সন্দীপন বিশ্বাস: মূর্খদের একটা বা দুটো ভুল ক্ষমা করে দেওয়া যায়। কেননা ভুল মানুষ মাত্রেই হয়। কিন্তু ভুলটা যখন বারবার ঘটতে থাকে, তখন বোঝা যায়, ভুলটা একেবারে ইচ্ছাকৃত এবং এই ভুলের পিছনে তার কোনও দুরভিসন্ধি রয়েছে। ‘কাশ্মীর ফাইলস’ বা ‘ছাবা’ বা ‘কেশরী চ্যাপটার টু’ ফিল্মগুলি দেখলেই আমরা বুঝতে পারি, সেখানে পরিবেশিত ভুল তথ্যগুলি শুধু অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে না, বরং আরও উৎকটভাবে মানুষকে ভুল তথ্যগুলি গেলানোর চেষ্টা করা হয়। শুধু সিনেমায় নয়, ভুল ইতিহাস শেখানোর চেষ্টা চলছে সার্বিক ক্ষেত্রে। এই চেষ্টা করা হচ্ছে গত এগারো-বারো বছর ধরে। অর্থাৎ মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, মানসিকতা সবকিছুকে গেরুয়াকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর সময়! মানুষকে বিচ্যুত করার চেষ্টা চলছে সত্যের পথ থেকে। এই মানসিকতা সর্বস্তরে সমালোচনার যোগ্য। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার স্বার্থে, অতীতের বহু কলঙ্ককে চাপা দেওয়ার স্বার্থে নিরন্তর ভুল ইতিহাস প্রকাশ করা হচ্ছে। ভারতের ইতিহাসকে সোশ্যাল মিডিয়ার ফেক নিউজের পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। মুসলিম, মুঘল কিংবা ইংরেজ শাসনের প্রায় আটশো বছরে হিন্দুত্ব খতরেমে ছিল না কখনওই। কিন্তু দেখা গেল গত বারো-তেরো বছরে হিন্দুত্ব খতরেমে চলে গেল। শুধু মিথ্যা প্রচারেই দেখা যাচ্ছে, দেশের ৮০ শতাংশ হিন্দু নাকি ১৫ শতাংশ মুসলিমের ভয়ে কুঁকড়ে আছে। আপনাকে অবিরত এই ভয়টা দেখাতে থাকলে আপনি একদিন ভয় পেতে বাধ্য। আপনার কানের কাছে সবসময় মিথ্যা ইতিহাস আউড়ে গেলে একদিন আপনি সেটাকেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন। এটাকেই ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে সত্যজিৎ রায় বলেছেন, মস্তিষ্ক প্রক্ষালন বা মগজ ধোলাই। মাথা যদি দাস হয়, শরীর তখন হীরক রাজার পদতলে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য।
আসলে ইতিহাসের একটা পর্যায়ে সঙ্ঘ পরিবারের কিছু ভুল ভ্রান্তি ঘটেছিল। সেই কালিমালিপ্ত অধ্যায় মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। সেই ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের তাগিদ তাদের রয়েছে। ইংরেজ আমলে সঙ্ঘ পরিবারের ভাবমূর্তিকে আর একটু ধোপদুরস্ত করার চেষ্টা চলছে। যেখানে গারদ থেকে মুক্তির জন্য কেউ ইংরেজকে ‘আমার প্রভু’ বলে মেনে নেন, বারবার মুচলেকা দিয়ে বলেন, যে কোনওভাবে আমি ব্রিটিশদের সাহায্য করতে প্রস্তুত— সেই ইতিহাসকে তো মোছার চেষ্টা করতেই হবে। কিংবা বুলবুলি পাখির পিঠে চড়ে একজন বিপ্লবীর আন্দামান সেলুলার জেল থেকে উড়ে নিজের জন্মভূমিতে আসা এবং চলে যাওয়ার অলৌকিকত্ব আরোপ করে যখন কাউকে বিশাল করে তোলার চেষ্টা হয়, তখন বোঝা যায়, সেই ইতিহাসের মধ্যে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। এসব গাল গপ্পো অন্য প্রদেশের অন্ধ ভক্তরা মানলেও বাঙালি কখনওই মানবে না। তার কারণ এই নয় যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাভারকরের অবদান বাঙালি স্বীকার করে না। আসলে যুক্তিবাদী বাঙালিকে সহজে পিটুলিগোলা খাওয়ানো সম্ভব নয়। তার অস্মিতা মিথ্যার সামনে মাথা নত করে না। তার মধ্যে ইতিহাসনিষ্ঠতার বীজ রয়েছে। তার মধ্যে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ কিংবা রবীন্দ্রনাথের শিকড় রয়েছে। বাংলার মাটি রেনেসাঁসের মাটি, বারবার তা প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক তাগিদে এখানে ফেকুবাজি করলে কোনও লাভ হবে না। আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কালীগঞ্জের ভোটের ফল সেই ইঙ্গিতটাই আরও স্পষ্ট করে দিয়ে গেল। এই ইঙ্গিত দিয়ে গেল যে, তৃণমূলের দুর্গ অটুট। দ্বিতীয় স্থানের জন্য কামড়াকামড়ি লড়াই হবে বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোটের মধ্যে।
ইতিহাস বিকৃতির সর্বশেষ প্রমাণ ‘কেশরী চ্যাপ্টার টু’ ছবিটি। এই ছবিটি দেখলেই বোঝা যাবে, এঁরা আজ সবকিছু উল্টে দেওয়ার নেশায় খেলতে নেমেছেন। এ এক দীর্ঘমেয়াদি খেলা। এঁরা বিশ্বাস করেন, আজ যে কেশরী ছবিতে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে প্রতিবাদ হচ্ছে, সমালোচনা হচ্ছে, তা আগামী পঞ্চাশ বছর পরে থাকবে না। তখন প্রকৃত ক্ষুদিরামকে এঁরা বিস্মৃত করে দিয়ে ‘ক্ষুদিরাম সিং’ নামক এক কাল্পনিক চরিত্রকে বিশ্বস্ত করে তুলবেন। বারীন ঘোষদের মুছে ফেলা হবে। তাঁকে এই ছবিতে করা হয়েছে বীরেন্দ্র কুমার। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। এঁরা সেই চেষ্টাই চালাচ্ছেন, যাতে একদিন মানুষ বিশ্বাস করেন, এদেশের স্বাধীনতা এসেছে সাভারকরদের হাত ধরে, আমাদের দেশের স্বাধীনতা এসেছে হিন্দুত্ববাদী শক্তির লড়াইয়ের পথ ধরে। নাথুরামরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।
প্রোপাপান্ডা সবসময় চলে। প্রোপাগান্ডিস্ট হলে আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু কেউ যদি ইতিহাস বিকৃতি করেন, সত্যকে মিথ্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেন, সেটা গর্হিত অপরাধ। উৎপল দত্ত নাট্যকার হিসেবে প্রোপাগান্ডিস্ট ছিলেন। সে কথা তিনি বার বার বলতেন। নাট্যকর্মী হিসাবে সফদর হাসমি কিংবা চলচ্চিত্রকার হিসাবে মৃণাল সেন কিংবা ঋত্বিক ঘটক প্রোপাগান্ডিস্ট ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী একজন অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রোপাগান্ডিস্ট ছিলেন। কিন্তু তাঁরা কখনও তাঁদের শিল্পে বা সাহিত্যে মিথ্যার মাধ্যমে বা তথ্য বিকৃতির সাহায্য নিয়ে নিজের মতকে প্রচার করতে সচেষ্ট হননি। সত্যের মধ্য দিয়েই আরও একটা চাপা পড়া সত্যকে তাঁরা উদ্ধারের চেষ্টা করে গিয়েছেন।
একদিকে ভুল ইতিহাস শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের অন্ধকার যুগের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের মনের মধ্যে বৈষম্য ও হিংসার বীজ পুঁতে দেওয়া হচ্ছে। এখন অপেক্ষা শুধু বিষবৃক্ষের ফল বেরনোর। এই পথে চলতে গেলে সবথেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে শিক্ষা। তাই তাকে গোড়াতেই ছেঁটে ফেলার চেষ্টা চলছে। তাহলে আমরা কি সবাই অশিক্ষিতই থেকে যাব? অশিক্ষিত থাকলে বুঝি সরকারের সুবিধা হয়? ঠিকই তো, শিক্ষিত মানুষ চায় প্রশ্ন করে তার মনের কৌতূহল নিবারণ করতে। শিক্ষিত মন চায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে। অথচ তিনি কোনও প্রশ্ন শুনতে রাজি নন। তিনি শুধু ঝরঝর করে মন কি বাত বলে যান।
আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, এমন একদিন আসবে, যেদিন আমরা ইংরেজি বলতে লজ্জা পাব। ইংরেজিতে কথা বললে অবশ্যই লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু নিজের ভাষাটা ভালো করে জানা দরকার। ইংরেজি ভাষা আসলে আমার মতামতকে বিশ্বজনীন অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার একটা মাধ্যম মাত্র। সেটা কী এমন অন্যায় করল বোঝা গেল না! আসলে মানুষকে অশিক্ষিত করে রাখার প্রয়াস সব সময় শাসকের মধ্যে দেখা যায়। যে যত বেশি জানে, সে তত কম মানে। এই অমোঘ সত্যটা সব শাসক দল বিশ্বাস করে, বিজেপিও তার অন্যথা নয়। তাই তাদের বিশ্বাস, মানুষ যত কম জানে, তত বেশি মানে। তার মানে, সেই থিয়োরিতে শাসকের গদি ততই শক্তপোক্ত হয়। দেখা গিয়েছে, বিশ্বে সব স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরই এক রা। ইতিহাসের ধারায় এই বৈশিষ্ট্য একইভাবে চলে আসছে। কোথাও তার এতটুকু পরিবর্তন হয়নি।
শিক্ষা ব্যবস্থার মাজাটুকু ভেঙে দিতে পারলেই আশি শতাংশ কাজ হাসিল। সেই মাজা ভাঙার লক্ষ্যে দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। কাজ যে ভালোই চলছে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। কেননা প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্কুলে স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দশম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে ২০.৬ শতাংশ পড়ুয়া। সংখ্যার বিচারে প্রায় তিন কোটি পড়ুয়া আর পড়ায় আগ্রহ দেখায়নি।
আসলে এমন এক আর্থ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সেই পড়ুয়ার কাছে শিক্ষার থেকে কাজের প্রশ্ন অনেক বড় হয়ে উঠছে। ভেঙে পড়া অর্থনীতির দায় নিতে হচ্ছে ওই নাবালকদেরও। সংসারের হাঁ মেটাতে তাকে যে কোনওভাবে দু’টো পয়সা রোজগারের পিছনে ছুটতে হচ্ছে। এই ড্রপ আউটের হার সবথেকে খারাপ ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে। অসম, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান ছাড়াও এই তালিকায় আছে অন্ধ্রপ্রদেশে, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর। জাতীয় হারের তুলনায় এদের হার বেশি।
স্কুলছুট নিয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা করেছে সংস্থা। তারা দেখিয়েছে, এই স্কুলছুটের পিছনে রয়েছে বিশাল এক সামাজিক বৈষম্য এবং প্রতিকূলতা। কারণ হিসাবে তারা প্রথমেই রয়েছে দারিদ্র্য। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তাই লেখাপড়া শেখাটা বিলাসিতা মাত্র। খিদে মেটাতে পড়ুয়ারা চলে যাচ্ছে শ্রমের পথে। এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্রানাং শিশুশ্রমং তপঃ। পাশাপাশি দেশে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া রয়েছে শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি, স্বাস্থ্যসমস্যা, পারিবারিক জটিলতা, শিক্ষকদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার পরিকাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। আসলে শিক্ষা আর অর্থনীতি এই দু’টোকে দুর্বল করে দিলেই মানুষ অসহায়ভাবে প্রভুত্ব মেনে নেয়। কিন্তু বারবার দেখা গিয়েছে, এই অবস্থা থেকেই মানুষ সরকার বদলের স্বপ্ন নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। তার জন্য লড়াই করতে লাগে না, দড়ি ধরে টান মারতেও লাগে না। একটি বোতাম টিপলেই পরিস্থিতি বদলে যায়, ঘুচে যায় অন্ধকার।