প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে ‘সাফল্য’ কী? সাদা চোখে যা স্বাভাবিক, মোদি চলেন ঠিক তার উল্টো পথে। আর এগারো বছর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে থাকা মোদির হয়তো দর্শন হল, তাঁর সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতার ফল ভোগ করুক আম জনতা। কিন্তু নিজের নামমাহাত্ম্য প্রচারে তাঁকে দেশের প্রাক্তন সব প্রধানমন্ত্রীকে ছাপিয়ে যেতে হবে। ঘটনা হল, গত এক দশকে সরকারি প্রকল্প থেকে শুরু করে যেকোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব দাবি করে সরকারি অর্থে যথেচ্ছ প্রচার চালানো হয়েছে। আর আত্মপ্রচারে তো কোনও উপলক্ষ দরকার। তাই উরি, পুলওয়ামা, পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় সেনা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যে সাফল্য পেয়েছে, তার কৃতিত্বও মোদির বলে প্রচার চালিয়েছে শাসকগোষ্ঠী। ভারতের চন্দ্রযান চাঁদের মাটি ছুঁয়েছে, সেখানেও প্রচারের মুখ সেই মোদি। আবার করোনা ভ্যাকসিনের শংসাপত্রেও গুঁজে দেওয়া হয়েছে তাঁর মুখ। রেশনের ব্যাগ বা কোনও প্রকল্পে মোদির মুখ দেওয়া ছবি দেখে দেশের মানুষ হতবাক হলেও তিনি থেকেছেন নির্বিকার। এখন চলছে একইসঙ্গে মোদি সরকারের এগারো বছরের পূর্তি (২০১৪-২০২৫) এবং তৃতীয় মোদি সরকারের প্রথম বর্ষ পূর্তির প্রচার। গত কয়েকদিন ধরেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেবা-প্রশাসন-গরিব কল্যাণের নামে মোদির প্রচার শুরু হয়েছে। সেই প্রচারে ‘সাফল্য’ দেখাতে যা তুলে ধরা হচ্ছে, তা অনেকাংশেই অর্ধসত্য। এই ধরনের একতরফা প্রচারের সুবিধা হল, কোথাও কোনও জবাবদিহি করার দায় ও দায়িত্ব থাকে না। বিস্ময়ের হলেও সত্যি যে, প্রধানমন্ত্রীর দিনযাপনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত প্রচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘মোদি সরকার’ বলেই বেশি প্রচার করে গেরুয়াবাহিনী। অথচ এই প্রধানমন্ত্রী গত এগারো বছরে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে সেভাবে সাংবাদিক সম্মেলনই করেননি। তিনি সর্বদল বৈঠকেও হাজির থাকেন না, সংসদে বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান। কারণ তাহলেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাতে সাদা কালোর পার্থক্য সামনে চলে আসবে। হয়তো সত্য ধামাচাপা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সচেতন মোদি তাই নিজের ঢাক নিজে পেটানোর কাজেই মেতে আছেন!
এগারো বছরের সাফল্য হিসেবে যে তোলপাড় প্রচার শুরু হয়েছে, তার ছত্রে ছত্রে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের উল্লেখ করে সরকার দেখাতে চাইছে, তাতে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কত মানুষ উপকৃত হবেন ইত্যাদি। কিন্তু সেইসব প্রকল্পে কত টাকা সত্যিই খরচ হয়েছে, কত মানুষ প্রকৃত অর্থে সুবিধা ভোগ করছেন—তা বলছে না সরকার। যেমন উজ্জ্বলা প্রকল্প। দেশের ১০ কোটি গরিব পরিবারকে বিনামূল্যে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করছে সরকার। কিন্তু একটা গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর কত পরিবার অর্থের অভাবে আবারও কাঠ-পাতা-কয়লার আগুনে রান্না করার পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে গিয়েছে সেই তথ্য প্রকাশ্যে আনছে না সরকার। ধরা যাক, জাপানকে পিছনে ফেলে ভারতের চতুর্থ অর্থনীতির দেশ হয়ে ওঠার প্রচারের কথা। বিপুল জনসংখ্যার কারণেই যে এটা হওয়া স্বাভাবিক তা বলছে না সরকার। মাথাপিছু আয়ে ভারত যে জাপানের চেয়ে বহু পিছনে রয়েছে তাও চেপে যাচ্ছে সরকার। বলা হচ্ছে, কৃষকের জন্য বিপুল অর্থ খরচের কথাও। বাস্তব হল, মোদি জমানায় একটি কৃষক পরিবারে বার্ষিক আয়ের উপর ৬০ শতাংশ ঋণের বোঝা চেপেছে। কৃষকের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আজও ঘোষিত হয়নি। কৃষকের আত্মহত্যা বেড়েছে। কৃষিঋণে জর্জরিত কৃষকের সংখ্যা বেড়ে ১০ কোটিতে পৌঁছেছে। একইভাবে রাস্তা থেকে পানীয় জল, বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ থেকে রেল সংযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাফল্যের যে দাবি করা হয়েছে তার বেশিটাই হয় মনগড়া অথবা অর্ধেক গ্লাস ভর্তি থাকার মতো।
আসলে সাফল্যের ফানুস ওড়ানো নয়, শাসকের উচিত ছিল সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো। যে দেশে একটি নিরামিষ থালির খরচ ৭৭ টাকা সে দেশে কেন একজন সবচেয়ে গরিব মানুষের দৈনিক খরচ মাত্র ৬৮ টাকা? কেন কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের অংশ গ্রহণের হার অর্ধেক? কেন ২০১৬ সালে নোটবন্দি ঘোষণার পরেও কালো টাকা ফেরানো গেল না? কেন এগারো বছরে দশ বার আমেরিকা যেতে পারলেও মোদি একবারও অশান্ত মণিপুরে গেলেন না? কেন দেশের ১৩ কোটি মানুষের দিনে ১৮৫ টাকার বেশি খরচ করার সামর্থ্য নেই? কেন আন্তর্জাতিক বৈষম্যসূচকে ভারতের স্থান ১০৮ তম? কেন বহু মানুষ পরিস্রুত পানীয় জল পান না? দুর্নীতির বিরুদ্ধে মোদির চোয়াল শক্ত করা অনেক বক্তৃতা শুনেছেন দেশের মানুষ। তথ্য বলছে, গত দশ বছরে এমপি, এমএলএ, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ১৯৩টি মামলা করেছে ইডি। এর মধ্যে মাত্র ২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রতি এক হাজার মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ৭ জনের। এমন অজস্র ব্যর্থতার টুকরো টুকরো ছবি ছড়িয়ে রয়েছে গত এগারো বছরে। তবুও ৫৬ ইঞ্চি ছাতির ‘অহং’ প্রচারে বিরাম নেই।