Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীর জীবনাদর্শ

দেবদেবী সম্পর্কে যখনই আমরা কোনো আলোচনা করে থাকি, তখন সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে ‘এই দেবী’ হলেন ‘এই অমুক দেবতার শক্তিবিশেষ’—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, স্ত্রীরূপী শক্তি এবং পুরুষরূপী শিব—দু-জনের স্বরূপ ভিন্ন। তন্ত্র ও ভাগবতে [এই] শক্তি এবং শক্তিমান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীর জীবনাদর্শ
  • ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেবদেবী সম্পর্কে যখনই আমরা কোনো আলোচনা করে থাকি, তখন সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে ‘এই দেবী’ হলেন ‘এই অমুক দেবতার শক্তিবিশেষ’—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, স্ত্রীরূপী শক্তি এবং পুরুষরূপী শিব—দু-জনের স্বরূপ ভিন্ন। তন্ত্র ও ভাগবতে [এই] শক্তি এবং শক্তিমান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। অদ্বৈতবাদীরা শক্তি এবং শক্তিমান বা ব্রহ্মের মধ্যে কোনো ভেদ করে না, কারণ তারা মনে করে মূলত ব্রহ্ম অদ্বয় এবং সেই কারণে সমস্তরকম ভেদই তারা অগ্রাহ্য করে। কিন্তু বেদান্তেও শক্তির উল্লেখ আছে। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে ‘মায়া’। মায়াকে মূলাবিদ্যাও বলা হয়। এই মায়া এমনই একটি শক্তি যা ব্রহ্মের স্বরূপকে আবৃত করে ‘অধ্যাস’ বা আরোপের দ্বারা জগৎ সৃষ্টি করে, যে-জগৎ বাস্তবে মিথ্যা। বেদ বলছেন, পরমেশ্বর মায়াবশত বহুরূপে অনুভূত হন। ভাগবত এবং তন্ত্রে বলা হয়েছে, যে-শক্তিবলে পরমেশ্বর জগতে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় ঘটাচ্ছেন তা আসলে ‘ভগবতী শক্তি’। শ্রীরামকৃষ্ণ শিব ও শক্তির অভেদত্ব সম্পর্কে বলেছেন: ‘‘বেদান্তবাদী ব্রহ্মজ্ঞানীরা বলে সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়, জীব, জগৎ-এসব শক্তির খেলা। বিচার করতে গেলে, এসব স্বপ্নবৎ; ব্রহ্মাই বস্তু আর সব অবস্তু, শক্তিও স্বপ্নবৎ, অবস্তু। কিন্তু হাজার বিচার কর... শক্তির এলাকা ছাড়িয়ে যাবার জো নাই।... তাই ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ। এককে মানলেই আর-একটিকে মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকাশক্তি।” 

Advertisement

শ্রীমা সারদাদেবী এবং শ্রীরামকৃষ্ণ দুটি আলাদা সত্তা নন, বরং তাঁরা এক ও অভিন্ন। ভাবাবিষ্ট অবস্থায় সীতাকে দর্শন করে ঠাকুরের অনুভব হয়েছিল সীতা যেন ‘রামময়জীবিতা’ অর্থাৎ ‘রামচিন্তা করে উন্মাদিনী’। তিনি বলছেন: ‘‘আমি সীতামূর্তি দর্শন করেছিলাম। দেখলাম সব মনটা রামেতেই রয়েছে।... হাত, পা, বসন-ভূষণ কিছুতেই দৃষ্টি নাই। যেন জীবনটা রামময়-রাম না থাকলে, রামকে না পেলে, প্রাণে বাঁচবে না!” ঠিক একইভাবে আমাদের শ্রীমা ছিলেন ‘রামকৃষ্ণময়-জীবিতা’ যাঁর জীবনটা সম্পূর্ণভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবনায় নিমজ্জিত। স্বামী অভেদানন্দ শ্রীমা সম্পর্কে বলেছেন, তিনি (শ্রীমা) ছিলেন রামকৃষ্ণগতপ্রাণা, রামকৃষ্ণনাম-শ্রবণপ্রিয়া এবং শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবরঞ্জিতাকারা। আসলে অন্তরে তিনি ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণবিভাসিতা।
সরলতার সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সহাবস্থান শ্রীমা-র জীবনের এক অন্যতম বিশেষত্ব। সংসারে থেকেও এই সুগভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানকে কীভাবে জীবনে প্রতিফলিত করে জীবনকে অর্থপূর্ণ করা যায় এই বিষয়ে নিজের দৈনন্দিন জীবনকে সামনে রেখে অন্যদের সঠিক পথে পরিচালিত করার স্বাভাবিক প্রবণতা তাঁর ছিল। মায়ের কাছে কেউ পর ছিল না। সকলেই ছিল তাঁর কাছে আপন সে তারা যেমনই হোক না কেন। কাউকে ভালবাসতে গিয়ে তিনি কখনো তার গুণাগুণ বিচার করেননি।
স্বামী কৃষ্ণনাথানন্দ সম্পাদিত ‘মাতৃসুধার ত্রিধারা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ