সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ঠিক যেন ‘আরব বসন্ত’! গত ৬ সেপ্টেম্বর নেপালের এক মন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত হয় এক ছাত্রী। তাকে রাস্তায় ফেলে রেখেই চলে যান মন্ত্রী। ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করেননি তিনি। এই একটি দৃশ্যই হয়ে ওঠে
সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ঠিক যেন ‘আরব বসন্ত’! গত ৬ সেপ্টেম্বর নেপালের এক মন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত হয় এক ছাত্রী। তাকে রাস্তায় ফেলে রেখেই চলে যান মন্ত্রী। ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করেননি তিনি। এই একটি দৃশ্যই হয়ে ওঠে
সরকারের স্বৈরাচারের প্রতীক। ফল—নেপালজুড়ে ‘জেন-জি’ বিদ্রোহ।
বিদ্রোহের ছাইচাপা আগুনটা অবশ্য ছড়াতে শুরু করেছিল এই মর্মান্তিক ঘটনার কিছু আগে থেকেই। একটি বিশেষ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলেছেন কিছু ব্যবহারকারী। তাঁরাই ‘ফেক নিউজ’ ছড়াচ্ছেন। সরকারের কড়া নজর এড়িয়ে সেইসব বিষয়বস্তুর রমরমা ক্রমেই বাড়ছে সমাজমাধ্যমে। তাই ‘অপব্যবহার’ রুখতে দেশি-বিদেশি সব ধরনের প্ল্যাটফর্মকে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকে নথিভুক্ত হতে হবে। জানিয়েছিল নেপালের সুপ্রিম কোর্ট। টিকটক, ভাইবার পপো লাইভ, উইটকের মতো কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম সেই নির্দেশ মেনে নেয়। বাদ সাধে মেটা, অ্যালফাবেট, এক্স, রেডিট, লিঙ্কডইনের মতো সংস্থাগুলি। সময়সীমা পেরতেই ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, লিঙ্কডইন, রেডিট, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাট সহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয় নেপালের কে পি ওলির সরকার।
সরকারের এই একটা সিদ্ধান্তই নেপালের ‘জেন-জি’কে ঝাঁকিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কেন? তার জন্য বুঝতে হবে ‘জেন-জি’দের মনস্তত্ত্ব। এঁরা কারা? ‘জেন-জি’দের জন্ম ১৯৯৭-২০১২ সালের মধ্যে। ১৩ থেকে ২৮ বছর বয়সি এই ছেলেমেয়েদের বেড়ে ওঠা ডিজিটাল দুনিয়ায়। পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হোক বা বিনোদন, প্রেম, বিচ্ছেদ—সবকিছুই ইন্টারনেট নির্ভর। এই প্রজন্ম আদ্যন্ত স্মার্ট। তাঁরা সোজা কথা বলে সোজাভাবে। অতি সংক্ষেপে। যে কথাটা আমরা তিন লাইনে বলি, তাঁরা সেটা বলে তিন শব্দে। কখনও কখনও মাত্র তিন অক্ষরে! নিজস্ব লিঙ্গতে। তাঁদের সারা দিনের অধিকাংশ কাজ চলে স্মার্টফোনে। এমনকী উপার্জনও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে রিল-ভিডিও পোস্ট করে আয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন নেপালের কয়েক হাজার যুবক-যুবতী। একটা ঘোষণায় তাঁদের আয়ের সেই পথ বন্ধ করে দেয় সরকার। পেটের টান ছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে এই ‘জেন-জি’র নাড়ির সম্পর্ক। সেই নাড়ি ধরেই টান দিয়েছিল ওলি সরকার। মিলল হাতেগরম পরিণাম। শুরু হল আন্দোলন। সামাল দিতে গুলি চালাল সরকার। প্রাণ গেল অন্তত ৭২ জনের। আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়াল। পাল্টা দ্বিগুণ আক্রোশে এমপি-মন্ত্রী-আমলাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলেন নিহত আন্দোলনকারীদের বন্ধু-স্বজন-সহযোদ্ধারা। প্রকাশ্য রাস্তায় গণধোলাইয়ের শিকার হলেন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা। এই সমস্ত দৃশ্য দেখতে দেখতে যেন শুনতে পাচ্ছিলাম এই প্রজন্মের হুঁশিয়ারি—‘ডোন্ট মেস উইথ জেন-জি’। গোদা বাংলায়, ‘আমাদের সঙ্গে লাগতে এসো না।’
‘জেন-জি’র এই না বলা আপ্তবাক্যটি বোধহয় ভুলে গিয়েছিল ওলি সরকার। না হলে যে সরকার ও নেতা-মন্ত্রীদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবন নিয়ে এই প্রজন্মের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তো নজর এড়ানোর কথা নয়। সেসব ক্ষোভের কথা কমবেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতেনও ‘জেন-জি’রা। কিন্তু তাঁদের সেই মুখ বন্ধ করতে এক ধাক্কায় ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধের সিদ্ধান্তকে আগুন ঘি ঢালার সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এ যেন আগুনে গোটা ঘিয়ের টিন উপুড় করে দেওয়া। ফল কী হল? দেশের নানা ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সুযোগ-সুবিধাগত পার্থক্য ও দুর্নীতির মতো বিষয়গুলিকে বিশ্বের সামনে নিয়ে এলেন ‘জেন-জি’রা। স্পষ্টভাষায় সেসব কথা তাঁরা তুলে ধরে কোথায়? নিজেদের ঘরের মাঠ—সোশ্যাল মিডিয়াতেই। সরকারের ব্যান ঘোষণার পরেও। কীভাবে? সৌজন্যে— ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন)। একটি রিপোর্ট বলছে, সরকার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যান করতেই বুদ্ধের দেশে ভিপিএন ব্যবহার ৬ হাজার শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। এই ভিপিএন ব্যবহার করেই ‘ব্যান’ হওয়া সোশ্যাল মিডিয়াতেই তাঁরা তুলে ধরেন রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পোশাক–গয়না শো-অফের ছবি, ভিডিও, রিলস। মুহূর্তে দেশজুড়ে ভাইরাল হতে শুরু করে সেই সব কন্টেন্ট। সঙ্গে ব্যঙ্গ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে থাকে একের পর এক হ্যাশট্যাগ—‘নেপো কিডস’, ‘নেপো বেবিস’, ‘পলিটিশিয়ানস নেপো বেবি নেপাল’। এই ধরনের ভিডিওর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জুড়ে দেন ‘জেন-জি’রা। বলা হয়, ‘রাজনীতিবিদদের সন্তানদের এই সাফল্য কি ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফসল নাকি বিশেষ সুবিধার কারণে?’ টিকটকে অনেকে আবার সাধারণ নেপালি জনগণের রোজকার বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জিনিসপত্র ও ব্যয়বহুল ছুটি কাটানোর দৃশ্যের তুলনা করে ভিডিও পোস্ট করেন। সেরকমই একটি পোস্টে লেখা হয়, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত বাবা-মারা করদাতাদের যে কষ্টার্জিত অর্থ চুরি করেন, সেই টাকায় তাঁদের নেপো বেবিরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। এই অর্থ মূলত প্রবাসী শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টের বিনিময়ে দেশে পাঠানো অর্থ।’ তুমুল ভাইরাল একটি ভিডিওতে একজন টিকটক ব্যবহারকারী বলেন, ‘নেপো কিডসরা ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে তাঁদের জীবনযাত্রা প্রদর্শন করেন। কিন্তু সেই টাকা কীভাবে আসে, তা কখনও ব্যাখ্যা করে না।’ এসবের মধ্যেই ক্ষুব্ধ কয়েকজন লেখেন, ‘ওঁদের সন্তানরা গুচির ব্যাগ নিয়ে ফেরে, আমাদের সন্তানরা ফেরে কফিনে।’
এখানেই শেষ নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুশীলা কারকিকেও ‘জেন-জি’রা বেছে নিয়েছেন ডিসকর্ড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে। কে পি ওলির পদত্যাগের পরে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে ‘ইয়ুথ এগেইনস্ট করাপশন’ নামের সার্ভারে ভোটাভুটিও হয়। আন্দোলন থেকে নির্বাচন—‘জেন জি’দের সবটাই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর। তবে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি নিয়েও যে তাঁরা যথেষ্ট সচেতন, তার প্রমাণ মিলেছে আন্দোলনকারীদের বক্তব্যেই। ২৪ বছরের যুজান রাজভাণ্ডারী বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের বিষয়টি আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। কিন্তু শুধু এই কারণেই আমরা এখানে জড়ো হইনি। নেপালে দুর্নীতি যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, আমরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি।’ আবার বছর কুড়ির ছাত্রী আইজাকমা তুমরোক বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। অন্যরা হয়তো এটা সহ্য করে এসেছে, কিন্তু আমাদের প্রজন্মেই এর অবসান ঘটাতে হবে।’
আসলে কাঠমাণ্ডুর রাস্তায় যা ঘটেছে, তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছে নতুন কিছু নয়। স্বৈরাচারের প্রতিবাদে তরুণদের ঢল, কার্ফু অমান্য, সরকারি ভবনে আগুন, পুলিশ-সেনার গুলি, পাল্টা পাথরবৃষ্টি, শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন—এসবই ভীষণ চেনা। তবে এই দৃশ্য নেপালে আসতে হয়তো আরও কিছু দিন, মাস বা বছর সময় লাগত। কিন্তু বিদ্বেষ-ভুয়ো খবর ঠেকানোর নামে নেপাল সরকার সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে চটিয়ে ফেলে ‘জেন-জি’দের। যে কারণে ওয়াশিংটনে বসে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘নেপালের সরকার আসলে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান করে এই ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে চেয়েছিল। কিন্তু ফল হল সম্পূর্ণ উল্টো।’ আসলে এই সময়ে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট কোনও সমাধান নয়। বরং তা ‘জেন-জি’র ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পাল্টা তাঁরা এই সোশ্যাল মিডিয়াকে জন-আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। কাজে লাগায় ভিপিএন, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবাকে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কা (২০২২) ও বাংলাদেশ (২০২৪) তার সাক্ষী থেকেছে। ইন্দোনেশিয়াজুড়ে চলতে থাকা অস্থিরতার নেপথ্যেও রয়েছে এই একই কারণ। এই ট্রেন্ডের সূচনা হয়েছিল ২০১০ সালে। ‘আরব বসন্তে’র হাত ধরে। আরব দুনিয়া ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে উঠেছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন ঝড়। আর তা সংগঠিত হতো সোশ্যাল মিডিয়াকে (মূলত ফেসবুক) কাজে লাগিয়ে। আর বিদ্রোহের মুখ তরুণ প্রজন্ম। যাঁদের বড় অংশই ‘জেন-জি’।
এই প্রজন্ম শুধু নেপালে নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে পরিবর্তনের একটা ঢেউ তুলেছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য শুরু হয়েছে ‘ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’ আন্দোলন। যেখানে প্রতি শুক্রবার স্কুলে যাওয়ার বদলে রাজনীতিবিদদের সামনে পরিবেশ রক্ষার দাবি তুলতে আন্দোলনে শামিল হন পড়ুয়ারা। যে আন্দোলনের পুরোধা বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ‘জেন-জি’ মুখ, গ্রেটা থুনবার্গ। এছাড়াও ইউরোপজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন ‘জেন-জি’রা। তাঁদের হাত ধরে বদলাচ্ছে বিশ্বের তথাকথিত কর্পোরেট কালচারও। বদলে তৈরি হচ্ছে নতুন এক কর্মসংস্কৃতি। হায়ারার্কিক্যাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের বদলে টিম-বেসড কোল্যাবরেশন তাঁদের বেশি পছন্দের। অফিসে এসে ঘড়ি ধরে কাজের বদলে বাড়ি বা অন্য কোথাও বসে কাজ করার প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাতে বলা হয়েছে, জেন-জি অটোমেশন টুলস, ডেটা অ্যানালিটিক্স বা এআই নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহারে রীতিমতো পারদর্শী। তাঁরা অত্যন্ত দ্রুত নতুন প্রযুক্তি শিখে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে।
এমনটা নয় যে, এই প্রজন্ম শুধুই নিজেদের কথা ভাবে। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, জেন-এক্স বা মিলেনিয়ালদের তুলনায় ‘জেন-জি’রা সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিকতার প্রতি অনেক বেশি সচেতন। যাঁরা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নে বিশ্বাসী নন। নিজের পাশাপাশি সমাজের ভালোর দিকেও লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের। আসলে এই প্রজন্মের চিন্তা-চেতনায় প্রথাগত সমাজব্যবস্থার তুলনায় উদ্ভাবনী ভাবনা ও মুক্তচিন্তার প্রভাব অনেক বেশি। তাঁরা যেমন মানবাধিকার নিয়ে সচেতন, তেমনই পরিবেশ সংরক্ষণেও আগ্রহী। এসব কোনও কিছু নিয়েই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানাতে ভয় পায় না তাঁরা।
‘জেন-জি’ আন্দোলনের জেরে নেপালের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পট পরিবর্তন গোটা প্রজন্মের কাছে একটা হাতেকলমে শিক্ষা। এক নতুন দিশা। ‘নেপো কিডস’-এর মতো (অপ)সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ—এই সবই তাঁদের শক্তি। পরিবর্তনের চাবিকাঠি আসলে তাঁদেরই হাতে।