সুকান্ত বসু, কলকাতা: রাজ্যের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও উপ-সংশোধনাগারে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সাইরেনকে সংরক্ষণ করবে বিভিন্ন জেল কর্তৃপক্ষ। না না ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ধরে রাখতেই এই উদ্যোগ। রাজ্যের কারা দপ্তর সূত্রে একথা জানা গিয়েছে। রাজ্যের একাধিক জেল ইংরেজ আমলের তৈরি। ফলে সেই সমস্ত জেলে লাগানো কিছু কিছু সাইরেন নানা সময় খারাপ হয়ে পড়ে থাকায় তা পরিবর্তন করে নতুন করে লাগানো হয়েছে। অকেজো হয়ে পড়ে থাকা সেই সমস্ত সাইরেন কোথাও কোথাও জেলের অন্দরে নোংরা আবর্জনার স্তূপে অযত্নে পড়েছিল।
কোথাও কোথাও আবার সেই সাইরেনের গায়ে ধরেছে জমাট বাঁধা ধূলোর আস্তরণ। সেই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা সাইরেনকে জেলের চৌহদ্দির মধ্যে কোন নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণের ব্যবস্থায় উদ্যোগী হয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। সেখানে জেলের আর পাঁচটা দ্রষ্টব্যের মধ্যে স্থান পাবে প্রাচীন এই শব্দ যন্ত্রটিও। জেল কর্তৃপক্ষের একাংশের বক্তব্য, পড়ে থাকা এই সমস্ত সাইরেনকে ঘিরে রয়েছে না জানা অনেক ইতিহাস। রয়েছে জেলের নানা স্মৃতি কাহিনী। তাই জেলের অন্দরে বহু ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে বয়ে চলা এই স্মৃতি যাতে কোনভাবেই নষ্ট না হয়, তার জন্যই নানাভাবে তা অক্ষত রেখে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মূলতঃ রাজ্যের বিভিন্ন জেলে থাকা এই সমস্ত সাইরেন বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে নির্দিষ্ট সময় যেমন বাজানো হয়ে থাকে। তেমনি বন্দি পলায়নের মতো কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে ঘন ঘন সাইরেন বাজিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয় জেল নিযুক্ত কারা রক্ষীদের। স্বাভাবিকভাবে সেদিক থেকে বিচার করলে এই যন্ত্রটির গুরুত্ব অসীম। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হওয়ার ফলে বিশেষত প্রাচীন জেলে নানা সময় এই সাইরেন সংস্কার করা হলেও পরবর্তী সময় তা নষ্ট হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। ফলে ওই যন্ত্রের স্থান হয় জেলের অন্দরের কোন স্থানে। তার পরিবর্তে সেখানে স্থান পায় নতুন সাইরেন বা বিশেষ ঘন্টি। জেল কর্মীদের কথায়, এই অকেজো হয়ে পড়ে থাকা এই সাইরেনের যথোপযুক্ত সংরক্ষণ করা হলে তার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে এই যন্ত্রের পরিবর্তন ও বিবর্তনের নানা কাহিনী। আর সে কারণে একে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বহু ইতিহাসে সমৃদ্ধ মেদিনীপুর, হুগলি, প্রেসিডেন্সি ও আলিপুর প্রভৃতি সেন্ট্রাল জেল। অবশ্য আলিপুর সেন্ট্রাল জেল বর্তমানে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে। আর পূর্বতন ওই জেলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। এই সমস্ত জেলে ক্ষুদিরাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ, কাজী নজরুল ইসলাম সহ বহু বিপ্লবীর স্মৃতি ধন্য। ইংরেজ আমলে নানা মামলার এই সমস্ত বীর সেনানীদের ওই সমস্ত জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁদেরকে নিয়ে একসময় চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ পুলিসের। ফলে তাঁদের সেলে ২৪ ঘন্টার জন্য থাকতো কড়া সতর্কতা। তাঁদের অস্তিত্ব জানান দিতে মাঝেমধ্যেই ওই সমস্ত জেলে বেজে উঠত সাইরেন। উদ্দেশ্য তাঁদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা। ইতিহাস প্রসিদ্ধ ওই সমস্ত জেলে লাগানো সাইরেন নানা সময় বিগড়েও গিয়েছিল। পরবর্তী সময় তা সংস্কারও করা হয়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা সারাই করেও কোন কাজ হয়নি। ফলে তা রেখে দেওয়া হয়। তেমনই পড়ে থাকা সাইরেনকে সংরক্ষণের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেল সূত্রের খবর, অকেজো হয়ে পড়ে থাকা ওই সমস্ত অধিকাংশ সাইরেনের বয়স কোনটা ১০০ বছরের বেশি। আবার কোনটার বয়স শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই।