয়ঙ্কর ও অন্যান্যদের আলোচনার ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নোটে বলা হয়েছে, ‘অভয়ঙ্কর আরএসএস-এর পোশাক, কুচকাওয়াজ ইত্যাদি বিষয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, সঙ্ঘ তার সদস্যদের বৃহত্তর সংখ্যায় সিভিক গার্ডে যোগ দিতে উৎসাহ দেবে। এই মর্মে বোঝাপড়া হয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সদস্যরা সিভিক গার্ডে যোগদান করলে সিভিক গার্ডের প্রতি তাদের দায়িত্বকে সার্বভৌম বলে গ্রহণ করবে।’ ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪, বোম্বের স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ ভি আঙ্গোয়ার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে জানান, ‘সঙ্ঘ নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে সরকারি আইনের চৌহদ্দির মধ্যে রেখেছে ও বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ১৯৪২ সালে যে গোলমাল শুরু হয়েছিল সঙ্ঘ তাতে কোনও রকম অংশগ্রহণ করেনি।’ ১৯৪৬ সালের ১৯ জুন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রদপ্তরের একটি নোটে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সংগ্রাম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নয়।
দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর, ইংরেজের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনেই করতেন না। ‘দ্য আরএসএস: আ ভিউ টু দ্য ইনসাইড’ বইয়ে লেখক ওয়াল্টার কে অ্যান্ডারসেন এবং শ্রীধর ডি ডামলে লিখেছেন, ‘গোলওয়ালকর বিশ্বাস করতেন, আরএসএসকে নিষিদ্ধ করার কোনও রকম অজুহাত ব্রিটিশ শাসকদের দেওয়া  চলবে  না।’  ১৯৪৩ সালের ২৯ এপ্রিল গোলওয়ালকর দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে একটি নির্দেশ জারি করে আরএসএসের সমস্ত বিভাগ বন্ধ করে দেন। এই আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে আরএসএস সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আরএসএস আইন–শৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক, এ কথা বলার যুক্তি নেই।’ অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের পক্ষ থেকে ‘দেশপ্রেমিক’ আরএসএসের কাছে এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কী হতে পারে? আর এসব কারণেই, ক্ষমতায় আসার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাধীনতা আন্দোলনে সঙ্ঘের ভূমিকার ইতিহাস মুছে ফেলার। ভাবুন একবার, গান্ধীজিকে হত্যার দায়ে বল্লভভাই প্যাটেল আরএসএসকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ, সেই প্যাটেলেরই বিশাল মূর্তি নির্মাণ করেছে বিজেপি সরকার। এভাবেই চলছে, ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা!
ইতিহাস সাক্ষী, সমকালীন ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও দেশাত্ববোধের প্রচলিত ধারণা নিয়ে গোলওয়ালকর প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর মতে, ‘ভৌগলিক জাতীয়তাবাদের সাধারণ শত্রু সম্বন্ধীয় তত্ত্বসমূহই হল মূল সমস্যা, আর এগুলিই হিন্দু জাতীয়তাবাদের ইতিবাচক প্রণোদনা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে এবং আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেবল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পর্যবসিত করেছে। ব্রিটিশ বিরোধিতাকে দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একীভূত করে ফেলা হয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ আমাদের সমগ্র স্বাধীনতাযুদ্ধ, আমাদের নেতা এবং জনগণের উপর ভয়ঙ্কর খারাপ প্রভাব বিস্তার করেছে।’
এই যুক্তিজাল থেকেই গোটা চল্লিশের দশক জুড়ে গোলওয়ালকরের আরএসএস সরে থেকেছে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে। ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, ১৯৪৫-৪৬ এর উত্তাল প্রতিরোধ বা নৌ বিদ্রোহ— কোনও কিছুতেই আরএসএস অংশগ্রহণ করেনি। বিপরীতে দাঙ্গার ঘটনাগুলিতে অতিসক্রিয় থেকেছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের যেমন ব্রিটিশপ্রীতি ছিল অফুরান, তেমনই ছিল মুসলিম লিগেরও। এইসময় হিন্দু মৌলবাদ ও মুসলিম মৌলবাদ পরস্পর পরস্পরকে পাল্লা দিয়ে বাড়তে চেয়েছে এবং স্বাভাবিক নিয়মেই একে অপরকে পুষ্ট করেছে। মুসলিম লিগের মতো আরএসএসও এই পর্বে ব্রিটিশদের নিপীড়নের মুখোমুখি হয়নি এবং গোটা পর্বটিকে সংগঠন বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করেছে। জাতি গঠনের বৈজ্ঞানিক নিয়মকে গেরুয়া শিবির কখনওই স্বীকার করেনি। তারা সর্বদাই হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি করেছে। পরাধীন ভারতে তাদের শত্রু ব্রিটিশরা ছিল না, ছিল মুসলিমরা। ঠিক উল্টোটা ছিল মুসলিম লিগের নীতি।
আজকের বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন এজেন্ডাকে তার মতাদর্শগত নির্দেশক আরএসএসের ইতিহাস-দর্শন থেকে বুঝে নেওয়া জরুরি। এই ইতিহাসকে লুকিয়ে আর যাই হোক দেশের ‘স্বাধীনতা দিবস’ উদযাপন করা যায় না। তাতে দেশের ত্রিরঙ্গা পতাকা কলুষিত হয়! স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, শহিদদের প্রতি অমর্যাদা করা হয়! তাই হিন্দুত্ববাদী শাসকের হাতে নাগরিকরা দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখার জরুরি কলমটি তুলে দিলে তা হবে আক্ষরিক ও সর্ব অর্থে এক ‘ঐতিহাসিক’ ভুল। এই সত্যকে আমরা অস্বীকার করলে বিপদ অনিবার্য!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ