মানুষ একটি স্থলচর প্রাণী। কিন্তু তার বিচরণের জন্য চোখের সামনে রয়েছে আরও দুটি ক্ষেত্র—জল এবং আকাশ। এই দুই ক্ষেত্রেও কিছু প্রাণী বিচরণ করে। ব্যাং, হাঁস, কুমিরসহ কিছু প্রাণী উভচর—তারা জল, স্থল দুই স্থানেই অনায়াসে বিচরণ করতে সক্ষম। কিন্তু পাখিসহ একাধিক প্রাণী আবার খেচর বা আকাশচারী হলেও প্রয়োজনে জল এবং স্থলও অতিক্রম করতে পারে সহজে। এত ধরনের প্রাণীকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করার পর মানুষেরও ইচ্ছে হয় জল এবং আকাশেও সে অবাধে বিচরণ করবে। জলে সাঁতার কাটার অভ্যাস মানুষের আদ্যিকালের। কিন্তু আকাশে বিচরণের কী হবে? কীভাবে এই বাধা অতিক্রম করবে সে? তাই প্রতিটি মানুষ একসময় স্বপ্নেই বিচরণ করেছে আকাশে। কবির কল্পনায় সাদা সাদা মেঘ হয়েছে তার কাহিনির নায়ক নায়িকার দূত—মেঘদূত। আর রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনিকে আশ্রয় করেছে। সেখানে রক্তমাংসের মানুষের আকাশে পাড়ি জমানোর কত না রোমহর্ষক অধ্যায়! সেসব আমাদের আনন্দ দিয়েছে, প্রাণিত করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চায় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একদিন সত্যিই সত্যিই আবিষ্কার করে ফেলেছে গগনযান—উড়োজাহাজ।
পুরাণ-রূপকথার আবেশ এবং বিমান আবিষ্কারের মধ্যবর্তী পর্যায়ে মানুষ আকাশকে ছুঁয়ে দেখার জন্য সঙ্গী মেনেছে যাকে তার নাম ঘুড়ি। ঘুড়ি একটি সহজলভ্য খেলনা—সারা পৃথিবীর নানা বয়সি মানুষের মন কেড়ে নিয়েছে যুগ যুগ ধরে। আমরা জানি, অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকেও জাদু করেছিল ঘুড়ি। ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতেই তিনি আকাশের বিদ্যুতের সত্যাসত্য, তাকে মানুষের কল্যাণের ব্যবহারের সূত্র আবিষ্কার করেন। এছাড়া নির্ভেজাল প্রমোদ উপকরণ হিসেবে ঘুড়ির জনপ্রিয়তা আজ বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এমন একটি ‘নিরীহ’ খেলনাই আজ প্রাণঘাতী ‘অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে নানা জায়গায়। তার মধ্যে রয়েছে আমাদের কলকাতাসহ সারা বাংলাও। বিশ্বকর্মা পুজো, সরস্বতী পুজো এবং মকর সংক্রান্তির সময় প্রায় সারা দেশেই ঘুড়ি ওড়ানোর চাহিদা বেড়ে যায়। কোনও কোনও স্থানে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসবের চেহারা পর্যন্ত নেয়। আকাশে রং-বেরঙের ঘুড়ির মেলা তখন। এরাজ্যে পেটকাটি আর চাঁদিয়ালের তুমুল যুদ্ধ বেধে যায়। তাতেই মাতোয়ারা হয় আট থেকে আশি। বুধবার, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বারাকপুরে মোহনপুর এলাকার এই উৎসবমুখর পরিবেশই মুহূর্তে বদলে গেল বিষাদে। সেখানকার বাসিন্দা এক প্রাক্তন সেনাকর্মীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে গেল! ঘুড়ির চীনা মাঞ্জার সুতো প্রাণ কেড়ে নিল তাঁর। এদিন দুপুরে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের লাইটপোস্টে ঝুলে ছিল চীনা মাঞ্জার ধারালো ঘুড়ির সুতো। তাতেই ঘটে গিয়েছে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। গৌতম ঘোষ নামে ওই যুবক সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে কলকাতা এয়ারপোর্টে চাকরি করতেন। অন্যান্য দিনের মতো এদিনও তিনি কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে মোটরবাইক চালিয়ে কর্মস্থল এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলেন। রহড়া থানার তুলসিকাঁটা এলাকায় রাস্তার ধারের লাইটপোস্ট থেকে একটি কাটা ঘুড়ি ঝুলছিল। দুপুর দেড়টা নাগাদ ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় ওই ঘুড়ির চীনা মাঞ্জার সুতোয় তাঁর গলা কেটে যায়। তিনি বাইক থেকে ছিটকে গিয়ে মিনিট দশেক রাস্তাতেই পড়েছিলেন। পরে বাসিন্দারা তাঁকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাঁকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণই তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে জানান ডাক্তার।
এই ঘটনায় এলাকায় একইসঙ্গে বিস্ময়, শোক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এই দুর্ভাগ্য মোটেই নতুন নয়। গত কয়েকবছরে এরাজ্যের কলকাতা এবং শহরতলিসহ নানা স্থানেই বহু মানুষ এমন বিপদে পড়েছেন। সমস্যাটি রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের কারও আজানা নয়। তাই চীনা মাঞ্জার ব্যবহার আগেই ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছিল। চীনা মাঞ্জার সুতো বিক্রি বন্ধে ঘুড়ির বাজারগুলিতে নজরদারি করা হবে বলেও বারবার দাবি করেছিল প্রশাসন। কিন্তু তারপরেও একের পর এক দুর্ঘটনা বলে দিচ্ছে, কথা রাখছে না কেউ। রয়ে গিয়েছে গোড়ায় গলদ। এই গলদ কিন্তু কারও পক্ষেই স্বস্তির নয়। আমরা জানি, নিরাপদ নয় পুলিশও। মোটরাবাইক চালিয়ে পুলিশ অফিসারদেরও দিনরাত চলাফেরা করতে হয়। ইএম বাইপাস সংযোগকারী মা ফ্লাইওভারসহ একাধিক স্থানে পুলিশকেও বারবার চীনা মাঞ্জার বিপদে পড়তে দেখা গিয়েছে। সাধারণ মানুষের বিপদ তো আছেই। তাই সতর্ক হওয়া খুব জরুরি। চীনা মাঞ্জার সঙ্গে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত রাস্তার উপর দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোও। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনা বৃদ্ধি। তবে আসল গলদ গোড়ায়—কলকাতা এবং শহরতলিসহ সারা দেশেই আকাশ চুরি গিয়েছে পাইকারি হারে। মাঠ ময়দান প্রতিদিন হ্রস্ব হচ্ছে। তাই প্রিয় ঘুড়ি লাটাই হাতে খোলা ছাদে, ব্যস্ত রাস্তাতেই নানা বয়সি মানুষের ভিড় বাড়ছে। আমাদের সরকার কি পারবে আকাশ চুরি ঠেকাতে এবং কিছু মাঠ ময়দান ফিরিয়ে দিতে?