সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: একটা ছবি। একটু উপর থেকে তোলা। পোশাকি ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘টপ শট’। সেই ছবিজুড়ে রয়েছে পর পর কিছু পাহাড় (!)। একটু উঁচু জায়গা থেকে ছবিটা তোলার ফলে সেগুলির উচ্চতা আন্দাজ করা একটু কঠিন। হিসেবের মাপকাঠিতে সেগুলির সবক’টি পাহাড় নাও হতে পারে। কয়েকটির উচ্চতা যদি টিলা-সমান হয়, অবাক হওয়ার কিছু নেই। যাক সে কথা। সেই পাহাড়ের (অথবা টিলা-পাহাড়ের যুগলবন্দি) গা বেয়ে হাজির হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। একটু জুম করলে বোঝা যাবে, সেই জমায়েত প্রায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ। একেবারে সামনের ভিড়টা হাজির হয়েছে অপেক্ষাকৃত সমতল ভূমিতে। মাঝারি উচ্চতার কিছু গাছ, ঝোপঝাড়ের সামনে। হাতে বেশ কয়েকটা বড় মাপের ব্যানার। তার কোনওটায় লেখা, ‘আরাবল্লি বাঁচাও’, ‘সরকার জাগো’, ‘সেভ আরাবল্লি’। ভিড়ের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ, মাঝবয়সি মহিলা থেকে তরুণ যুবা—কে নেই! অনেকের কাঁধে ভারতের পতাকা। মুখে একটা দাবি—বাঁচাতে হবে আরাবল্লি পর্বতকে।
আরাবল্লির সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ভূগোলের পাঠ্য বইয়ে। তারপর কোনওবার পুজোর ছুটিতে রাজস্থান ভ্রমণের সুবাদে আরাবল্লি পর্বত দর্শন। থর মরুভূমির রুক্ষতার মাঝে আরাবল্লির গা ছুঁয়ে রয়েছে পাহাড়ঘেরা মনোরম এক হ্রদ—নাক্কি লেক। আর সেই হ্রদকে ঘিরেই রাজস্থানের একমাত্র শৈলশহর—মাউন্ট আবু। তার আগে অবশ্য ফেলুদার মুখে আরাবল্লির ডাকাতদের তলোয়ার দিয়ে নাক কেটে শাস্তি দেওয়ার কথা শুনে লালমোহনবাবুর মতো আমরাও শিহরিত হয়েছিলাম। এসবের বাইরে ছোটোখাটো ঘটনা-দুর্ঘটনা বাদে আরাবল্লি পর্বতের সঙ্গে আমাদের বিশেষ কোনও যোগাযোগ ঘটেনি। আচমকাই সেই পর্বতশ্রেণিই খবরের শিরোনামে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও আলোচনার কেন্দ্রে আরাবল্লি। কেন? তার কারণ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়। সেখানে বলা হয়েছে, ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি হলে তবেই সেই পাহাড়কে আরাবল্লি পাহাড়শ্রেণির অংশ বলা যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নয়, আশপাশের এলাকার তুলনায় ১০০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতার ভূখণ্ডই কেবলমাত্র আরাবল্লি পাহাড় বলে গণ্য হবে, কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় এমনটাই বলা হয়েছিল। আর তাতেই সিলমোহর দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এতদিন পর্যন্ত আরাবল্লি বলতে যে সব পাহাড়কে বোঝানো হত, তার প্রায় ৯১ শতাংশই ‘পাহাড়’ মর্যাদা হারাবে। একইসঙ্গে হারাবে আইনি সুরক্ষাও। সেই সমস্ত জায়গায় অতি সহজেই শুরু হবে খননকাজ। পর্যটন কেন্দ্রের চাহিদা মেনে বিনা সমস্যায় গড়ে তোলা যাবে ঝাঁ চকচকে হোটেল। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর থেকেই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে সই সংগ্রহ, #AravalliBachao, #AravaliProtection, #SaveAravali হ্যাশট্যাগে প্রচার। দিল্লি, হরিয়ানা, গুজরাত, রাজস্থানের মতো রাজ্যে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ-আন্দোলন। পথে নেমেছেন গ্রামের আম জনতা থেকে ছাত্র, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, পরিবেশকর্মীরা। সকলের একটাই দাবি—নতুন এই সংজ্ঞা বাস্তবে কার্যকর হলে আরাবল্লির মৃত্যুঘণ্টা বেজে যাবে। কারণ খনন, নির্মাণ ও শিল্পের জন্য কোনও বাধা থাকবে না। যা পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। গত সোমবার অবশ্য সেই রায়ের উপরে স্থগিতাদেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং গুজরাতের মধ্য দিয়ে প্রায় ৬৯২ কিলোমিটার এলাকাজু়ড়ে বিস্তৃত আরাবল্লি পর্বতমালা গত ২০০ কোটি বছর ধরে উত্তর ভারতের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। থর মরুভূমি থেকে উড়ে আসা বালি, ধূলিকণা রুখে দেয় এই অনুচ্চ পাহাড়গুলি। দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যের ৩৭টি জেলার জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ, পশুখাদ্য, ভেষজ গাছ আসে আরাবল্লির বনভূমি থেকেই। অন্যদিকে, স্যান্ডস্টোন, লাইমস্টোন, গ্রানাইট, মার্বেল পাথরের পাশাপাশি তামা, দস্তা, সীসার মতো খনিজ সম্পদে ভরা এই পাহাড়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নানান কর্পোরেট সংস্থার ‘নজর’ রয়েছে এর উপরে। আর একবার কর্পোরেট সংস্থাগুলি সেখানে খননের অনুমতি পেলে জনজাতিরা নিজেদের অধিকার হারাবেন। আন্দোলনকারীদের মতে, এই সমস্ত কারণে পর্বতের সংজ্ঞা নির্ধারণের জন্য শুধুমাত্র উচ্চতা আর ঢালের হিসেব কষা উচিত নয়। তার পরিবেশগত ভূমিকা, জলধারণ ক্ষমতা, বাস্তুতন্ত্রও সেই সংজ্ঞার অংশ হওয়া উচিত।
মতামতই হোক বা প্রস্তাব—কথাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃতিকে যদি আমরা কেবল মাপজোকের ছকে ফেলি, তাহলে তার আত্মাই হারিয়ে যায়। আর এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এতদিন যখন পাহাড় কাটা হচ্ছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম? দশকের পর দশক ধরে আরাবল্লি থেকে পাথর কাটা হয়েছে। হচ্ছেও। মার্বেল, গ্রানাইট, নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। আজ রাজস্থানের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মেঝে, দিল্লি-এনসিআরের অসংখ্য বহুতল, এমনকি কলকাতার ফ্ল্যাটেও আরাবল্লির পাথর রয়েছে। তখন কোথায় ছিল এই প্রতিবাদ? সেই সময়ে কখনও কি আমরা প্রশ্ন করেছি—এই মার্বেল এল কোথা থেকে? কখনও কি সোশ্যাল মিডিয়ায় পাহাড় বাঁচানোর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে? নাকি কখনও টিভি স্টুডিওতে প্রাইমটাইম বিতর্ক হয়েছে? উত্তরটা অস্বস্তিকর হলেও সোজা—না। আজ যখন নতুন সংজ্ঞা, নতুন প্রকল্প, নতুন রাজনৈতিক সংঘাত সামনে এসেছে, তখন হঠাৎ করেই আমরা সবাই পরিবেশবিদ হয়ে উঠেছি। এটা আর যাই হোক, পরিবেশ সচেতনতা নয়। এটা হল আমাদের সুবিধাবাদী মনোভাব। আসলে এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নিজের সুবিধার সময় চুপ করে থেকে, পরে নৈতিকতার ঝান্ডা তুললে সেই প্রতিবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। আজ আরাবল্লি নিয়ে আন্দোলনের বড় অংশই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর। ভাইরাল ভিডিও, চোখে জল আনা রিল, ক্ষোভের পোস্ট—সব আছে। কিন্তু দু’চারজন বাদে আরও কারও পোস্টেই না আছে ইতিহাস, না আত্মসমালোচনা। আমাদের বুঝতে হবে, পরিবেশ রক্ষা কোনও ট্রেন্ড নয়। এটা দীর্ঘমেয়াদি একটা দায়িত্ব। পাহাড় শুধু তখনই ‘মা’ হয়ে ওঠে না, যখন তার গায়ে বুলডোজার চলে। পাহাড় তখনও পাহাড় ছিল, যখন আমরা তার পাথরে বাড়ি বানাচ্ছিলাম।
সেই সমস্ত ভুল শুধরে আরাবল্লি বাঁচাতে নিজেদের ১০০ শতাংশ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াটা আজ সত্যিই প্রয়োজন। শুধুই পরিবেশের জন্য নয়, আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্যও। কথাগুলি একটু বেশি ভারী আর অতিরঞ্জিত মনে হলে একটু গুগল করে নেওয়া যেতে পারে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এ সংক্রান্ত নানান উদাহরণ। কারণ, পাহাড় বা বন ধ্বংস মানে শুধু গাছ কাটা বা পাথর সরানো নয়। এটি এক ধরনের শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া, যার শেষ প্রান্তে থাকে জলবায়ু বিপর্যয়, খাদ্য সংকট এবং প্রজাতির বিলুপ্তি। আর এই প্রক্রিয়াগুলি কখনও একদিনে ঘটে না। সবসময় শুরুটা হয় ‘উন্নয়নের প্রয়োজন’ দিয়ে। মাঝে আসে ‘নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি’, আর শেষটা হয় এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে—যেখান থেকে আর ফেরার পথ থাকে না।
আমাজন রেইন ফরেস্টের কথাই ধরা যাক। পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ আসলে একটা উপমা। আমাজন শুধু অক্সিজেন দেয় না, এটা পুরো দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আমাজনের গাছপালা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জল বাষ্পীভূত করে বায়ুমণ্ডলে পাঠায়। এই জলীয় বাষ্প মেঘ তৈরি করে, যা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়ে বৃষ্টি নামায়। যা ‘ফ্লাইং রিভার’ নামে পরিচিত। অদৃশ্য এক নদী, যা বন থেকেই জন্ম নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ব্যাপক বন নিধনের ফলে আমাজনের এই স্বাভাবিক জলচক্র ভেঙে পড়ছে। বাষ্পীভবন কমছে, ফলে বৃষ্টির পরিমাণও হ্রাস পাচ্ছে। ফল—দীর্ঘ খরা, অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ এবং এমন এক ‘হাইপার-ট্রপিক্যাল ক্লাইমেট’, যেখানে বন নিজেই আর বেঁচে থাকতে পারছে না। অর্থাৎ, বন ধ্বংসের ফলে যে জলবায়ু তৈরি হচ্ছে, সেটাই আবার বাকি বনকে ধ্বংস করছে। এটাই হল ‘টিপিং পয়েন্ট’। একটা সীমারেখা, যার পরে আর আগের অবস্থায় ফেরা সম্ভব নয়।
শিক্ষা নিতে পারি ইন্দোনেশিয়া থেকেও। চিনি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আখ চাষ বাড়াতে পাপুয়ার মেরাউকে জেলায় ৫০ লক্ষ একর জঙ্গল ও জলাভূমি কেটে সাফ করছে সেদেশের সরকার। ৮৪০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ বলে কথা। উন্নয়নের জন্য এটুকু ধ্বংস সহ্য করতেই হবে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে, বন কেটে আখ বা একফসলি চাষ শুরু হলে মাটির স্বাভাবিক গঠন ভেঙে পড়বে। গাছের শিকড় না থাকায় মাটি জল ধরে রাখতে পারবে না। ভূগর্ভস্থ জলস্তর ক্রমেই নামতে থাকবে। অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা, আবার সামান্য বৃষ্টির ঘাটতিতেই খরা দেখা দেবে। ধ্বংস হবে পরিবেশ। সেই ধ্বংসের হাতেগরম সাক্ষী রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের জেরে বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যু ১৫০০ ছাড়িয়েছে। আর তার নেপথ্য কারণ হিসেবে প্রকৃতি ধ্বংসের দিকেই আঙুল তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। হিসেব বলছে, ২০০১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত সেখানে ৪৪ লক্ষ হেক্টর জঙ্গল কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলি আসলে আরাবল্লি নিয়ে একটা স্পষ্ট বার্তা দেয়। পাহাড়কে আমরা যদি শুধুই খনিজ সম্পদের স্তূপ হিসেবে দেখি, তাহলে তার মূল্য বোঝা কঠিন। আসলে আরাবল্লি পর্বতমালা উত্তর ভারতের জন্য ঠিক সেই ভূমিকা পালন করে, যা আমাজন করে দক্ষিণ আমেরিকার জন্য। এখানে পাহাড় কাটা মানে শুধু কয়েকটি জেলার পরিবর্তন নয়। এর প্রভাব পড়বে বাতাসে, জলে, কৃষিতে এবং মানুষের জীবনে। আরাবল্লি নামক ‘রক্ষাকবচ’ না থাকলে থর মরুভূমির বালি আরও পূর্বে প্রসারিত হবে। হরিয়ানা, দিল্লি সহ এনসিআর অঞ্চলে থাবা বসাবে থর মরুভূমি। ফলে রাজধানী এলাকার দূষণ এবং তাপমাত্রা দুইই বাড়বে। সহজেই আছড়ে পড়বে ধুলোঝড়। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে বৃষ্টিপাতে সহায়তা করে আরাবল্লি। তা ধ্বংস হলে উত্তর ভারতের বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে। হয়তো ধীরে ধীরে, কিন্তু তা হবে নিশ্চিতভাবেই। আর একবার এই প্রক্রিয়া শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা কার্যত অসম্ভব। অপরিকল্পিত উন্নয়ন কিন্তু শেষ পর্যন্ত উন্নয়নকেই ধ্বংস করে।