মৃণালকান্তি দাস: সালটা ১৯৩৮। এক রাতের ঘটনা। প্যাসাডেনা ঢেকেছে কুয়াশায়। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক) ক্যাম্পাস তখন ঘুমিয়ে। শুধু আলোর রেখা আসছে এক পুরনো বাড়ির ভিতর থেকে। ভিতরে চলছে এক গোপন বৈঠক। কিছু তরুণ বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট— তাঁরা দুনিয়ার এক অজানা বিপদের বিরুদ্ধে নিজেদের সংগঠিত করার প্ল্যান করছেন। বৈঠকে রয়েছেন এক ছিপছিপে চীনা বংশোদ্ভূত তরুণ। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত জ্যোতি— যেন ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন। নাম শিয়ান শ্যুসেন।
শিয়ান তখন সদ্য ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ক্যালটেকে যুক্ত হওয়া এক অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। কাজ করছেন থিওডর ফন কারমানের সঙ্গে। অফিস শেয়ার করেন ফ্র্যাঙ্ক মলিনার সঙ্গে— যিনি আমেরিকার বিখ্যাত ‘সুইসাইড স্কোয়াড’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু রকেট নয়। আলোচনা ফ্যাসিবাদ, নাৎসি বাহিনী আর আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের স্কুলপুলে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। ফ্র্যাঙ্ক বলে উঠলেন, ‘তুমি জানো তো শিয়ান, তোমাদের সাংহাইয়ে বোধহয় এই অবস্থা নেই। কিন্তু এখানে, আমাদের লড়তে হয় প্রতিটি মৌলিক মানবাধিকারের জন্য।’ শিয়ানের চোখ স্থির হয়ে যায়। তাঁর মনটা দুলে ওঠে!
দশ বছর পরের ঘটনা।
একটা ফাইল পড়ে আছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর ডেস্কে। তার উপর লেখা: Subject: Qian Xuesen — Possible Communist Affiliation. Pasadena, 1938. কী আছে এই ফাইলে? একটি রাতের আলোচনা, একটি সাইন-ইন শিট এবং কিছু প্যাম্পলেট... এতেই আমেরিকার সবচেয়ে প্রতিভাবান রকেটবিজ্ঞানীর নাম ঢুকে যায় গুপ্তচর সন্দেহের তালিকায়। তখনও এফবিআই গোয়েন্দারা জানেন না— এই মানুষটিই একদিন চীনের জন্য তৈরি করবেন এমন ক্ষেপণাস্ত্র, যা আরব উপসাগরের ধুলোময় আকাশ ছেদ করে আঘাত করবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের গায়ে।
প্যাসাডেনা, ১৯৫০।
শিয়ান শ্যুসেনের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে এফবিআই এজেন্টরা। সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ছে শিয়ানের চশমার কাঁচে। চুলগুলি এলোমেলো, হাতে কফির কাপ। আচমকা এই ধাক্কার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। — Mr. Qian, you're under suspicion. Please come with us. স্ত্রী ও শিশুসন্তানের সামনেই তাঁকে হাতকড়া পরানো হয়।
শিয়ানের মনে পড়ে যায় সেই ১৯৪৫ সালের দিনগুলির কথা। যখন তাঁকে নাৎসি রকেট বিজ্ঞানী ভার্নার ফন ব্রাউন-এর সঙ্গে দেখা করতে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। তিনি তখন আমেরিকার অহংকার। লেফটেন্যান্ট কর্নেল। অথচ এখন? তিনি আর মুক্ত নন। ১৯৩৫ সালে সাংহাইয়ের জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রটি বিরল স্কলারশিপে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপর আমেরিকাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। শিয়ান সেই বিজ্ঞানী— যিনি ততদিনে মার্কিন মহাকাশ ও অস্ত্রপ্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। যাঁর গবেষণার ভিত্তিতেই আমেরিকার প্রথম গাইডেড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়। গোপন ‘ম্যানহাটান প্রকল্প’-এও যুক্ত হয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন আমেরিকাই প্রথম চাঁদের মাটি ছোঁবে। অথচ, শুধুমাত্র সন্দেহের কারণে সেই বিজ্ঞানীকে আটকে রাখা হয়েছে চার দেওয়ালের মাঝে। দিনে তিনবার ফেডারেল ইন্সপেকশন, ফোন ট্যাপড, পোস্ট কার্ডও সেন্সরড। বন্ধ ঘরে বসে শিয়ান একজোড়া পুরনো খাতা খুলে নিজের হাতে আঁকা ডায়াগ্রাম দেখতে থাকেন— প্রপালশন থিওরি, মিসাইল থ্রাস্ট, ইঞ্জিন ডিজাইন। এসব এখন নিষিদ্ধ জ্ঞান, যেন দেশদ্রোহিতার সমান!
১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং কমিউনিস্ট পিপলস রিপাবলিক অব চায়না-এর আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করেন। এর পরই আমেরিকায় চীনকে দেখা হতে থাকে শত্রু কিংবা অশুভ শক্তি হিসেবে— এমনটাই জানাচ্ছেন উত্তর জর্জিয়ার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক ক্রিস জেসপারসেন। ‘আমেরিকার ইতিহাসে এমন সময় বারবার এসেছে, যখন আমরা চীনকে নিয়ে মুগ্ধ ছিলাম। তারপর হঠাৎ এক ঘটনায় তাদের ঘৃণা করতে শুরু করেছি,’ বলেন তিনি।
এই সময়েই, নাসা জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি-র নতুন ডিরেক্টর লুই ডানের মনে হয়, ল্যাবের মধ্যে গুপ্তচরদের একটি চক্র কাজ করছে। তিনি এফবিআই-এর কাছে কিছু কর্মীর ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ‘এসকেপ ফ্রম আর্থ: এ সিক্রেট হিস্টোরি অব দ্য স্পেস রকেট’ গ্রন্থের লেখক ফ্রেজার ম্যাকডোনাল্ড লিখেছেন, সেই সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে ওই ডিরেক্টর বলেছিলেন, ‘আমি লক্ষ্য করেছি, এরা সবাই হয় চীনা নয়তো ইহুদি।’ ততদিনে ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। সামনে এগিয়ে আসছে ম্যাকার্থি যুগের সেই ‘কমিউনিস্ট সন্দেহ’। আর ঠিক এই ভয় ও ষড়যন্ত্রের আবহেই, এফবিআই শিয়ান, ফ্র্যাঙ্ক মলিনা এবং আরও কয়েকজন বিজ্ঞানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে— তাঁরা ‘কমিউনিস্ট’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপদ’।
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক জুওইয়ে ওয়াং বলেছিলেন, কোনও প্রমাণ নেই যে শিয়ান আমেরিকায় বসে চীনের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন বা কোনও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবুও, শিয়ানের নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করা হয় এবং তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ক্যালটেকের সহকর্মীরা, এমনকি তাঁর শিক্ষক থিওডর ফন কারমানও, মার্কিন প্রশাসন কাছে বারবার তাঁর মুক্তির জন্য আবেদন জানান— কিন্তু ইতিহাসের প্রবল ঢেউয়ে, এমন আবেদন নিছক এক কাগজমাত্র। মার্কিন নীতি পরিষ্কার— Better to lose a mind than risk a red.
১৯৫৫ সালে, শিয়ান যখন গৃহবন্দি অবস্থায় পাঁচ বছর পার করেছেন, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তাঁকে চীনে নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫৫ সালে এক ডজন মার্কিন যুদ্ধবন্দির বিনিময়ে ড. শিয়ান শ্যুসেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে জাহাজে চীন ফিরে যান। জাহাজে ওঠার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি আর কখনও আমেরিকার মাটিতে পা রাখব না।’ তিনি তাঁর সেই কথা রেখেছিলেন।
বেজিং, ১৯৫৫।
চীনের আকাশে তখনও ভেসে বেড়ায় যুদ্ধোত্তর ধুলো-ধোঁয়া। একদিকে কোরিয়ার মাটি থেকে সদ্য ফিরেছে সেনারা, অন্যদিকে নতুন চীনের রাজধানীতে জমছে সোভিয়েত প্রশিক্ষণ মিশন, কমরেডদের স্লোগান আর লাল পতাকার ছায়া। এই পরিবেশেই পা রাখলেন শিয়ান শ্যুসেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা। জাহাজ থেকে নামতেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানান কিছু বিজ্ঞানী, কিছু সেনা অফিসার এবং একজন মধ্যবয়সি মানুষ— যাঁর চেহারায় মিশে আছে আমলাতন্ত্রের অনুশাসন ও বিপ্লবের উত্তাপ। ‘কমরেড শিয়ান, আমরা শুনেছি আপনি আমেরিকার বিজ্ঞানপ্রতিষ্ঠানে অনেক কিছু শিখেছেন। এবার চীনকে দিন আপনার সবটুকু।’ শিয়ান মাথা নাড়েন। বুঝে যান— তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব চেয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী ছিলেন এক জাতীয়তাবাদী নেতার কন্যা। আর এখন তিনি এক শত্রুর মাটি থেকে ফেরত আসা মানুষ— কমিউনিস্ট পার্টিতে তাঁকে এখনই জায়গা দেওয়া হবে না। তার জন্য তাঁকে প্রমাণ দিতে হবে।
পরবর্তী তিন বছর তিনি কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাননি। তাঁকে পাঠানো হয় গোপন গবেষণা ফ্যাসিলিটিতে— সম্পূর্ণ অপেশাদার পরিকাঠামো, যন্ত্রপাতির অভাব, কাঁচামালের দুর্ভিক্ষ। কিন্তু শিয়ান থামেন না। তাঁর ডেস্কে থাকে স্লাইড রুল, পুরনো সোভিয়েত অনুবাদগ্রন্থ, আর নিজের হাতে আঁকা হাজারো ডিজাইন। রাত জেগে কাজ করেন তরুণ বিজ্ঞানীদের নিয়ে। তিনি গড়ে তুলতে থাকেন এক ভবিষ্যৎ, যা তখনও কেউ কল্পনা করেনি।
চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর অবশেষে শিয়ানকে পার্টির সদস্য করা হয়। তিনি জানেন— এটা তাঁর নতুন জন্ম। স্বয়ং মাও সেতুং বলেন, শিয়ান শ্যুসেন চীনের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তাঁকে চীনের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রামের প্রধান করা হয়। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে দুই স্তরের রকেট প্রযুক্তি, পেইপেই-১, ডংফেং সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র। চীনের আকাশে তখন বাজছে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ঘোষণা। চীনের প্রথম উপগ্রহ: ডং ফ্যাং হং-১ (পূর্ব দিগন্ত রক্তিম)। উৎক্ষেপণের মুহূর্তে তাঁর চোখে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যেন তিনি কিছু হারিয়েছেন, তবু ফিরে পেয়েছেন অনেক কিছু। এই দুনিয়া থেকে এক সময় যাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তিনিই পৌঁছে গেলেন মহাকাশে। আর চীন বিশ্বকে জানায়: আমরাও পারি। আমরা একা, কিন্তু অসহায় নই।
১৯৯১ সাল।
শিয়ানের তৈরি সিল্কওয়ার্ম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরাকি সেনাবাহিনী গালফ ওয়ারে মার্কিন নৌজাহাজে হামলা চালায়। সেদিন আমেরিকা বুঝেছিল, এই একজন মাত্র বিজ্ঞানীর নির্বাসনের পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। পশ্চিমি মিডিয়া লেখে: শিয়ানের বিজ্ঞান এখন সেই দেশে আঘাত হানছে, যেখানে একসময় এই বিজ্ঞানীর জন্ম হয়েছিল। আর শিয়ান তাঁর ছাত্রদের বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞান একটি তরবারি— তার ধার কোন দিকে যাবে, সেটা সময় ঠিক করে।’ ২০১৯ সালে ইতিহাস রচনা করে চীন। চাঁদের অদৃশ্য পৃষ্ঠে প্রথম ল্যান্ড করে চীনা রোভার। আর ল্যান্ডিং পয়েন্ট? ভন কারমান— শিয়ানের পরম উপদেষ্টা থিওডোর ভন কারমানের নামে। তা যেন ছিল এক প্রতীকী প্রতিশোধ!
মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস লিখছে, ‘ড. শিয়ান শ্যুসেনের নির্বাসনের গল্পটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। শিয়ান শ্যুসেনের সাফল্য দেখিয়ে দেয়, যদি আমরা বিশ্বের মেধাবীদের স্বাগত না জানিয়ে দূরে সরিয়ে দিই, তাহলে বড় সুযোগ হারিয়ে ফেলব। এমনকী ওই মেধা একদিন আমাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে। আমেরিকার এই একটা ভুল সিদ্ধান্তের চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে আজও। যা বিশ্বশক্তির ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিয়েছে।’ ড. শিয়ান শ্যুসেন এক নির্বাসিত প্রতিভা, যাঁর হৃদয়ে ছিল দুই দেশ, দুই ভাষা, আর এক মহাকাশ। তাঁর গল্প ছড়িয়ে আছে প্রতিটি চীনা রকেটের গায়ে, প্রতিটি চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্নে! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি জানেন, আমেরিকার সেই চরম ভুলের ইতিহাস?