শান্তনু দত্তগুপ্ত: সুবলকে দুপুর একটা নাগাদ সাইকেলে চেপে ঘুরতে দেখেই ধরলেন পাড়ার অমিয়কাকু—‘কী রে! স্কুল যাসনি কেন?’
শান্তনু দত্তগুপ্ত: সুবলকে দুপুর একটা নাগাদ সাইকেলে চেপে ঘুরতে দেখেই ধরলেন পাড়ার অমিয়কাকু—‘কী রে! স্কুল যাসনি কেন?’
—গিয়েছিলাম তো। ছুটি হয়ে গিয়েছে।
—তোদের স্কুল চারটেয় ছুটি না?
—হ্যাঁ কাকু। কিন্তু আজ তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দিয়েছে। অনেকদিনই এমন হয়।
অবাক হলেন অমিয়বাবু। সুবল যে স্কুলে পড়ে, তিনি নিজেও সেখানে পড়েছিলেন। এমন তো কখনও হতো না! মাঝেমাঝেই তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দেয় মানেটা কী? দু’দিনের মাথায় আবার দেখা হল তাঁর সুবলের সঙ্গে। তখন সাড়ে এগারোটা।
—অ্যাই, আজ কি এগারোটায় ছুটি দিয়ে দিয়েছে নাকি?
—না কাকু। আজ আমি যাইনি। বাবা বলল, যেতে হবে না। কাল বাড়িতে পুজো আছে। দোকানপাট সেরে আন। আমি তাই লিস্ট নিয়ে বেরিয়েছি।
অমিয়বাবুর ছেলেবেলার বন্ধু বিমল। সুবলের বাবা। পাড়াতেই ওর একটা খাতা-পেন্সিলের দোকান আছে। সোজা সেখানে পৌঁছে গেলেন তিনি।
কোনও ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ
রে, ছেলেটাকে কি বখিয়ে দিবি নাকি? স্কুলে পাঠাস
না কেন?’
—স্কুলে পাঠিয়ে কী করব বল? ৪টের সময় স্কুল ছুটি হওয়ার কথা। মাঝে মাঝেই সাড়ে ১২টা-১টার সময় ছেলেদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। ৪০ মিনিটের ক্লাস। স্যার আসে ২০ মিনিট পর। ১০ মিনিট ফোন ঘাঁটে। তারপর ১০ মিনিট বইয়ের একটা চ্যাপ্টার খুলে পড়তে বলে। এই তো পড়া! অথচ প্রাইমারিতে কত ভালোই না ছিল। ক্লাস এইট হয়ে গেল ছেলেটার। বোর্ডের পরীক্ষা আসছে, কী যে হবে জানি না।
আপনার পরিচিত কোনও স্কুলের কথা মনে পড়ছে? এমন কিন্তু বেশ কিছু স্কুল আছে। আপনার নাগালের মধ্যেই। এটাই এখন পড়াশোনার বাস্তব। অন্তত সাধারণের জন্য তো বটেই। সরকার চেষ্টা কিন্তু কম করছে না! রাজ্য হোক বা কেন্দ্র। রাজ্য সরকার ফ্রিতে সাইকেল দিচ্ছে। মেয়েদের পড়ানোর জন্য কন্যাশ্রীর টাকাও। সঙ্গে মিড ডে মিল তো আছেই। যাতে দারিদ্র্যের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলমুখো হয়। কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে এসেছে। প্রচার চলছে জোরকদমে। ভাবটা এমন, প্রত্যেক ঘর থেকে আইনস্টাইন না বেরলেও একজন করে আব্দুল কালাম নিশ্চিত। সত্যিই কি তাই? সাম্প্রতিক একটা রিপোর্ট কিন্তু স্বাক্ষরতা বা শিক্ষাবিপ্লবের যাবতীয় গরিমার দফারফা করে রেখে দিয়েছে। আর সেটা হল, নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় ইনিংসেই স্কুলে ড্রপ আউটের সংখ্যা ১ কোটি! ২০২২-২৩ থেকে ২০২৩-২৪—এই এক বছরে সংখ্যাটা ৩৭ লক্ষেরও বেশি। অথচ, এই পর্বেই মোদি সরকার বাজারে এনেছে নয়া শিক্ষানীতি। ছেলেমেয়েদের স্রেফ পড়ুয়া নয়, দক্ষ করে তুলতে হবে... এই স্লোগান শোনা গিয়েছে দেশের তাবৎ নেতামন্ত্রীর মুখে। তারপরও স্কুলছুট বাড়ছে কেন? নতুন প্রজন্ম কি তাহলে দক্ষ হয়ে উঠতে চায় না?
আসলে এই গোটা প্রক্রিয়াটায় তিনটে প্রয়োজনীয় বিষয় আমরা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি। ১) কোভিড। কারণ এই মহামারীর সৌজন্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষ হয় প্রাণ হারিয়েছেন, না হয় কাজ। সাধারণের হাতে টাকার জোগান চাই... এতটুকু আর্তিই বারবার সরকারের দরজায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে। বেসরকারি একটা হিসেব বলছে, লকডাউনের পর সাড়ে সাত কোটি শিশু পড়াশোনার ন্যূনতম পরিকাঠামা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। সবাই হয়তো স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে নেয়নি বা ফি না দেওয়ার জন্য তাদের নাম কেটে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় বই-খাতা, টিউশন, লকডাউনে অনলাইন ক্লাসের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট কানেকশন—দরকারটুকু মেটাতে পারেনি তাদের বাবা-মা। কোমর বেঁধে নেমেছেন তাঁরা। আয়ের উপায় খুঁজেছেন। তাতে কিছু ছেলেমেয়ে তাদের প্রয়োজনগুলো ফিরে পেয়েছে। সবাই কিন্তু নয়। এই এক কোটি ড্রপ আউটের হিসেবে এনরোলমেন্ট বা নথিভুক্তিকে দেখানো হয়েছে। কত ছেলেমেয়ে পড়াশোনার জগৎ থেকে নিছক হারিয়ে গিয়েছে, কতজন বেসরকারি স্কুল ছেড়ে অবৈতনিক সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তার অঙ্ক কষা হয়নি। ২) ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় ডিজিটাল পড়াশোনা। সেই পরিকাঠামো কি এদেশের সব গ্রামে-প্রান্তরে রয়েছে? সর্বত্র ফোর-জি বা ফাইভ-জি কানেকশন পাওয়া যায়? তাহলে স্মার্ট বোর্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষা, কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে পড়াশোনাকে ‘সর্বজনীন’ করে তোলার যে লক্ষ্যমাত্রা নয়া শিক্ষানীতিতে নেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবতা কোথায়? ৩) পড়াশোনার বহর বাড়াতে গিয়ে বা তার মাধ্যমে বাহবা কুড়াতে গিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মনস্তত্ত্ব বিচার হচ্ছে কি? নতুন প্রজন্মের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্টের কথা বলে নয়া শিক্ষানীতি। কেমন সেই কারিগরি শিক্ষা? কাঠের কাজ, চাষবাস, কিংবা কোডিং। প্রথম দু’টির সঙ্গে তৃতীয়টির মহাকাশ এবং পাতালের তফাৎ। সরকারি স্কুলে হয় পরিকাঠামো নেই, আর থাকলেও এইসব শেখানোর মতো দক্ষ শিক্ষকের অভাব। মেনে নেওয়া যাক, সরকার প্রত্যেক রাজ্যকে সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো তৈরির জন্য তেড়েফুঁড়ে টাকা বরাদ্দ করা শুরু করেছিল। কিন্তু কতগুলো রাজ্যের ক’টা স্কুল সেই টাকা পেয়েছে? গত মাসে বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তার মধ্যে একটা বড় অংশ যাবে দেশের সব সেকেন্ডারি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ দিতে এবং অটল টিঙ্কারিং ল্যাব বা স্কুল পড়ুয়াদের নয়া ভাবনাচিন্তাকে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাগার গড়ে তুলতে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, স্কুলগুলিতে ইন্টারনেট পরিষেবার জন্য টাকা দেওয়া হবে তিন বছর ধরে। আর ল্যাবের জন্য পাঁচ বছর। সেটাই একলপ্তে দেখানো হয়েছে। অঙ্কটা যাতে বড় দেখায়। পাঁচটা বছর কিন্তু নেহাৎ কম সময় নয়! পাঁচ বছরে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় রূপদান হয়, কর্পোরেট বন্ধুদের প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব হয়, আবার সরকারও পড়ে যায়। কিন্তু ভেবে দেখা হয় না, ভারতের কোটি কোটি ছেলেমেয়ে আদৌ এতে উপকৃত হচ্ছে কি? তারা প্রত্যেকে এই স্কিল ডেভেলপমেন্টই চাইছে তো? নাকি কারও কারও কাছে এই ‘সিলেবাস’ চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া কিছু নয়? ছোট্ট কাঁধে বড় বোঝা। যার কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে উৎসাহ আছে, সে অবশ্যই সিলেবাসের কোডিং ভালোবাসবে। ক্লাস সিক্স থেকে কিউবেসিক বা এইচটিএমএল এবং ক্লাস সেভেন থেকে জাভা পড়ানো হলে তারই লাভ। কিন্তু যার কম্পিউটার বা অঙ্ক ভালোলাগে না? যে সাহিত্য নিয়ে পড়তে চায়? বা যে গিটার ভালোবাসে কিংবা ফুটবল? তাদের জন্য কী আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়?
মনে রাখতে হবে এই পুরো অঙ্কটাই কিন্তু সরকারি স্কুলগুলোকে সামনে রেখে কষা। কারণ, সেখানেই দেশের সিংহভাগ ছেলেমেয়ে পড়তে যায়। বেসরকারি স্কুল হেলায় তাদের সিলেবাসে কোডিং জুড়ে দিতে পারে। অথবা গিটার-সিন্থেসাইজারের ক্লাস রাখতে পারে। তার পুরো পয়সাটাই স্কুলগুলো কিন্তু পড়ুয়াদের ফি’র সঙ্গে যোগ করে দেবে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বাবা-মায়েরা আবিষ্কার করবেন, এবারের স্কুল ফি একলাফে ২০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। তার মধ্যে আছে কম্পিউটার ল্যাব এবং স্টেম এডুকেশন। এটাও নয়া শিক্ষানীতির দান। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে বসেই রোবট বানাবে। হাতেকলমে নানা কিছু শিখবে। কিন্তু বাড়ি ফিরে আসার পর সেটা কতটা তারা মনে রাখতে পারবে, সেই হিসেব কষার দরকার নেই কি? বহু সরকারি স্কুলে পরিকাঠামো থাকছে না, আর অধিকাংশ বেসরকারি স্কুলে প্রতিদিন পড়ার চাপ বাড়ছে। সরকারি স্কুল মিড ডে মিল দিচ্ছে। কেন? উপার্জনের তাড়নায় যাতে স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়ে না যায়। তারপরও প্রাথমিকে প্রত্যেক পড়ুয়ার মাথাপিছু মিড ডে মিলের খরচ ৬ টাকা ১৯ পয়সা, আর উচ্চ প্রাথমিক স্তরে ৯ টাকা ২৯ পয়সা। এই টাকায় কী খাবার হয়? নীতি নির্ধারকদের বোধহয় বাজার করতে হয় না! তাই তারপরও তাঁরা বলেন, মিড ডে মিলে তেলের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমাতে হবে। কারণ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নাকি মোটা হয়ে যাচ্ছে। তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভীষণ উদ্বিগ্ন। ৬ টাকার খাবারে কতটা তেল পড়তে পারে মোদিজি? সাধারণ ঘর থেকে উঠে এসেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আশা করি এটা তিনি বুঝবেন। আর নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন যে, এতকিছুর পরও স্কুলছুট ছেলেমেয়েদের সংখ্যা এক কোটি। তারপরও হারিয়ে যাচ্ছে কৈশোর। বিশেষত বেসরকারি স্কুল পড়ুয়াদের। কারণ, তাদের খেলার সাথী নেই, বন্ধু নেই, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মতো সময়টুকুও নেই। আছে বলতে শুধু পড়া, আর পরীক্ষা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অধুনা শিক্ষকদের একাংশের ভাঙা রেকর্ড—‘বাড়িতে পড়ে নেবে’। এমনই দক্ষ তাঁরা! তাঁদের কারও কারও বাংলা পড়ানোয় ‘পর্যাপ্ত’ এবং ‘উপযুক্ত’ শব্দের মানে এক হয়ে যাচ্ছে। হিট (HIT) শব্দের পাস্ট ফর্ম হিটেডও হচ্ছে। এই কি শিখবে আগামী প্রজন্ম? তাদের যে ছুটতে হচ্ছে নম্বরের পিছনে! ৯০ শতাংশ নম্বর আনতে হবে। ৯৫ শতাংশ না পেলে কোথাও সুযোগ পাওয়া যাবে না। এই পরিস্থিতিও তো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই তৈরি করেছে! যারা পড়তে চায় না, তাদের বিপুল অঙ্ক ডোনেশন দিয়ে ভর্তি করা হচ্ছে। আর যাদের সত্যিই সম্ভাবনা রয়েছে, তারা এক-দু’নম্বরের জন্য মেধা তালিকায় নাম তোলার সুযোগ পাচ্ছে না।
মনে পড়ছে একটি বিজ্ঞাপনের কথা। শো-রুমে জামাকাপড় কিনতে গিয়ে ক্রেতারা আবিষ্কার করছেন, শুধু কালো রঙের টি-শার্ট বিক্রি হচ্ছে। তাও একই সাইজের। তাঁরা বিরক্ত হচ্ছেন। ডেকে পাঠাচ্ছেন ম্যানেজারকে। তখন হাজির হচ্ছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। তারা বলছে, আপনারা সামান্য জামাকাপড় কিনতে এসে অপশন না পেয়েই রেগে যাচ্ছেন। তাহলে আমাদের কথা ভাবুন তো? আমাদের উপর যখন একটা অপছন্দের কেরিয়ার চাপিয়ে দেওয়া হয়, আমরা কি সেটা বয়ে নিয়ে যেতে পারি? আমাদের ভালোলাগার কি কোনও দাম নেই? সবাইকে কি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে?
আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধুই চাপিয়ে চলেছে ছেলেমেয়েদের উপর। বোঝার পর বোঝা। পরীক্ষা পে চর্চা চলছে। কিন্তু তাদের মন কি বাত কেউ শুনছে না। কোনও এক মহাপুরুষ বলেছিলেন, বেটা মুখস্থ কোরো না। দক্ষতা বাড়াও। এই দুনিয়া তোমার পিছনে দৌড়বে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরই ইঁদুর দৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে। পরিকাঠামো নেই, ‘দক্ষ শিক্ষকরা’ স্কুলের বদলে মন দিচ্ছেন প্রাইভেট টিউশনে, আর ছেলেমেয়েরা ডুবে যাচ্ছে ফোনের আসক্তিতে। এর থেকে মুক্তি চাই। এখনই। কোটি কোটি ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার আগে। তার জন্য বাস্তবের মাটিতে হাঁটতে হবে আমাদের নীতি নির্ধারকদের। মনে পড়ে, গুপী সেই যে গেয়েছিল, একবার ত্যাজিয়ে সোনার গদি, রাজা মাঠে নেমে যদি হাওয়া খায়...।
তবেই যে শান্তি পাবে নতুন প্রজন্ম।