মনে করা হয় যে সভ্যতা এসেছে চাকায় ভর দিয়ে। চাকা শুধু রকমারি গাড়ির সন্ধান দেয়নি, প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ক্রমে যুগান্ত সৃষ্টি করে চলেছে। সভ্যতা, উন্নয়ন কখনও সীমারেখা মানে না। তৈত্তিরীয় উপনিষদের আহ্বান ‘চরৈবেতি (এগিয়ে যাও)’ মেনেই দুনিয়ার নিরন্তর এগিয়ে চলা। কিন্তু আমাদের অগ্রগমনের ইতিহাস মসৃণ নয়। নানাবিধ বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেই এই পর্যন্ত পৌঁছোনো। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির প্রতিটি আশীর্বাদ মানুষকে ছুঁয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদগণ তাঁদের অধ্যবসায় সাধনাবলে যাকিছু লাভ করেছেন সেসবের সুবিধা মানুষের যাপনচিত্র বদলে দিয়েছে। কিন্তু তার প্রয়োগবিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়েছে মানুষেরই অন্য একটি অংশকে। তবেই আবিষ্কারগুলি ব্যবহারিক জীবনে ফলপ্রসূ হতে পেরেছে। এই প্রয়োগের দিকটি যাঁরা দেখেন তাঁরাই হলেন শ্রমিক বা কর্মী। অর্থাৎ সভ্যতা শুধু নতুন জিনিস এবং আনন্দ উপহার দেয়নি, বহু মানুষকে উপযুক্ত জীবিকার সন্ধানও দিয়েছে।
সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস বলে যে, বহু আবিষ্কার কিছু পুরোনো জিনিস এবং অভ্যাসকে বাতিল করেছে। যেমন গোরুর গাড়ির জায়গা নিয়েছে মোটর গাড়ি। স্টিম ইঞ্জিনের জায়গা নিয়েছে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন। মেট্রোরেলের কাছে হেরে গিয়েছে ট্রাম। দাঁড়টানা নৌকার জায়গা নিয়েছে স্টিমার। বহু শহর সাধারণ বাস, পেট্রল বা ডিজেল চালিত গাড়ি বাতিল করে এনেছে ইলেক্ট্রিক গাড়ি। হস্তচালিত তাঁতের জায়গা নিয়েছে পাওয়ার লুম। নগদ লেনদেনের পরিসর ক্রমে ছোটো হয়ে আসছে, বাড়ছে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রচলন। এটিএম মেশিনকে তো টাকার গাছ মনে হয়েছিল! এইভাবে কাগজ-কলম (ফাউন্টেন পেন) এসে, তালপাতায় ভুষোকালিতে খাগের কলমে লেখালেখিকে মান্ধাতার আমলের কারবার বলেছিল। এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমরা সকলেই দিতে পারি। নতুন জিনিস এসে কিছু পুরোনো জিনিস এবং ব্যবহার বদলে দিলে সাধারণভাবে কোনও ক্ষতি নেই। আবার এখানেই উদ্বেগের কারণ। কেননা, যুগান্তকারী প্রতিটি আবিষ্কার এবং জিনিসের প্রবর্তন অসংখ্য মানুষের জীবিকার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। নতুনকে গ্রহণ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং প্রশিক্ষণ জরুরি। ব্যাপারটা ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই যে ট্রানজিশনাল পরিস্থিতি, এইসময়ে দেশজুড়ে স্ট্রাকচারাল আনএমপ্লয়মেন্ট বা দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব সৃষ্টি হওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা থাকে। এর বড়ো কারণ সেই মুহূর্তে বাজারে এসে পড়া কাজের সুযোগ গ্রহণের উপযোগী প্রশিক্ষিত লোকজন তখন বিশেষ থাকে না। অন্যদিকে, বহুদিনের পুরোনো কাজগুলি অনেকাংশে সেকেলে বা অচল হয়ে পড়ে। আমাদের মনে থাকতে পারে, গত শতকের আশির দশকে কম্পিউটারাইজেশন ভারতবাসীর জীবন-জীবিকার সামনে এক বৃহৎ প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। এনিয়ে কমবেশি সকলেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসুর মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং রাজ্য সরকার তো কম্পিউটারের বিরুদ্ধে যুদ্ধই ঘোষণা করে দিয়েছিল।
যাই হোক, পরে অবশ্য বাংলার যুব শ্রেণিই কম্পিউটারাইজেশনের সুবিধা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে। এই বিষয়ে উন্নত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী দেশে ও বিদেশে মোটা বেতনের চাকরি করছেন। আর কম্পিউটার এবং তার যন্ত্রাংশের শিল্প-ব্যবসারও প্রসার ঘটেছে এই বঙ্গে, এই দেশে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির এই নিয়মেই এবার আসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ইতিমধ্যেই জীবনের নানা ক্ষেত্রে ঘটেছে। তার দরুন অবশ্যই প্রভাবিত হয়েছে একাধিক জীবিকা। বিষয়টি সরকার এবং সরকারের পরামর্শদাতাদেরও নজর এড়ায়নি। দেশের শীর্ষ নীতি নির্ধারক সংস্থা নীতি আয়োগের একটি রিপোর্ট বলছে, এআই-এর ধাক্কায় ভারতে দৈনিক কাজ হারিয়েছেন গড়ে ৫০০ জন কর্মী। তাদের আশঙ্কা, এর এই ব্যাপারে অবিলম্বে সতর্ক না-হলে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারাতে পারেন। এই বিশেষ দক্ষ কর্মীরা তথ্য-প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থায় এখন কর্মরত। একইরকম অশনিসংকেত মিলেছে ‘রোডম্যাপ ফর জব ক্রিয়েশন ইন দি এআই ইকোনোমি’ নামক এক রিপোর্টেও। নীতি আয়োগের সিইও বি ভি আর সুব্রহ্মণ্যম এই রিপোর্টের মুখবন্ধে মন্তব্য করেছেন, ‘এআই যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে, তখন ভারত একটি সংকটজনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয় এই ঢেউয়ে জোর ধাক্কা খাব, নয়তো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্ব দেব।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নয়া বেকারত্ব রুখতে ‘এআই স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিন’ গড়ে তোলা দরকার। জোর দিতে হবে স্কুল-কলেজের শিক্ষাক্রম থেকেই। নীচের দিকের পাঠ্যক্রমেই ‘এআই’ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। ভারতের গর্বের ‘হোয়াইট কলার ট্যালেন্ট’ রক্ষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবেই সার্থক হবে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন এবং আগামী দিনে দেশজুড়ে নতুন কর্মসংস্থানের পরিসরও চওড়া হবে।