সমৃদ্ধ দত্ত: যুধিষ্ঠির তো ধর্মরাজ ছিলেন। সত্যের পূজারি। কিন্তু তাঁর নামাঙ্কিত মন্দিরের সন্ধান কি পাওয়া যায়? ওড়িশার মহেন্দ্রগিরি পর্বতে রয়েছে একটি মন্দির। অথচ যুধিষ্ঠিরের তুলনায় সেখানে বেশি পূজিত হন মহাদেব। বেঙ্গালুরুর ধর্মরায় স্বামী মন্দির ধর্মরাজের নামে হলেও, আসলে পূজিত হন দ্রৌপদী।
অথচ ঠিক বিপরীত চরিত্রের এক তথাকথিত খলনায়ক হিসেবে পরিচিত দুর্যোধন কিন্তু নিয়ম করে দেবতা হিসেবেই পূজিত হন কেরল থেকে উত্তরাখণ্ডের গ্রামে গ্রামে। কেরলের কোল্লাম জেলায় এই মন্দিরে আগত ভক্তরা বিশ্বাস করেন আপ্পোপাম দুর্যোধন তাঁদের নানাবিধ বিপদ থেকে রক্ষা করেন। উত্তরাখণ্ডের নেতাওয়ার থেকে ওসলা পর্যন্ত বিস্তৃত গ্রামগুলির বিশ্বাস, এই যে তমসা নদীর জন্ম হয়েছে তার কারণ দুর্যোধনকে অন্যায়ভাবে হত্যার ফলে জনসমাজের সম্মিলিত অশ্রু। দুর্যোধনের মন্দির রয়েছে ওসলা নদী উপত্যকায়।
বিজয়া দশমীর সময় দশেরা উৎসবে প্রধানত উত্তর এবং মধ্যভারত জুড়ে যখন পালিত হয় রাবণসংহার পর্ব, তখন সেই দশেরাতেই ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্রের গোন্দ উপজাতিভুক্ত মানুষ রাবণকে সম্মান জানিয়ে বন্দনাগীতি এবং উৎসব পালন করে। উত্তরপ্রদেশের বিশরাখ গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে তাদের গ্রামই রাবণের জন্মস্থান। অতএব ভূমিপুত্র এক ব্রাহ্মণ ও অপার জ্ঞানের অধিকারী রাবণকে তারা পুজো করে মন্দিরে। দক্ষিণ ভারতের বহু স্থানেই রাবণ আরাধ্য দেবতা।
রাজ্যের সংখ্যা ৩৪। প্রতিটি রাজ্যের ভাষা, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি স্বতন্ত্র। সরকারিভাবে ২২টি স্বীকৃত ভাষা। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ১৩৬৯টি মাতৃভাষা রয়েছে। পরিভাষায় যাদের বলা হয় ‘জীবিত ভাষা’ অর্থাৎ লিভিং ল্যাঙ্গুয়েজ, তার সংখ্যা ৪৪৭। কাকে বলে লিভিং ল্যাঙ্গুয়েজ? যে ভাষায় আজও অন্তত কিছু মানুষ কথা বলে দেশের কোনও না কোনও প্রান্তে। উপভাষার সংখ্যা অন্তহীন।
কোনও জনগোষ্ঠী মনে করে পশুপক্ষীর মাংস ভক্ষণ করা মহাপাপ। নিরামিষের পূজারি তারা। আবার অন্য জনসম্প্রদায়ের খাদ্যভ্যাসে মাছ মাংস উপস্থিত তো বটেই, পুজোপার্বণের বিশেষ ভোগপ্রসাদ পর্যন্ত মাছ মাংস। কোনও জনগোষ্ঠী শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে সাত্ত্বিক আহারে বিশ্বাস করে। কোনও জনগোষ্ঠীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অন্যতম বিশেষ আচার হল নিয়মভঙ্গ তথা মৎস্যমুখ।
১৪৫ কোটি জনসংখ্যা। বিশ্বের সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশ। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৯ লক্ষ ১৭ হাজার ডলার মিলিয়নেয়ার বাস করে এই দেশে। গড়ে প্রতি বছরে ৪ শতাংশ করে বাড়ছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ৮২ কোটি মানুষ বিনামূল্যে খাদ্যশস্য গ্রহণ করেছে গরিব কল্যাণ যোজনায়।
ভারতের নগরগুলিতে সবথেকে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ফ্ল্যাট হল রুফটপ সুইমিং পুল। আর তামিলনাড়ু থেকে উত্তরাখণ্ড, অসংখ্য গ্রাম প্রতিদিন শূন্য করে দিয়ে মানুষ অন্যত্র চলে যাচ্ছে জলের অভাবে।
ভারতবর্ষ কোনও রাষ্ট্রের নাম নয়। ভারতবর্ষ কোনও দেশের নাম নয়। ভারতবর্ষ কোনও সভ্যতার নাম নয়। ভারতবর্ষ মহাজাগতিক এক ম্যাজিকের নাম। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাদুকর ভারতবাসী। স্বাধীনতার ৭৯ তম বর্ষে এসেও এই প্রবল পারস্পরিক পার্থক্য, ভেদাভেদ, আচার ব্যবহার, ভাষা, খাদ্য, ধর্ম উপধর্মের বিপুল প্রভেদ সত্ত্বেও ভারতবর্ষের একটি অঙ্গও বিচ্ছিন্ন হয়নি আজও। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার যে ভারতবর্ষকে ভৌগোলিকভাবে রেখে গিয়েছে, আজও অবিকল সেই সীমানাই রয়ে গিয়েছে। কেউ বিচ্ছিন্ন হয়নি। কেউ স্বাধীন হয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করেনি। কোনও সরকার কোনও নেতানেত্রী কোনও রাষ্ট্র এজন্য কৃতিত্ব পাওয়ার অধিকারী নয়। এই কৃতিত্ব ভারতবাসী নামক একটি অত্যাশ্চার্য জনসমষ্টির। যাদের সিংহভাগ কোনওদিন পড়েনি যে, ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ নামক একটি বাক্য এক বিখ্যাত গ্রন্থে লেখা হয়েছিল, যার নাম সংবিধান। অথচ জেনে অথবা না জেনে ঠিক সেই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ তারা পালন করে চলেছে বছরের পর বছর, দুঃখ কষ্ট বঞ্চনা দারিদ্র্য ও বৈষম্যকে জীবনমৃত্যু পায়ের ভৃত্যের মতো সঙ্গী করে।
১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে লন্ডনের অ্যালবার্ট হলে ‘আওয়ার ডিউটি টু ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ভাষণে উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে আমরা যদি ব্রাহ্মণদের শাসনে ফেলে রেখে আসি, সেটা হবে চরম এক নিষ্ঠুরতা এবং অবহেলা। কংগ্রেস পার্টিকে চার্চিল হিন্দু ব্রাহ্মণদের দল মনে করতেন। তিনি বলেছিলেন, যদি ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে আসে, তাহলে জনপরিষেবার গোটা কাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রেলওয়ে, সড়ক, সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। ভারত কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গিয়ে আবার অসভ্য বর্বর মধ্যযুগে ফিরে যাবে!
ঠিক ১৭ বছর পর ব্রিটিশ চলে গিয়েছে। আজ ভারতের স্বাধীনতার ৭৯ তম বর্ষে এসে বিশ্ববাসী কী দেখছে? দেখতে পাচ্ছে ব্রিটেনের জিডিপি আজ ৩ লক্ষ ৬৫ হাজার কোটি ডলার। ভারত ব্রিটেনকে ছাপিয়ে হয়েছে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতের জিডিপি ৩ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি ডলার। ব্রিটেন ক্রমেই নিমজ্জিত হচ্ছে আর্থিক সঙ্কটে। চার্চিল জেনে যেতে পারলেন না যে, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যে সংবিধান ভারতের চালিকাশক্তি হিসাবে যাত্রা শুরু করেছিল, আজও সেই সংবিধানকেই অনুসরণ করে চলতে বাধ্য হয়েছে প্রতিটি নির্বাচিত সরকার। গণতন্ত্রের প্রতি রক্তচক্ষু দেখানো হলে ভারতবাসী অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে সেটা লক্ষ করে। শাসক মনে করে এই ভারতবাসী দুর্বল, উদাসীন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে অপারগ। কিন্তু ১৯৭৭ অথবা ২০২৪, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেই নিস্পৃহ নিরাসক্ত ভারতবাসী প্রত্যেক শাসককে চরম বিস্মিত করেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। মাথা নিচু করে সেই গণতন্ত্রের চপেটাঘাত সহ্য করতে হয়েছে সর্বশক্তিমান মনে করা উদ্ধত রাষ্ট্রশক্তিকে।
১৯৫১-৫২ সালের স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৩ কোটি। ২০২৪ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ৯৭ কোটি। যে ভূমিখণ্ড ধর্মের কারণে এই মহান ভারতবর্ষ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিল ১৯৪৭ সালে, তারা ক্রমেই আজ ভুলে গিয়েছে যে, স্বচ্ছ, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ভোটপ্রক্রিয়া একটি দেশে ঠিক কেমন দেখতে হয়। তাদের জীবনের সিংহভাগ কেটে গিয়েছে সামরিক শাসন অথবা রাষ্ট্রপতি শাসনে কিংবা অনির্বাচিত সরকারের অধীনে। তাদের দেশগুলিতে যখন তখন সেনা অভ্যুত্থান হয়। সরকারের পতন ঘটে। যখন তখন জনতার বিপ্লবের নামে নৈরাজ্য হয়। প্রধানমন্ত্রীরা বিদেশে পালিয়ে যান বারংবার। সরকারের পতন ঘটে। সেখানে ৭৯ বছরের স্বাধীন ভারত মাথা উঁচু করে গণতন্ত্রের উৎসব পালন করে।
একইসঙ্গে স্বাধীন হওয়া পাকিস্তানের আজ অফিসিয়াল ভাষা উর্দু ও ইংরাজি। আর ভারতের ২২ টি ভাষা অফিসিয়াল। নিয়ম করে ১৯৫২ সালের পর থেকে প্রতি ৫ বছর অন্তর নির্বাচন হয়। একবারও একদিনের জন্যও কোনও সামরিক শাসন কায়েম হয়নি। নির্বাচন যখনই কেউ ব্যাহত করেছেন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে, ঠিক দেড় বছর পর তিনি চরম শিক্ষা পেয়েছেন নিজেই নির্বাচন ঘোষণা করে। ৭৯ বছর ধরে এত ঝড় ঝঞ্ঝা আক্রমণ যুদ্ধ দাঙ্গা সংঘাত দারিদ্র্য সহ্য করেও ভারতবর্ষ নামক ম্যাজিক পিছিয়ে যাচ্ছে না, ক্রমাগত অগ্রসর হচ্ছে প্রগতির সঙ্গে। কেন ভারত এত ভিন্নতা সত্ত্বেও অটুট রইল? কেন গণতন্ত্রের জোরালো স্তম্ভকে ধূলিসাৎ করা গেল না? কেন এত প্ররোচনা সত্ত্বেও গৃহযুদ্ধ হতে পারল না? এই ম্যাজিকের রহস্য কী?
রহস্য হল, এই মাটিকে স্বাধীনতার জয়গান প্রদান করে গিয়েছেন কারা? তাঁদের শক্তির আশীর্বাদ থাকবে না তা কি হয়? কেমন ছিল সেইসব শক্তি? কাকোরি স্টেশনে ব্রিটিশের অস্ত্র লুট করা বিপ্লবীদের অন্যতম নেতার নাম ছিল রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ি। ১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর ফাঁসির দিন ভোরে আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল সংযুক্ত প্রদেশের (আজকের উত্তরপ্রদেশ) গোন্দা জেলে। সেখানে অন্যদিনের মতোই ব্যায়াম করছেন রাজেন্দ্রনাথ। জেলার চরম বিস্মিত হয়ে বললেন, আজ আপনার ফাঁসি হবে একটু পর। আজও আপনি ব্যায়াম করছেন কেন? রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, আজ আমি মৃত্যুবরণ করছি এবং আজই আমার জীবনের লক্ষ্য সমাপ্ত হয়ে গেল, এমন নয়। আমি আবার জন্মগ্রহণ করব। স্বাধীন ভারতে আমার বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করব। তাই নিজেকে সুস্থ রাখছি!
১৯০৮ সালের ১৮ জুন মুজফফরপুরের সেশন আদালতের বিচারক ক্ষুদিরাম বোসকে প্রশ্ন করলেন, তুমি গীতা পড়েছো?
—ক্ষুদিবাম জানান, হ্যাঁ, পড়েছি।
—তোমার ভয় হচ্ছে না?
—ক্ষুদিরাম প্রশ্ন করলেন, ভয় পাব কেন?
—বিদেশি বিচারক বিস্ময়পূর্ণ কণ্ঠে জানতে চাইলেন, তোমাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেটা তুমি বুঝতে পারছো তো?
—ক্ষুদিরাম, হাসলেন এবং মাথা নেড়ে বোঝালেন, তিনি বুঝেছেন মৃত্যুদণ্ড কাকে বলে!
অসংখ্য মহান আত্মবলিদানের শক্তি ভারতবর্ষ নামক জাদুভূমিতে মিশে রয়েছে! সেই অলৌকিক শক্তিগুলি দিয়েই তো তৈরি হয়েছে একটি প্রতিজ্ঞামন্ত্র। ‘উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া’।