জনসাধারণের ঐহিক ও পারত্রিক কল্যাণ কামনায় পূর্ব্বাপর মঠ মন্দির সকল প্রতিষ্ঠিত হইত। ঐ সকল মঠই পূর্ব্বে আমাদের দেশের ধর্ম্ম কর্ম্ম ও শিক্ষা দীক্ষার প্রধান কেন্দ্রস্থল ছিল এবং প্রয়োজনানুরূপ সাধারণের [–সেবায়] মঠের সিংহদ্বার সর্ব্বদাই উন্মুক্ত থাকিত। বিদ্যাদানে তখনকার এক একটী মঠ-ই ভুবন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইয়াছিল। আবার বিপন্ন জনের উদ্ধার কামনায় মঠের যথাসর্ব্বস্ব নিয়োজিত হইত। এখন সেই সকল মঠের অতি ক্ষীণ নিদর্শন স্বরূপ যে কয়েকটী স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত সম্পত্তিশালী মঠ বা দেবোত্তর সম্পত্তি আছে তাহা দ্বারা দেশের ও দশের কি উপকার সাধিত হয়? এখনও সেই সকল মঠের অর্থানুগমের উপায়—সুগমই আছে এবং দেবোত্তর সম্পত্তিও যথেষ্টই আছে। কিন্তু সমাজ বন্ধনের শিথিলতার ফলে ক্রমশঃ উক্ত মঠ ও দেবোত্তর সম্পত্তি সমুদয়— রাজা, প্রজা উভয়েরই সমানাধিকার চ্যুত হইয়াছে। মঠাধীশ মোহান্তগণের উহা (সম্পত্তি), স্ব-সাম্প্রদায়িক সন্ন্যাসী প্রধানগণেরও কোন আধিপত্য নাই। তাঁহাদের কার্য্যের উপর কাহারও কথাটী পর্য্যন্ত কহিবার অধিকার নাই। সদাশয় সরকার বাহাদুর প্রজার অর্থে হস্তক্ষেপ করিবেন না বলিয়া চুপ করিয়া বসিয়া আছেন।
গত ২০ বৎসরের মধ্যে দুইবার দেব-সম্পত্তি ব্যবস্থা বিষয়ক আইনের “বিল” ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভায় পেশ হইয়া তাহা পরিত্যক্ত হয়। দেশের এক শ্রেণীর লোক দুইবারই আপত্তিতে ঘোর “হা, হা, রব” তুলিয়া গগন মণ্ডল বিদীর্ণ করিয়াছিলেন। সরকার ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভা হইতে উক্ত বিল আইনে পরিণত হইলে “ধর্ম্ম যায় যায়” রব(তুলিয়া) ঘোরতর আন্দোলন করিয়া সরকারকে উহা রদ করিতে বাধ্য করেন। ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভায় উহা পরিত্যক্ত হইয়া প্রায় ২০ বৎসর হইয়া গিয়াছে। কৈ ইহার মধ্যে আর সেই আপত্তিকারীগণের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যায় নাই। তাঁহাদের যত ধর্ম্ম, উদ্যম ও অধ্যাবসায় তখন যেন সংবাদপত্র মুখে কেবল একটা জাতীয় সমস্যা সমাধানের সৎসঙ্কল্প—বাধা দিতেই উচ্ছ্বসিত হইয়াছিল। তাঁহাদের ইচ্ছা যে, সরকার তো কিছু করিতে পারিবেনই না— আর তাঁরাও কিছু করিবেন না— উহা যেমন আছে তেমনই থাক।
প্রজার ধর্ম্মে হস্তক্ষেপ করা হয় ভাবিয়া সদাশয়(সরকার)— কিছু না করিয়া দুইবারই খুব সুবিবেচনার পরিচয় দিয়াছেন, কিন্তু যাঁহারা আপত্তি করিয়া উহাতে বাধা দিয়াছিলেন, কি দুঃখের বিষয় যে ঐ সম্বন্ধে তাঁহাদের সুবিবেচনার পরিচয় আমরা এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে কিছু পাইলাম না। তাঁহাদের সকল উদ্যম উহাতে একটা বিষয় বাধা ঘটাইয়াই নিরস্ত হইল। কিন্তু এখন আর কাহারও এই সম্বন্ধে নীরব হইয়া উদাসীন থাকা উচিত হইবে না। সকল দিক্ বজায় রাখিয়া কিসে এই মহা গুরুতর সমস্যার সুসমাধান হয়— তাহার একটী উপায় করিতেই হইবে। দুইবারই সরকার [...] যখন দেবোত্তর সম্পত্তির ব্যবস্থা বিধায়ক আইন হইবার প্রস্তাব হয় ২ বারই “দুর্বোধ্য বিবাদ” হইয়াছিল। বিভিন্ন প্রদেশীয় সুবিজ্ঞ সম্ভ্রান্ত বিচক্ষণ দেশনায়ক প্রতিনিধি মণ্ডলে অধিষ্ঠিত আমাদের প্রতিনিধির চেষ্টায় দেশের খাস্ নিজস্ব দেবোত্তর সম্পত্তির একটা সুব্যবস্থা হইবে আশায় আমি হর্ষিত হইতাম। সরকারী [প্রচেষ্টায়] ‘ধার্ম্মিক’ মোহান্তগণের প্রভাবে পাছে কোন অসুবিধা হইয়া উহাই তাঁহাদের মনোকষ্টের কারণ হয়, ভাবিয়া আমি বিষণ্ণ হইতাম। প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত কতিপয় মহাপ্রাণ মোহান্তের সুমধুর চরিত্র মাহাত্ম্যর কিঞ্চিৎ পরিচয় দিতেছি। এইরূপ সামান্য [...] বৃত্তিভোগী গরীব মোহান্ত আছেন যাঁহারা প্রকৃত সাত্ত্বিকভাবে দেবসেবা করিয়া সাধারণের অজ্ঞাতভাবে অকাতরে কেবল প্রাণ ঢালিয়া বিশ্বমানবের সেবা করিতেই জন্মিয়াছেন।
স্বামী অখণ্ডানন্দের ‘রচনা সংকলন’ থেকে