Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আম আদমি’র প্রাণ ও অস্তিত্বের মূল্য শূন্য

বিমানের টিকিট কাটার পর ওয়েব চেক ইন হয়ে গেলে বোর্ডিং পাস ইস্যু করা হয়। অথবা টিকিট নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করে চেক ইন কাউন্টারে গেলে বোর্ডিং পাস দেওয়া নিয়ম।

আম আদমি’র প্রাণ ও অস্তিত্বের মূল্য শূন্য
  • ২০ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: বিমানের টিকিট কাটার পর ওয়েব চেক ইন হয়ে গেলে বোর্ডিং পাস ইস্যু করা হয়। অথবা টিকিট নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করে চেক ইন কাউন্টারে গেলে বোর্ডিং পাস দেওয়া নিয়ম। সেই বোর্ডিং পাসে যাত্রীরা সর্বাগ্রে দেখে নেয় দুটি তথ্য। বোর্ডিং টাইম কটায় এবং কত নম্বর গেট। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন বিমানবন্দরে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় সময় অতিক্রম করে গিয়েছে, অথচ বোর্ডিং শুরু হচ্ছে না। কেন? বোর্ডিং গেটের সামনে থাকা ডেস্কে বসা এয়ারলাইন্স কর্মীদের প্রশ্ন করা হলে, তারা বলে, ফ্লাইট এখনও আসেনি। অর্থাৎ যে ফ্লাইট নতুন গন্তব্যে যাবে, সেটি এখনও কোনও একটি স্থান থেকে এসে ল্যান্ডই করেনি। দিল্লি থেকে হয়তো এই ফ্লাইট যাবে কলকাতা। যাত্রীরা অপেক্ষা করছে। সময় পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ওই বিমান আসছে হায়দরাবাদ থেকে। অর্থাৎ হায়দরাবাদ থেকে এসেই ওই ফ্লাইট আবার যাবে কলকাতায়। যথারীতি বেশ কিছুটা দেরি করে সেই ফ্লাইট ল্যান্ড করল। এবং তড়িঘড়ি আবার পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল। সময় যাতে নষ্ট না হয় কিংবা যাত্রীদের মধ্যে বিক্ষোভ সৃষ্টি না হয়, সেটি সুনিশ্চিত করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেই ফ্লাইট রেডি হয়ে গেল। এই মাত্র কিছুক্ষণ সময়ের মধ্যে সমস্তরকম পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়া সম্ভব? ওই ফ্লাইটের ইঞ্জিন, পাওয়ার, ফ্ল্যাপ, অয়েল সাপ্লাই, ল্যা঩ন্ডিং গিয়ার সব নিখুঁত কি না সেটা কি তড়িঘড়ি যাচাই করে ফেলা সর্বদা সম্ভব? এই যে প্রবণতা, এটা বছরের পর বছর ধরে চলছে। শেষ মুহূর্তে অন্য কোনও স্থান থেকে একটি ফ্লাইট আসছে। তারপর সেটিই আবার দ্রুত আর একটি রুটে উড়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতায় সবথেকে বেশি আপস কীসের সঙ্গে করতে হচ্ছে? সুরক্ষা। এটা সরকার জানে না? এয়ারপোর্ট অথরিটি জানে না? ডিরেক্টর জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন জানে না? আমেদাবাদে ক্র্যাশ হওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার ওই অভিশপ্ত বিমান আন্তর্জাতিক উড়ানে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগে এভাবেই বিভিন্ন উড়ান সে সমাপ্ত করেছে। এই দুর্ঘটনা তো যে কোনও সময় হওয়ার আশঙ্কা।  কারণ এই চরম উদাসীনতা। ২৪১ জন যাত্রীর মৃত্যু থেকে প্রমাণিত যে সরকার যাত্রীদের প্রাণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূল্যবান হিসেবে মনে করে না। অথচ ধরা যাক ভারতের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা কোনও বিমানে চেপে কোথাও যাচ্ছেন। তাঁদের বিমানের ক্ষেত্রে এরকম শিথিল মনোভাব কি দেখা যায়? যায় না। বহুবার পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ তাঁদের প্রাণের গুরুত্ব অনেক বেশি। যারা ভোট দেয়, ট্যাক্স দেয় তাদের প্রাণ অতটা প্রয়োজনীয় নয়। সুতরাং আজও কি রাতারাতি সব বিমানবন্দরে বিমানের সুরক্ষা নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি সতর্কতা দেখা যাচ্ছে? তা বোধহয় দেখা যাবে না। সাধারণ মানুষ হল ক্যাটল ক্লাস। তাদের জীবন নিয়ে বেশি ভাবলে চলে না। 

Advertisement

মুম্বই কিংবা হাওড়া শিয়ালদহের লোকাল ট্রেনে যে অফিস আওয়ার্সে মানুষ ঝুলে ঝুলে যায়, কামরায় পা রাখার জায়গা থাকে না, প্রাণ হাতে করে শেষ মুহূর্তে একটু জায়গা করে নেওয়ার জন্য ফুটবোর্ডে চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে ওঠে এটা রেলমন্ত্রক জানে না? তাহলে মুম্বইতে কিছুদিন আগে ভিড়ে কামরার বাইরে কোনওমতে ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া যাত্রীদের কয়েকজন পড়ে গিয়ে প্রাণ হারানো পর্যন্ত রেল কিছু করেনি কেন? করেনি, কারণ রেলের কর্তারা, মন্ত্রীরা, সরকারের কোনও পদস্থ আধিকারিক কিংবা রাজনীতির মানুষেরা তো ঝুলে ঝুলে লোকাল ট্রেনে যায় না! যায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। মুম্বইয়ের ওই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রেলমন্ত্রক ঘোষণা করেছে লোকাল ট্রেনের কামরায় দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। যাতে কেউ ঝুলতে না পারে। অর্থাৎ যতক্ষণ না যাত্রীদের মৃত্যু হল ঝুলন্ত অবস্থায় ট্রেনে থেকে পড়ে গিয়ে, ততক্ষণ পর্যন্ত রেলের একবারও মনে হল না যে, কিছু একটা করা দরকার। রেলমন্ত্রী কিংবা রেলমন্ত্রকের আধিকারিকরা যখন ট্রেন সফর করেন, তখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আরামদায়ক ব্যবস্থা দেওয়া হয় তাঁদের। কারণ তাঁরা ভারতের কাছে বেশি প্রয়োজনীয়। যারা ভোট দেয়, ট্যাক্স দেয়, সেইসব সাধারণ মানুষদের জীবনের সেরকম দাম নেই। ৫০ বছর ধরে লোকাল ট্রেনের কামরায় টিকিট কাটা যাত্রীরা ঝুলেই ঝুলেই যাতায়াত করছে। কোনও সরকারের কোনওদিন স্থায়ী সমাধানের কথা মনেই আসেনি। এবারও কিছু হবে না। বহু নিউজের ভিড়ে আবার এসব হারিয়ে যাবে। 
কুম্ভমেলায় এবার ৪০ কোটি মানুষ যাবে? যা সর্বকালীন রেকর্ড হবে। এটাই নাকি সাফল্য! এই প্রচার করে করে উত্তরপ্রদেশ এবং কেন্দ্রীয় সরকার কুম্ভমেলাকে নিয়ে এমন হাই ভোল্টেজ প্রচার করে গিয়েছে এক বছর ধরে যে, মনে হচ্ছিল আজ পর্যন্ত পূর্ণকুম্ভ যেন আগে কখনও হয়নি। অথচ নিজেরাই যখন বলছে ৪০ কোটি মানুষ হবে, সেই নিজেরাই ভিড় নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা রাখেনি। যত্রতত্র সঙ্গমে যাওয়ার পথ আটকে দিয়ে কৃত্রিম ভিড় করার ব্যবস্থা হয়েছে। আর নিরক্ষর, নিরীহ, ধর্মভীরু, বাসে ট্রেনে পদব্রজে যাতায়াত করা আম জনতা, রেশনের চালগমের লাইনে দাঁড়ানো গরিব জনতা, ভোট দেওয়া মধ্যবিত্ত, পুলিসকে ভয় পাওয়া সাধারণ ভারতবাসী, সরকারের সব কথা মেনে চলা অনুগত দেশবাসী পুলিস প্রশাসনের চরম গাফিলতির কারণে কুম্ভমেলায় পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। যে ফাঁকা পথ আটকে রাখা হয়েছিল, সেটা ছিল ভিআইপিদের জন্য নির্ধারিত। কুম্ভমেলায় কতজনের মৃত্যু হয়েছিল? কেউ জানে না। সম্প্রতি বিবিসি একটি অন্তর্তদন্ত করে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে অন্তত ৮২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অথচ সরকারি হিসেব হল ৩৭। কীভাবে জানা গেল আসলে প্রায় তিন গুণ বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে? তদন্তে জানা গিয়েছে, এরকম বহু মানুষের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, অথচ মৃতের নাম সরকারিভাবে জানানো হয়নি। অর্থাৎ সরকারের কাছে সাধারণ ভারতবাসীর প্রাণের আর্থিক মূল্য আছে, অস্তিত্বের মূল্যই নেই। 
২০২১ সালে সরকার জানিয়েছিল কোভিডে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে ৩ লক্ষ। চার বছর পর সেই সরকারেরই জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত পরিসংখ্যান রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ভারতে ২০ লক্ষ বেশি মৃত্যু হয়েছে। যার আসল কারণ কোভিড। অর্থাৎ কোভিডকালে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কম করে দেখানো হয়েছিল। সুতরাং ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড আছে। অথচ মৃত্যুর কারণ দর্শানো হয়নি। এই হল ভোট দেওয়া, ট্যাক্স দেওয়া নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের মনোভাব। 
পাঁচ বছর ধরে সেন্সাস হয়নি। সবেমাত্র বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৭ সালের আগে জনগণনা হবে না।  এর প্রকৃত অর্থ কী? অর্থ হল, ৭ বছর ধরে একটি দেশ জানেই না তার জনসংখ্যা কত। ভোট আসছে। ভোট যাচ্ছে। বাজেট আসছে। বাজেট যাচ্ছে। প্রকল্প আসছে। প্রকল্প যাচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস আসছে। স্বাধীনতা দিবস যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তথ্যই নেই যে, তার মোট দেশবাসীর সংখ্যা কত। পৃথিবীর মধ্যে এই ২০২৫ সালে কোন কোন দেশের সেন্সাস রিপোর্ট নেই? ২৪৪টি দেশের মধ্যে ৩৩টি দেশের কাছে সেন্সাস তথ্য নেই। অর্থাৎ নিজেদের দেশের জনসংখ্যা যারা জানে না। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারা? আফগানিস্তান, লেবানন, সিরিয়া, ইউক্রেন, কঙ্গো, শ্রীলঙ্কা, নাইজেরিয়া এবং ভারত! 
 ভারত সরকার জানে দেশে ৯৭ কোটি 
ভোটার আছে। ১১ কোটি ট্যাক্সদাতা আছে। এই দুটোই তো আসল!  সুতরাং, কতজন মানুষ আছে জানার দরকার পড়েনি! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ