শান্তনু দত্তগুপ্ত: দারুণ একটা কথা বলেছিলেন কানহাইয়া কুমার... ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চোখে এত দ্রুত জল কীভাবে আসে বুঝতে পারি না। উনি নিশ্চয়ই পকেটে পেঁয়াজ নিয়ে ঘোরেন।’
শান্তনু দত্তগুপ্ত: দারুণ একটা কথা বলেছিলেন কানহাইয়া কুমার... ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চোখে এত দ্রুত জল কীভাবে আসে বুঝতে পারি না। উনি নিশ্চয়ই পকেটে পেঁয়াজ নিয়ে ঘোরেন।’
প্রসঙ্গ ছিল কৃষি আইন। এক বছরের আন্দোলন। এবং তার তীব্রতায় আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হওয়া কেন্দ্রের সরকার। চোখের জল ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কারণ, তিনি এর গুরুত্ব কৃষকদের বোঝাতে পারেননি।
প্রসঙ্গ ছিল সিএএ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। কেউ চায়নি। তবু তিনি এনেছেন। এতে নাকি সংখ্যালঘুদেরই সুবিধা হবে। কীভাবে? সেটাই রহস্য। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদের ঝড়
উঠেছে। আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়েছে। সাধারণ মানুষের সেই ক্ষোভ এবং কিছুটা কোভিডের সৌজন্যে চাপা পড়ে গিয়েছে এমন বিরাট কর্মকাণ্ড। মোদি সরকারের প্রতিনিধিদের চোখে তখনও জল ছিল। কারণ, তাঁরা নাকি এর ইতিবাচক দিকটাও দেশবাসীকে বোঝাতে পারেননি।
চোখের জল পড়েছে পহেলগাঁও হামলার পর। উপত্যকায় বেছে বেছে ভারতীয় পর্যটকদের (একজন নেপালি) খুন করা হয়েছে। মোদিজির জন্য খোল-করতাল বাজানেওয়ালাদের ভাষায় অবশ্য নিহতদের পরিচয় শুধুই ‘হিন্দু’। নাগরিক? ওসব পরের ব্যাপার। তাই সংসদে ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে আলোচনায় যখন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভারতীয়দের নৃশংস মৃত্যুর কথা তুলেছেন, সরকারি আসন থেকে উড়ে এসেছে একটিই শব্দ, ‘হিন্দু...’। অমিত শাহ বলেছেন, পহেলগাঁও হামলায় মায়ের চোখের জল পড়েছে। আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘মায়ের চোখের জলের যন্ত্রণা কী হয়, সেটা আমি বুঝি। সেই যন্ত্রণা আপনাদের থেকে শিখব না...।’
তিনমূর্তি ভবনের বড় হলঘরটায় রাখা ছিল দেহ... রাজীব গান্ধীর। দেহ নয়, দেহাংশ। ২১ মে সোনিয়ার চোখে যে অঝোর ধারা শুরু হয়েছিল, পরের ৪৮ ঘণ্টাতেও থামেনি। লোকজনে ছয়লাপ তিনমূর্তি ভবন। তেরঙ্গায় মোড়ানো শরীরটার সামনে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যাওয়া মানুষের ভিড়। চত্বর জুড়ে গুঞ্জন, আতঙ্ক এবং রাজনীতি। সেই সবটাই দেখেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। তাঁর বয়স তখন ১৯। পরিস্থিতির অভিঘাত অনুযায়ী যথেষ্ট স্টেডি। কারণ তিনি উদ্বিগ্ন মাকে নিয়ে। আগের দু’দিন ধরে শুধু জল, লেবুর রস আর কফি ছাড়া কিছু মুখে দেননি সোনিয়া। একটা দানাও খাওয়ানোর চেষ্টা করলে বমি করে ফেলছেন। ছেলেবেলার সঙ্গী অ্যাস্থমা ফিরে এসেছে। মৃতদেহের ঠিক পিছনের টেবলে রাখা হাসিমুখ ছবিটা
বারবার ফিরিয়ে আনছে আতঙ্ক। যন্ত্রণায় দমবন্ধ হয়ে আসছে। আর এই পুরো দৃশ্যটা লাগাতার হাতুড়ির মতো আঘাত করে চলেছে প্রিয়াঙ্কার মনে। তাই
তিনিই অমিত শাহকে বলতে পারেন, ‘মায়ের চোখের জলের যন্ত্রণা আমি বুঝি...।’
পরিষ্কার বার্তা ছিল প্রিয়াঙ্কার। চোখের জল নিয়েও রাজনীতি চলছে। এবং বাড়ছে। ‘অপারেশন সিন্দুর’ এবং তার পরবর্তী সময়ে গোটা বিরোধী মহল পাশে ছিল মোদি সরকারের। কিন্তু এখন আর নয়। কারণ? উঠে আসা একের পর এক প্রশ্ন এবং চোখের জলের রাজনীতি। হঠাৎ কেন যুদ্ধবিরতি? সীমান্ত এলাকায় এত সাধারণ মানুষের মৃত্যুর দায় কার? অপারেশন সিন্দুর কি সত্যিই হামলা ছিল, নাকি শুধু পাকিস্তানকে বার্তা দেওয়া যে, আমরা মারতে পারি? তাহলে এমন প্রত্যাঘাতের অর্থ কী? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারেন? নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের দাবি, পাকিস্তান নাকি সংঘর্ষ থামানোর ‘ভিক্ষা চেয়েছে’। সরকার সেই ‘অনুনয়’ মেনে নিয়েছে কেন? ১০০ দিন অধরা ছিল পহেলগাঁও হানার জঙ্গিরা। সংসদে আলোচনা শুরুর দিনই তারা নিকেশ হয়ে গেল? আমেরিকা নাকি ভারতের পক্ষে! মোদিজির পরম বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প! তারপরও তিনি সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর পাকিস্তানের হয়ে সওয়াল করছেন কেন? কোন যুক্তিতে পাক সেনাপ্রধানকে নিয়ে এক টেবলে খেতে বসছেন? কীভাবেই বা ভারতকে মৃত অর্থনীতি বলে ঘোষণা করে দিচ্ছেন? নিশ্চিতভাবে গোটা অপারেশনে রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছে বিরোধীরা। এবং অবশ্যই ব্যর্থতার। কেন্দ্র স্বীকার করুক বা না করুক। আর তাই এখন গোটা মোদি ব্রিগেড চলে গিয়েছে চোখের জলে। পহেলগাঁওয়ে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের চোখের জল। বিজেপির হর্তাকর্তাদের মায়েদের চোখের জল। দেশবাসীর চোখের জল। কারণ, এটাই যাকে বলে ‘সেফ এসকেপ’। ভারতীয়রা বড্ড আবেগপ্রবণ। চোখের জল তাদের খুব সহজেই দুর্বল করে দেয়। যদি কোনও ব্যর্থতা থেকেই থাকে, তাহলে মানুষকে ম্যানেজ করার জন্য চোখের জলের থেকে ভালো ওষুধ কিছু হতে পারে না।
গোধরা পরবর্তী সংঘর্ষের জন্য নরেন্দ্র মোদিকে ‘মওত কা সওদাগর’ আখ্যা দিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। সেটা ছিল গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনের আগে। সেই ভোটে বিজেপি বিপুল জয় পেলেও উপাধিটা কিন্তু মোদিজির গায়ে সেঁটে গিয়েছিল। তারপর তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নিজেই নিজের জন্য একের পর এক উপাধি ঠিক করেছেন। কখনও চৌকিদার, কখনও দেশবাসীর পাহারাদার, কখনও আবার ঈশ্বরের বরপুত্র। তারপরও ‘...সওদাগর’ বললে রাজনীতির দরবারে একটাই নাম মাথায় আসে—নরেন্দ্র মোদি। অপারেশন সিন্দুর থিতিয়ে যাওয়ার পর থেকে যা চলছে, তাতে নতুন উপাধি বাজারে এল বলে—চোখের জলের সওদাগর। এই ব্যবসাটা অন্তত মন্দ নয়। রাজনীতি তো নয়ই। সবাই পাকিস্তান আর জঙ্গি নিয়ে চর্চায় ব্যস্ত। কেউ আলোচনা করছে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের, তো কেউ ড্রোন অ্যাটাকের। দেশবাসী আর মূল্যবৃদ্ধির কথা বলে না। বাড়তে থাকা বেকারত্ব নিয়ে স্লোগান দেয় না। ইন্টেনসিভ রিভিশনের নামে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গেলেও তার ঝড় নির্বাচন কমিশনের দরজায় আছড়ে পড়ে না। এটাই তো চায় শাসক! ইস্যু তারা তৈরি করবে। ‘সাধারণ মানুষের প্রয়োজন’ নতুন ভারতে ইস্যু হতে পারে না। পারবে না। গণতন্ত্রের এক নতুন রূপ। তাই তো বাংলাকে তারা ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে দাগিয়ে দিতে পারে। পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নামে চলে লাগাতার অত্যাচার। বছরের পর বছর ভিন রাজ্যে কাজ করে একটু ভিটেমাটি জোগাড় করা বাঙালিরা আতঙ্কে সব ছেড়েছুড়ে ফিরে আসে বাংলায়। এভাবেই তো দলে দলে মানুষ স্বাধীনতার সময় দুই প্রান্তের দুই সীমান্ত ধরে চলে এসেছিল এপারে... প্রাণভয়ে। এভাবেই আজ থেকে পাঁচ দশক আগে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে বাঙালিরা পালিয়ে এসেছিল এপার বাংলায়। আজ তেমনই পরিস্থিতি কি তৈরি হচ্ছে না? সেই বেলা তো চোখের জল পড়ে না গেরুয়া রাজনীতির বোদ্ধাদের! কেন? বাঙালি তাঁদের রাজনীতিকে দাঁত ফোটাতে দেয় না বলে? পাকিস্তান মুর্দাবাদ অস্ত্র এই রাজ্যে চলে না বলে? তাই কি বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা দেখান আপনারা? তারপর তার সাফাইও দেন! একটা সীমা তো থাকা উচিত!
মোদিজি এবং অমিত শাহের জন্য সামান্য দুটো প্রশ্ন আছে—১) গত তিন মাসে কাশ্মীরে কতগুলো জঙ্গি বিরোধী অপারেশন হয়েছে? ২) ৩৭০ অনুচ্ছেদ অবলুপ্তির পর কাশ্মীরে অন্য প্রদেশের কতজন জমি কিনেছেন এবং বাড়ি বানিয়েছেন? প্রথম প্রশ্নের উত্তর হল, অসংখ্য। কয়েকটা নাম শুধু সামনে এসেছে। যেমন, অপারেশন মহাদেব বা অখাল। কিন্তু রোজই উপত্যকায় দু’জন-তিনজন করে জঙ্গি নিকেশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ একটা বিষয় স্পষ্ট, জম্মু-কাশ্মীর সন্ত্রাসমুক্ত হয়নি। ৩৭০ অনুচ্ছেদ অবলুপ্তির পর নয়। অপারেশন সিন্দুরের পরও নয়। নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছিলেন, অপারেশন সিন্দুর পাকিস্তানের কোমর ভেঙে দিয়েছে। জঙ্গি লঞ্চপ্যাড-এয়ার বেস গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে তারপরও জঙ্গি দমন অভিযান কেন কাশ্মীরে? কেন এদেশে নিহত সন্ত্রাসবাদীদের কাছে পাকিস্তানি নথি পাওয়া যাচ্ছে? তার মানে তারা এখনও দেদার অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে! এর দায় কে নেবে? ছেড়ে দিন... পহেলগাঁও হানায় এতগুলো সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হল। অমিত শাহ কি একবারও দেশবাসীর কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়েছেন? বলেছেন কি, ‘আপনাদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। সেই দায় আমার...’? আমাদের পাহারাদার কি বলেছেন এ কথা? অথচ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে উপত্যকার যাবতীয় নিরাপত্তাজনিত দায় কেন্দ্রেরই। বর্ডার অমিত শাহের মন্ত্রকের অধীনে। ওমর আবদুল্লা কিন্তু ক্ষমা চেয়েছেন... কাশ্মীরের সুরক্ষার দায় তাঁর নয়। তাও চেয়েছেন। এখন কিন্তু গেরুয়া বাজনদারদের চোখে জল আসে না! মণিপুর তাঁদের যন্ত্রণা দেয় না। কারণ, ওই চোখের জলে রাজনৈতিক লাভ নেই।
দ্বিতীয় প্রশ্নে আসা যাক। ডাল লেকের ধারে
আপনি কি একটা জমি কিনতে পেরেছেন? ৩৭০ অবলুপ্তির প্রচার কিন্তু তেমনই ছিল। আমরাও কেউ কেউ ভেবেছিলাম, এইবার গুলমার্গে একটা জমি কিনব। তাতে বাড়ি বানাব এবং ছুটি কাটাতে যাব। অবাস্তব স্বপ্ন। ঠিক প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকার মতো।
দিন যায়। প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হয় না। সাধারণ মানুষের চোখে জল আসে। বেঁচে থাকাটা প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে যায় বলে। তাতে অবশ্য সরকারের চোখে জল আসে না। মানুষের কী হল, তাতে আমাদের কিংবদন্তি নেতাদের বয়েই গিয়েছে। তাঁরা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াবেন, ভাষণে রাজা-উজির মারবেন, অন্যান্য রাষ্ট্রনেতাদের কটাক্ষে অপদস্থ হবেন এবং তারপরও অতীতে বাস করবেন। কখনও ইন্দিরা গান্ধী, কখনও আবার জওহরলাল নেহরু। গেরুয়া শিবিরের উচ্চপদস্থ নেতারা ভাষণ দিতে উঠলে তার একটা অংশ এই দুই নেতানেত্রীকে নিয়ে বরাদ্দ থাকবেই। না থাকলে, সেটা খবর। মূল্যবৃদ্ধি? উঁহু, নেহরু। দেশভাগ? হল না, নেহরু চাই। সংসদে অপারেশন সিন্দুর নিয়ে কথা হচ্ছে? সেখানেও নেহরু। একটি ভাষণে ১৪ বার নেহরুর নাম করছেন মোদিজি। কানিমোঝি দিব্যি বলেছেন, ‘আপনারা যতবার নেহরুকে স্মরণ করেন, কংগ্রেসও অতবার করে না।’ আসলে বলার মতো কিছু থাকতে তো হবে! প্রশাসনিক সাফল্য না থাকুক, অন্তত মানবিকতা! এই জমানায় সেটাও যে হ্যালির ধূমকেতু!
রবি ঠাকুর বলে গিয়েছেন, ‘মানুষকে চাহিলে মানুষের সেবা করিতে হয়, পরস্পরের ব্যবধান দূর করিতে হয়, নিজেকে নম্র করিতে হয়। মানুষকে যদি চাই তবে যথার্থভাবে মানুষের সাধনা করিতে হইবে; তাহাকে কোনমতে আমার মতে ভিড়াইবার, আমার দলে টানিবার জন্য টানাটানি মারামারি না করিয়া আমাকে তাহার কাছে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে।’ মোদিজি, কথাগুলো বাংলায় লেখা। বাংলাদেশি ভাষায় নয়। এবং আপনাদের জন্য মোক্ষম। কারণ, আত্মসমর্পণ আপনারা মানুষের কাছে করেন না... নতজানু হন বিদেশি শক্তির কাছে। ক্ষমতার সামনে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য। এটা আপনাদের কাছে খুব একটা বড় না হতে পারে, দেশের মানুষের কাছে কিন্তু লজ্জার। আপনাদের কী মনে হয়, এই লজ্জা দেশবাসী কতদিন সহ্য করতে পারে? সহজ প্রশ্ন, আর উত্তরটাও জানা... বিকল্প সামনে আসা পর্যন্ত।