সুপর্ণকান্তি ঘোষ: বাবা। যে কোনো ছেলের কাছে এই শব্দটির গভীরতা সমুদ্রের মতো। এক কথায় বললে অতলস্পর্শী। আমিও ব্যতিক্রম নই। সুরসাধক নচিকেতা ঘোষের ছেলে বলে অজান্তেই গর্ব অনুভব করি। মাসখানেক আগে বাবার জন্মশতবার্ষিকী সম্পূর্ণ হয়েছে। রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁকে। তবে রাজ্যের তরফ থেকে তেমন কিছু অনুষ্ঠানের কথা শুনিনি। শ্রোতারা শুনছেন কালজয়ী সেই সব গান। আমার অনুভূতি জানতে চান? উইলফ্রেড আওয়েনের ‘দ্য সেন্ড অফ’ থেকে একটি Phrase ধার করে বলতে পারি, ‘গ্রিমলি গ্রে’। ভালোও লাগছে, আবার মাঝেমধ্যেই ভিজে উঠছে চোখের কোণ।
আমার দাদু ছিলেন ডাক্তার। বিখ্যাত চিকিৎসক সনৎকুমার ঘোষ। রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল, বাবাও একই পথে হাঁটুক। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রের ঝিনুকের মধ্যে তরুণ নচিকেতা মুক্তো খুঁজে পাননি। শুধুমাত্র দাদুর ইচ্ছে পূরণের জন্য ডাক্তার হওয়া। তারপর ভেবেছিলেন নায়ক হবেন। কিংবদন্তি সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন ছবিতে অভিনয় করানোর জন্য। নায়িকার নাম শুনলে চমকে উঠবেন— সুচিত্রা সেন। তবে সে ছবি রিলিজ করেনি। এরপর দেবকীকুমার বসুর পরিচালনায় ‘ভালোবাসা’ ছবিতে বাবা শুধু সংগীত পরিচালনাই করেননি, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে একটি ছোট্ট চরিত্রে তাঁকে দেখাও গিয়েছিল। কিন্তু সরগম যে তাঁর জীবন অন্য খাতে বইয়ে দেয়।
সেই ১৯৭৬ সালে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বাবা পাড়ি দিয়েছেন সুরলোকে। খুব বেশিদিন তাঁর সান্নিধ্য পাইনি। কিন্তু সৃষ্টি যে কথা বলে, স্নিগ্ধ করে অনুভূতি-উপলব্ধিকে। বাবার সুরের চলনেই তাঁকে অহরহ খুঁজে পাই। এখনও হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল দিলে আমায় পথ দেখান বাবাই। আজ ‘বর্তমান’-এর পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেব স্বর্ণযুগের সুরকার নচিকেতা ঘোষের বেশ কিছু ঘটনা।
ছেলেবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে চাঁদের হাট। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, মান্না দে, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত—লিখতে লিখতে পাতা শেষ হয়ে যাবে। এই সমস্ত কিংবদন্তিরা ছিলেন আমার কাকা বা পিসি। বাবার সঙ্গে প্রত্যেকের সম্পর্ক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু গানের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপোস করতে না তিনি।
পুজোর গান, দমদমের গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ডিং চলছে। হেমন্তকাকুর গাওয়া একটা গান কিছুতেই পছন্দ হচ্ছে না বাবার। টেক আর রিটেক। শেষে মিউজিশিয়ানদের সামনেই তিনি গম্ভীরভাবে হেমন্তকাকুকে বলে উঠলেন, ‘কথা ও সুর আরও দরদ চাইছে। আপনি যদি ঠিকমতো দিতে পারেন, গান সুপারহিট হবে।’ স্টুডিওয় পিন ড্রপ সাইলেন্স। হেমন্তকাকুর তখন ভারতজোড়া খ্যাতি। কিন্তু সুরকারকে সম্মান দিতে জানেন। তাই কোনো কথা না বলে আবার গানটা গাইলেন। ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠে আবেগ মিশিয়ে গাইলেন, ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললাম...’। এই গানে বঙ্গোটা আমারই বাজানো। বাকিটা ইতিহাস।
বাবার অন্ধ ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন মহম্মদ রফি। ঘটনাটা এমন—‘ইন্দ্রাণী’ ছবির কাজ চলছে। সুরকার নচিকেতা ঘোষের খুব ইচ্ছে, একটি হিন্দি গান ছবিতে ব্যবহৃত হবে। আর গাইবেন স্বয়ং রফি সাব। যা শুনে প্রযোজকের তো মাথায় হাত। মহম্মদ রফির পারিশ্রমিক দেবেন কীভাবে? বাজেটেই তো কুলোবে না। মুশকিল আসান সেই বাবাই। হেমন্ত কাকুকে ধরে চলে গেলেন রফি ম্যানসনে। গান শোনালেন, ‘সভি কুছ লুটা কর...’। চোখ বন্ধ করে শুনলেন শিল্পী। মুগ্ধতার আবেশ তাঁর চোখেমুখে। গান শেষ হতেই বললেন, ‘কেয়া ধুন বানায়া আপনে! ইতনা মিঠা? হাম জরুর গায়েঙ্গে।’ বাবা তো প্রচণ্ড খুশি। কিন্তু পারিশ্রমিক? প্রযোজকের দিকটাও তো তাঁকে ভেবে দেখতে হবে। তাই বললেন, ‘আমরা আপনাকে পাঁচশো টাকার বেশি দিতে পারব না।’ রফি সাব নীরব। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সুরকার আসন ছেড়ে উঠে দরজার দিকে এগোতেই পিছন থেকে ডেকে উঠল সেই সুরেলা কণ্ঠ, ‘টাকার কথা ভাববেন না। আপনার জন্য, সুরের মাধুর্যের জন্য এ গান আমি বিনা পয়সায় গাইব।’ সুরকার ও গায়কের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাই তো সৃষ্টিকে অমরত্ব দেয়।
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সঙ্গেও বাবার দারুণ সম্পর্ক ছিল। ‘ফরিয়াদ’ ছবির গান, ‘নাচ আছে গান আছে’ রেকর্ডিংয়ের সময় মিসেস সেন সুরকার নচিকেতা ঘোষকে বলেন, ‘গানের মাঝে হাসিটা কিন্তু আমিই হাসব, গায়িকা আশা ভোঁসলে নয়।’ সেই বক্তব্য বাবাকে ভাবিয়ে তুলল। শেষ পর্যন্ত উনি রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর মাথায় যে তখন অন্য অঙ্ক কাজ করছে। মুম্বই পৌঁছে আশাজিকে বললেন, ‘আপনাকে একটা কঠিন কাজ করতে হবে। গানের মধ্যে হাসিটা এমনভাবে হাসবেন, অভিনয়ের ঝলক দেখাবেন যে সুচিত্রা সেনও যেন হার মেনে যান।’ চ্যালেঞ্জ নিলেন আশাজি। রেকর্ডিংয়ের সময় গাইতে গাইতে হাসলেন, আবার হাসতে হাসতে কেঁদেও ফেললেন। যা শুনে মহানায়িকা পর্যন্ত স্তব্ধ। বাবাকে বলেছিলেন, ‘এ যাত্রায় আমার হাসিটার আর দরকার নেই।’ আসলে আশাজির সঙ্গে বাবার কেমিস্ট্রি দারুণ ছিল। একটা গল্প বললে বুঝতে সুবিধা হবে। ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবির তিনটি গান রেকর্ডিং হওয়ার কথা। ‘আলো আর আলো দিয়ে’, ‘কিচিমিচি, কিচিমিচি’ ও ‘ঘুমপাড়ানি গানে কবে’। কিন্তু রেকর্ডিংয়ের দিন অ্যারেঞ্জার সুমিত মিত্র জানালেন, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল তাঁকে আসার অনুমতি দিচ্ছেন না। কিন্তু বাবা কিছুতেই হারার পাত্র নন। আশাজি বলেছিলেন, ‘ঘোষদা, আপ কিজিয়ে আপনা কাম। ম্যায় আপকা সাথ হুঁ।’ একজন মিউজিশিয়ানকে ডেকে বাবা নোটেশন ও কর্ড লেখালেন। এভাবেই গান রেকর্ড হয়েছিল। মানা কাকু (মান্না দে) খুব খুশি। নিজের গাড়িতে আমাকে আর বাবাকে তুলে নিয়ে গেলেন বম্বের নতুন রেস্তরাঁ ‘কপার্স চিমনি’তে। পেটপুরে খাওয়ালেনও।
বাবা ছিলেন ভোজনরসিক। চপ-কাটলেট-কষা মাংস ছাড়া দিন কাটত না। দেখলে মনে হত গম্ভীর। কিন্তু মিশলে এই ভাবনা উলটে যেতে বাধ্য। আর ছিল পরোপকারিতার নেশা। বিখ্যাত গায়ক রবীন মজুমদারকে মনে পড়ে? ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির চরণদাস চরিত্রের জন্য তাঁকেই বেছে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। জীবনের শেষদিকে রবীন জেঠু নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। বাবা তাই তাঁকে রীতিমতো তুলে এনে আমাদের বাড়িতে রেখেছিলেন। এক -দু’ মাস নয়, সাত-সাতটা বছর। তাঁর চিকিৎসাও করেছিলেন আমার দাদু। একদিন শ্যামবাজারের গোলবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কষা মাংস খেতে খেতে গৌরী কাকাকে বললেন, ‘রবিদা’র জন্য একটা গান লেখ তো।’ যেমন কথা তেমনি কাজ। দোকানের সামনে দাঁড়িয়েই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার খসখস করে লিখে ফেললেন, ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’। বাবা সুর দিলেন। গান শোনানো হল রবীন মজুমদারকে। সঙ্গেসঙ্গে বললেন, ‘ফাটিয়ে দিয়েছিস।’ মুহূর্তের মধ্যে আবার শোনা গেল রবীন জেঠুর গলা, ‘এ গান আমার থেকেও ভালো গাইবেন হেমন্ত বাবু। তুই তাঁকে দিয়েই গাওয়া।’ তাই-ই হল। গানের স্বার্থে নিজের ঘুরে দাঁড়ানোর মঞ্চ রবীন মজুমদার ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনটাই ছিল স্বর্ণযুগ। গীতিকার, সুরকার ও গায়কের ত্রিবেণী সংগমই তার ইউএসপি।
অনুলিখন: সোমনাথ বসু