হিমাংশু সিংহ: সব প্রশ্নের উত্তর হয় না। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই, খুঁটিনাটি জানতে চাইতেও নেই সবসময়। মোদি জমানায় ওসব নিষিদ্ধ প্রশ্ন। পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটি, এয়ারবেসে ভারতের আঘাত, আমাদের ক্ষয়ক্ষতি, বিদেশের মানুষ বিস্তারে জানলেন মে মাসে। বিরোধীদের মুখ থেকে। শশী থারুর থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করলেন। আর দেশের মানুষ সেকথা জানবেন জুন মাসের শেষে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে। শুধু জানবেনই না, দেখবেন সংসদের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে দলাদলি আর ঝগড়া। চিৎকার, চেঁচামেচি। ক’টা রাফাল ধ্বংস হয়েছে, আমাদের ক’জন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন? পহেলগাঁওয়ের ওই চারজন জঙ্গি কীভাবে পালাল? কার গাফিলতি? সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার সাতকাহন ও দায় ঠেলাঠেলি। অপারেশন সিন্দুরের এও এক মাহাত্ম্য বলতে পারেন। আমরা বিদেশে ঐক্যবদ্ধ, দেশের মাটিতে বহুধা বিভক্ত! কোন জাদুবলে বিরোধীরা বিদেশে বিশ্বাসযোগ্য, পার্লামেন্টে অগণতান্ত্রিক আচরণে দুষ্ট! অথচ কে না জানে, পার্লামেন্টই গণতন্ত্রের প্রাণ এবং বিরোধীরাই তার চালিকাশক্তি। ‘হাউস বিলংস টু অপোজিশন’।
জঙ্গি তাড়ানো, বিশ্বের উচ্চতম সেতু বানানোর সব কৃতিত্ব যেন একান্ত ব্যক্তিগত আখ্যান। উল্টো কিছু ঘটে গেলেই দায় পুরো ১৪০ কোটি দেশবাসীর। পাক চর ধরার চেয়েও এই মুহূর্তে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি, ভোটযন্ত্রে এই সাফল্যের যেন কোনও ভাগ না হয়! অথচ উন্নয়ন, সামরিক প্রস্তুতি, পরিকাঠামো নির্মাণ, কোনও একটা সরকারের আমলে ষোলোআনা হতে পারে না। এটা সব আমলের মিলিত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অগ্নি কিংবা ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র গত দু’দশকের নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষার ফল। বাহাদুর দেশীয় এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা ‘আকাশ’ও তাই। বিশ্বকে চমকে দেওয়া চেনাব সেতুর প্রস্তাব ইন্দিরা আমলের। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছিল নরসিমা রাওয়ের সময়। মনমোহন সিং ২০০৫ ও ২০০৮ সালে এর দু’টি ছোট অংশের উদ্বোধন করেছিলেন। আর যে মহিলা ইঞ্জিনিয়ার এটিকে রূপ দিয়েছেন, তিনি শুধু মোদি জমানার ১১ বছরই নয়, টানা পড়ে থেকেছেন ওই স্বপ্নকে বাস্তব করতে। নাম তাঁর মাধবী লাথা। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের সুদক্ষ প্রফেসর মাধবী দিনরাত এক করে মেধার সঙ্গে অক্লান্ত শ্রম দিয়েছেন এরকম একটি অত্যাধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিদর্শন গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু আজ পরাক্রমের ষোলোআনা ভাগীদার? একজনই মহামান্য ৫৬ ইঞ্চি।
আসলে গণতন্ত্রে বিরোধী মত ও পথের পরিসর কমে এলে প্রতিষ্ঠিত গুণীজন, সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী, সাংবিধানিক ব্যবস্থার কেষ্টবিষ্টুরাও একমাত্র বিদেশে গিয়েই মুখ খুলতে স্বস্তি বোধ করেন। এটাই সংসদীয় বিপন্নতা সংক্রান্ত স্বতঃসিদ্ধের প্রথম পাঠ। গত সপ্তাহে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ সিঙ্গাপুরে গিয়ে প্রথম বোমাটি ফাটান। সরকার অপারেশন সিন্দুর নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকেনি। কোনও প্রয়োজন নেই বলে। সেনার কিংবা বিদেশ মন্ত্রকের সাংবাদিক সম্মেলনেও ঘুণাক্ষরে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিশেষ জানানো হয়নি। সেনার শৌর্য ও বীরত্ব নিয়ে নিঃসন্দেহে প্রতিটি দেশবাসী গৌরবান্বিত। এই প্রেক্ষিতেই সিঙ্গাপুরে সিডিএস অনিল চৌহানই প্রথম জানালেন, আমাদের যুদ্ধবিমানেরও ক্ষতি হয়েছে। তিনি সংখ্যা উল্লেখ না করলেও একাধিক রাফাল ভূপতিত হওয়ার যে প্রচার পাকিস্তান থেকে শুরু করে পশ্চিমী গণমাধ্যমে চলছে তা ষোলোআনা মান্যতা পেল। সংসদকে না জানিয়ে, দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে, আন্তর্জাতিক সামরিক সম্মেলনে পাকিস্তানের সেনাকর্তার উপস্থিতিতে এমন স্বীকারোক্তিতে কি দেশের সম্মান বাড়ল? না গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হল? এর চেয়ে তো দেশের মাটিতে সাংবাদিক সম্মেলন করে সত্যিটা মেনে নিলে মুখরক্ষা হতো। অথচ সরকার এমন একটা ভাব দেখাচ্ছিল যেন ভারতের ক্ষতির কথা উচ্চারণ করা মানেই চরম দেশদ্রোহিতা! এটা মোটেই সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচয় বহন করে না। তাহলে তো অনিল চৌহানের স্বীকারোক্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
আশ্চর্য হওয়ার আরও বাকি ছিল। দেশের মাটিতে কেউ বিচারপতিদের নিয়ে কোনওরকম ইঙ্গিত করলে আইনের নানাবিধ চোখরাঙানি ধেয়ে আসে। কিন্তু লন্ডনের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই যখন সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, অবসর নিয়েই একজন বিচারপতিকে যদি রাজনীতিতে যোগ দিতে দেখা যায় কিংবা সরকারি ক্ষমতার অক্ষের কাছাকাছি যেতে দেখা যায় তাতে মানুষের আস্থা চূড়ান্ত ধাক্কা খায়। অবসরের আগে কয়েক বছর তিনি যে রায় দিয়েছেন তাতে মানুষ রাজনীতির গন্ধ খুঁজতে থাকে। এতে বিচারপতি পদে থাকা ওই ব্যক্তির চেয়েও বেশি ক্ষুণ্ণ হয় বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গৌরব। ইদানীং এই উদাহরণ কিন্তু বাড়ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহামান্য রঞ্জন গগৈ এবং অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। একজন অযোধ্যা মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার পরই রাজ্যসভার এমপি হয়েছেন। বিচার ব্যবস্থাকে যথোচিত সম্মান দিয়েই বলছি, এতে মানুষ দুয়ে দুয়ে চার করবেই। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে চাঞ্চল্যকর রায় দেওয়ার পর আগাম অবসর নিয়ে বিজেপি’র হয়ে লোকসভা ভোটে টিকিট পাওয়াও একই সন্দেহের উদ্রেক করে। বিচার ব্যবস্থার এই অবমূল্যায়ন শুধু গণতন্ত্র নয়, আমাদের সামাজিক কাঠামোকেও দুর্বল করতে বাধ্য। মহামান্য বিচারপতিদের চেয়ে অনেক উপরে বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধান। তাকে যেকোনও মূল্যে রক্ষা করাও যেকোনও সফল সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নরেন্দ্র মোদি সরকার আগামী ১১ জুন তার একাদশ বর্ষপূর্তির সাফল্য পালন করতে চলেছেন। ঢাকঢোল, কাড়া-নাকাড়া উচ্চগ্রামে বাজতে শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। কিন্তু উন্নয়নের এই উচ্চকিত প্রচারের মধ্যেও গত একদশকেরও বেশি সময় গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কি সর্বঅর্থে সুরক্ষিত? গরিব কি সুরক্ষিত। তার চাকরি, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান। সরকারি পরিসংখ্যানের সাতসতেরোর নীচেও গভীর অন্ধকার বিরাজমান। নিঃসন্দেহে অপারেশন সিন্দুর এই সরকারের অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। পাকিস্তানের সীমান্তের ১০০ কিলোমিটার ভিতর ঢুকে পাক অধিকৃত কাশ্মীর ও মূল পাকিস্তানি ভূখণ্ডে জঙ্গি শিবিরের সঙ্গে সামরিক ঘাঁটিতেও সফল আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যেকোনও সফল সামরিক অপারেশনের মধ্যেও ভুলত্রুটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও অনিবার্য ঘটনা। সংসদে সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা হবে না? কার্গিল যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিনদিন পরই বিজেপি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি একটি বিশেষ কমিটি তৈরি করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘কার্গিল রিভিউ কমিটি’। সেই কমিটিতে কর্তব্যরত সরকারি আমলা ছাড়াও প্রাক্তন সমর বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। ছিলেন বিদেশনীতির পণ্ডিতরা। ওই কমিটি শতাধিক পৃষ্ঠার রিপোর্ট দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়িকে। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর রিপোর্ট সংসদেও পেশ করেছিল তৎকালীন এনডিএ সরকার। তাহলে অপারেশন সিন্দুর নিয়ে সংসদে রিভিউ রিপোর্ট পেশ করা হবে না কেন? বিশেষ অধিবেশনই বা ডাকা হল না কেন? ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে নেহরুর কৌশল ব্যর্থ হয়েছিল। পর্যুদস্ত হয়েছিল ভারত। সংসদে বিরোধীরা তুলোধোনা করবে জেনেও তৎকালীন জনসঙ্ঘ নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির দাবি মেনে বিশেষ অধিবেশনটি ডাকা হয়েছিল। বাষট্টি’র ৮ নভেম্বর ওই অধিবেশন বসেছিল। সামনেই শীতকালীন অধিবেশন আছে বলে সরকার এড়িয়ে যায়নি। ওটাই গণতন্ত্র। তাকে অস্বীকার করা চরম নির্বুদ্ধিতা। এতে কাশ্মীরের ‘ইনসানিয়ত’ ভালো থাকতে পারে না।
আর এবার? সংসদে বিরোধীদের মত প্রকাশের সুযোগ না দিলেও দেশের বক্তব্য ও অপারেশন সিন্দুরের পটভূমি তুলে ধরতে বিভিন্ন দলের এমপিদের বিদেশে পাঠানো হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যেহেতু বর্ষা অধিবেশন আসন্ন তাই তার আগে আর সংসদ ডাকা উচিত নয়। তাহলে মোদি সরকার বিগত ২০১৭ সালের ৩০ জুন মধ্যরাতে জিএসটি চালু করতে বিশেষ অধিবেশন ডেকেছিল কেন? সেবারও তো বর্ষাকালীন অধিবেশনেই জিএসটি চালুর প্রক্রিয়া কার্যকর করা যেত। বর্ষাকালীন অধিবেশন প্রতিবছরই জুন-জুলাই মাসে বসে। নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ, মায় বড়দিনের আগে পর্যন্ত শীতকালীন অধিবেশনও ফিরে ফিরে আসে। বিগত ২০২৩ সালে নবনির্মিত সংসদের বিশেষ অধিবেশন বসে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর। ১৮ সেপ্টেম্বর পুরনো সংসদে সদস্যরা মিলিত হন। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর নয়া সংসদের যাত্রা শুরু। অথচ দু’মাসের মধ্যেই শীতকালীন অধিবেশন নির্ধারিত ছিল। তবুও ওই বিশেষ অধিবেশনেই ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের বিলটি (সংবিধানের ১০৬ তম সংশোধন) আইনে পরিণত করতে হল স্মরণীয় করে রাখতে। শুধু অপারেশন সিন্দুর নিয়ে সংসদ ডাকলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত! অপারেশন সিন্দুরের ঠিক এক মাস বাদে কাশ্মীরে গিয়ে পৃথিবীর উচ্চতম চেনাব সেতুর উদ্বোধন করলেন। দু’-দু’টি বন্দে ভারতের যাত্রা শুরুর সবুজ সঙ্কেত দিলেন। কাশ্মীরি যুবা, আওয়ামকে আশ্বস্ত করলেন। কিন্তু এতে জঙ্গি উপদ্রব পুরো বন্ধ হবে, এমন আশ্বাস দিতে পারলেন কি? ৬ বছর আগে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির সময়ও তিনি একই কথা বলেছিলেন, কিন্তু উপত্যকার রক্তক্ষয় বন্ধ হয়নি। এই গ্রীষ্মে কাশ্মীরের পর্যটন বিপর্যস্ত। ঘোড়াওয়ালা, দোকানদাররা বেকার। কিন্তু আগামী বছর তিন কোটি মানুষ নিরাপদে যেতে পারবেন কি? নাকি কাশ্মীরের ‘ইনসানিয়ত’ আগামী বছরেও এমনিভাবেই আবার আক্রান্ত হবে?
নরেন্দ্র মোদি গত ১১ বছরে দশবার আমেরিকা গিয়েছেন। আর রাশিয়ায় ছ’বার। প্রায় অর্ধেকবার। নিঃসন্দেহে আজকের আধুনিক পৃথিবীতে ভারত মার্কিন সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শেষবার গত বাজেট অধিবেশনের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিংটনে ছুটতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু অপারেশন সিন্দুর ও তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ভারতকে মোটেও স্বস্তিতে রাখেনি হোয়াইট হাউসের ভূমিকা। বরং প্রতি পদক্ষেপে ভারতকে সমর্থন ও নৈতিক সাহস যুগিয়েছে পুতিন সরকার। এস ৪০০ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সুখোই ৩০ এবং ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমানের জন্যই ভারত শেষ হাসি হেসেছে। স্বাধীনতার পর ভারত-পাক লড়াইয়ে প্রতিবারই রাশিয়াই নিকটতম বন্ধুর ভূমিকা পালন করেছে। তাই প্রকৃত বন্ধুকে চিনতে ভুল করলে ভারতের কপালে দুঃখ আছে। মোদিজি ওই ভুলটা করবেন না। আমেরিকা কাশ্মীর সমস্যা বোঝে না। তাদের কাছে সবটাই ভারত-পাক বিরোধ ছাড়া আর কিছু নয়। বিরোধীরা দেশের স্বার্থে বিদেশে সুন্দর, নির্বাচন কিংবা সঙ্কীর্ণ রাজনীতির জন্য কিন্তু নয়।