প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্র নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করলেই নাগরিক এই অধিকার ভোগ করতে পারে। নিরাপত্তা একটি বৃহত্তর বিষয়। তার মধ্যে সময়োচিত আইনশৃঙ্খলা, আইনি নিরাপত্তা এবং আর্থিক সুরক্ষা নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজ নিজ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেও গরিব এবং দারিদ্র্যসীমার নীচের মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। যে সমাজে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বেশি এই সমস্যা সেখানে প্রবল। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য সমস্ত ধরনের বৈষম্য ধীরে ধীরে কমিয়ে একসময় তা নির্মূল করে ফেলা। কারণ বৈষম্যই হল মানবসভ্যতার অভিশাপ এবং সমস্ত সমস্যা ও সংকটের উৎস। এই বৈষম্য হ্রাসের কোনও জাদুমন্ত্র নেই। একমাত্র রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই বৈষম্য হ্রাসে নেতৃত্ব দিতে পারে। তার জন্য দরিদ্র শ্রেণির মুখগুলি মনে রেখে একাধিক সামাজিক সুরক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সেগুলি রূপায়ণ করতে হয়। বাজেট ঘোষণার দিন কিংবা ভোটের বাজারে ডিভিডেন্ড তোলার জন্য কিছু প্রকল্প ঘোষণা করাই যায়। কিন্তু প্রকৃত সুরাহা নিহিত তৎপরবর্তী সরকারি তৎপরতার ভিতরে।
আমাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিচালিত। সামাজিক প্রকল্প রূপায়ণে রাজ্য সরকারগুলি বহুলাংশেই কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। যদিও কেন্দ্রীয় টাকার উৎস রাজ্যগুলিই। কেন্দ্র কোনোভাবেই একটি স্বনির্ভর সত্তা নয়, রাজ্যগুলি থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ করগুলিই তারা প্রথমে কুক্ষিত করে। অতঃপর তা বণ্টিত হয় সাংবিধাননির্দিষ্ট নিয়মে। এটি অবশ্যমান্য নিয়ম হলেও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বিধানের প্রতি মোদি সরকারের শ্রদ্ধা তেমন নেই। বিশেষ করে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ বা অবিজেপি রাজ্য সরকার হলে তো কথাই নেই। সেই সরকারগুলির সঙ্গে পরিকল্পিতভাবেই বঞ্চনা করা হয়। এমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড়ো বলি যেসব রাজ্য তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নামটি আসে সর্বাগ্রে। নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকেই বাংলার সঙ্গে এই অবিচার লাগাতার চলছে। নবান্ন থেকে নিয়মমাফিক দরবার করা হয়। প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় সংসদের ভিতরে বাইরে। কিন্তু সুরাহা অধরা। তার পুঞ্জিভূত ফলের নাম বঞ্চনার পাহাড়! কেন্দ্রের লালফিতের ফাঁসে আটকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা। পুরোটাই বাংলার প্রাপ্য। এখনও ১০০ দিনের কাজসহ বহু প্রকল্পে টাকা ছাড়ার নামগন্ধ নেই। আবার এই যখন অবস্থা তখনই পালটা চাল দেওয়া হচ্ছে দিল্লির মসনদ থেকে। বলা হচ্ছে, বার্ধক্যভাতার পরিমাণ বাড়াতে হবে। বার্ধক্যভাতা আগামী দিনে দেড় হাজার টাকা করার জন্য চাপ আসছে দিল্লি থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ইতিমধ্যেই এই খাতে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে এক হাজার টাকা করে দিচ্ছে। সেই অঙ্কটা বাড়াতে নবান্নের অসুবিধাও নেই। কিন্তু তার জন্য যে কেন্দ্রীয় সহায়তা প্রয়োজন, সেক্ষেত্রেই সাফ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মোদির গেরুয়া সরকার।
জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের (এনএসএপি) মাধ্যমে বার্ধক্যভাতা, বিধবা ভাতা এবং বিশেষক্ষমতাসম্পন্নদের প্রতিমাসে আর্থিক সহায়তা প্রদানকে ১০০ শতাংশ কেন্দ্রীয় উদ্যোগ বলেই দাবি করে দিল্লি। কিন্তু সেখানেও এবার কাটছাঁট করার ছক লক্ষণীয়। এই প্রকল্পে বর্তমানে ৬০-৭৯ বর্ষীয়দের জন্য মাত্র ২০০ টাকা করে পেনশন দেয় কেন্দ্র। আর ৫০০ টাকা দেয় তারা ৮০ ঊর্ধ্বদের জন্য। প্রতিমাসে এই ভাতার সঙ্গে যথাক্রমে ৮০০ ও ৫০০ টাকা জুড়ে মোট হাজার টাকা করে বার্ধক্যভাতা দেয় রাজ্য সরকার (কেন্দ্রের ভাষায় ‘টপ আপ’)। এই পুরোটাই কেন্দ্রের হিসেবের বাইরে। রাজ্যের ২১ লক্ষ প্রবীণ ব্যক্তি এই ভাতা পেয়ে থাকেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জয় বাংলা প্রকল্পের অধীনে আরও ১ কোটির বেশি প্রবীণ নাগরিককে হাজার টাকা করেই ভাতা দিয়ে থাকে নবান্ন। সব মিলিয়ে এই খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ হয় রাজ্যের। এখন কেন্দ্র যে সুরে কথা বলছে, তাতে এনএসএপি-ও আর সম্পূর্ণ কেন্দ্রের প্রকল্প থাকবে না। বরং তা সামান্য আর্থিক সহায়তা প্রকল্পে বদলে যাবে। অর্থাৎ, এক্ষেত্রেও রাজ্যকে নিজের অংশের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কেন্দ্রের কনসেপ্ট পেপার তেমনটাই বলছে। সোজা কথায়, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধির নামে দায়ভার রাজ্যের কাঁধে চাপিয়েই হাততালি কুড়োবার মতলবে মোদিবাবুরা! রাজ্যের সঙ্গে এতদিন চলেছে রকমারি বঞ্চনা। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তঞ্চকতা। বলা বাহুল্য, বঞ্চনা তঞ্চকতার যুগলবন্দি দিয়ে আর যাই হোক বৈষম্য দূরীকরণের লড়াই কখনও সফল হবে না। এই প্রক্রিয়া দিনের শেষে যে বস্তুটি প্রসব করবে তা হল অধিক দুর্দশা। এ দেশের ৮০ কোটি গরিব মানুষকেই তা সইতে হবে, যতই দুর্বিষহ হোক।