Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একদলীয় শাসনের দিকে যাত্রা গণতন্ত্রের সর্বনাশ!

উন্নয়নের মঞ্চ, মেট্রোর উদ্বোধন, সেনার বাহাদুরি সবই আজ ক্ষমতা দখলের সোপান নরেন্দ্র মোদির কাছে। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে যাঁকে বদলে দেওয়ার আহ্বান জানালেন, তিনিই যাবতীয় বরাদ্দ অনুমোদন করে মেট্রো পথে কলকাতার উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম জুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রেলমন্ত্রী থাকার সময়।

একদলীয় শাসনের দিকে যাত্রা গণতন্ত্রের সর্বনাশ!
  • ২৪ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: উন্নয়নের মঞ্চ, মেট্রোর উদ্বোধন, সেনার বাহাদুরি সবই আজ ক্ষমতা দখলের সোপান নরেন্দ্র মোদির কাছে। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে যাঁকে বদলে দেওয়ার আহ্বান জানালেন, তিনিই যাবতীয় বরাদ্দ অনুমোদন করে মেট্রো পথে কলকাতার উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম জুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রেলমন্ত্রী থাকার সময়। সেসব প্রায় দেড় দশক আগের ঘটনা। আজকের মুখ্যমন্ত্রী তখন বাংলার আগুনে বিরোধী নেত্রী। সেদিন মোদির পূর্বসূরিরাই মমতার দিকে তাকিয়ে থাকতেন বাংলাকে বাম শাসন মুক্ত করার তাগিদে। বাজপেয়ি, আদবানি, যোশি....। সময় বদলেছে। মোদি জমানার রাজনীতির ওঠাপড়া ন্যূনতম সৌজন্যটুকুকেও কাছে ঘেঁষতে দেয় না। নানা অজুহাতে এক বছরেরও বেশি ঝুলিয়ে রেখে এখন বিধানসভা নির্বাচনের মুখে এ রাজ্যে মেট্রো প্রকল্পের উদ্বোধন ভোটের দামামা বাজাতেই! উন্নয়ন ঘিরে ক্ষমতা দখলের এমন নিম্নরুচির কুনাট্য বাংলাকে ভালোবেসে না স্রেফ ভোট কিনতে, এ প্রশ্ন উঠবেই। সরকারি মঞ্চ থেকে উদ্বোধন আর পাশের রাজনৈতিক স্টেজ থেকে বাংলায় পরিবর্তনের ডাক! একদা সঙ্ঘ প্রচারক রাষ্ট্রনেতার মুখে কতটা শোভন? বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বুঝিয়ে দিলেন, ভোট আসছে বলেই প্রতি মাসে একবার দু’বার এসে তিনি ভোট ভিক্ষা এবং ইনিয়ে বিনিয়ে রাজ্য সরকারের মুণ্ডপাত করবেন। কোভিডের সময় একবারও আসার সময় হয়নি। সামনে নির্বাচন তাই হালে এলেন তিনবার। কেউ এটাকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি আখ্যা দিলেও আসলে নির্বাচন স্পেশাল! ভোট গেলেই আর এদিকে যে তিনি পা বাড়াবেন না, জানে সবাই। সঙ্ঘের অনেক স্বপ্নকে ছুঁয়েও তাঁর অপূর্ণ, না পাওয়ার তালিকায় রয়ে গিয়েছে বাংলায় পদ্ম ফোটানোর ব্যর্থ প্রয়াস। উনিশ, একুশ, চব্বিশের বিপর্যয় বড্ড বড় করে বাজছে বুকে। ছাব্বিশে শেষ সুযোগ! ফসল ফলানো কঠিন জেনেও বারংবার আসা জমি কতটা উর্বর হল তা মাপতে! সার দিচ্ছেন, জল দিচ্ছেন, কিন্তু কাঁটা গাছের ঝোপ ছাড়া কিছুই তো ফলছে না গেরুয়া বাগানে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ দখলের ধনুর্ভাঙা পণ করে বসে আছেন রাজনৈতিক সমাপতনের নাছোড় নায়ক!

Advertisement

এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন গণতন্ত্রকে ঘুম পাড়িয়ে দেশকে একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে যাওয়া। সেই পথে যে বাধাগুলো পঁচাত্তর বছর বয়সে পদার্পণের মুহূর্তে তাঁকে ঘুমোতে দেয় না তার একটি নাম নিশ্চিতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একে একে সাংবিধানিক সংস্থাগুলি তাঁর রক্তচক্ষুর সামনে তাৎপর্য হারিয়ে ধূসর অ্যানিমিয়া রোগী। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে ভোট পরিচালনায় মন দেওয়ার পরিবর্তে বিরোধী নেতৃত্বকেই শাসাচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে। কার প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে? তদন্ত সংস্থা সিবিআই, ইডি, আয়কর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে বিরোধীদের জেলে পোরার মরিয়া অভিযানে পরিণত করেছে। একতরফা ৩০ দিন জেলে থাকলেই জনতার রায়ে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিনা বিচারে ঘ্যাচাং ফু করার আয়োজন বিরোধী শক্তিকে টেনে শূন্যে নামিয়ে আনতেই! দু’শো অভিযোগ বিচার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। উচ্চ আদালতের রায়কেও প্রভাবিত করছে দেশের সরকার, বলছে যুযুধান প্রতিপক্ষ! দেশজুড়ে গেরুয়া সর্বস্ব একতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সর্বাগ্রে বাধা মমতার তৃণমূল। পিছনে নেহরু-গান্ধীর ক্ষীণবল কংগ্রেস। একটু দূরে তামিলনাড়ুর ডিএমকে এবং আর সামান্য কিছু ছোট ছোট দল। বিহারে নীতীশের দল বিজেপি’র কোলে। দেশের সবচেয়ে ধনী মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবুও সেই পথেরই পথিক। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণের হাজার হাজার অভিযোগ সত্ত্বেও মমতার লড়াকু ভাবমূর্তিকে এখনও ভাঙতে ব্যর্থ বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার। তাই আবার সঙ্ঘ ও বিজেপি’র কোমর বাঁধা শুরু। সাতমাস গেলেই বাংলার জনমত যাচাই। মমতা হার্ডলটা পেরলেই একদিকে যেমন বাংলার ‘দু’বিঘা জমি’ হাতের মুঠোয় এসে যাবে তেমনি উপেনরাও বেমালুম ভ্যানিশ! দেশজুড়ে ডাবল ইঞ্জিনের বৃত্তও সম্পূর্ণ হওয়ার আশা জাগবে। মোদিজি একবার কেন, দশবার কেন, একশোবারও আসতে তৈরি। আপাতত ৭৫ পেরিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। চমক ধমকের রাজনীতি বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তাই নির্বাচন কমিশনকে খুল্লামখুল্লা কাজে লাগানো ক্ষমতা দখলের নির্ণায়ক লড়াইয়ে! এসআইআরের মাধ্যমে খেলা শুরু ভোটার তালিকা থেকেই। বিহারে ৬৫ লক্ষ মানুষ খসড়া তালিকায় নেই। বাংলায় লক্ষ্য, সওয়া এক কোটি নাম বাদ দেওয়া। তালিকা নিয়ে ঘুরছেন গেরুয়া নেতারা। প্রশ্ন একটাই নির্বাচন কমিশন বশংবদ হয়ে গেলে গণতন্ত্রকে জল হাওয়া সার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে কোন শক্তি!
আজ এই ক্রান্তিকালে বড্ড মনে পড়ছে টি এন সেশন সাহেবকে। দেশের দশম নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তাঁর দৌলতেই দেশের মানুষ জেনেছিল, নির্বাচন কমিশনেরও একটা শক্ত শিরদাঁড়া হয়। সরকারের আজ্ঞাবাহী নয়, আলাদা একটা অস্তিত্ব আছে তার। ১৯৫৫ ব্যাচের তামিলনাড়ু ক্যাডারের আইএএস অফিসার। ১৯৮৯ সালে ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অবসরের পর ১৯৯০ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ’৯৬ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন শুধু নয়, বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সংস্থার স্বাধীন ভূমিকা কেমন হতে পারে। সরকারের সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে দেশজুড়ে ঝড় তুলেছিলেন। এমনকী তৎকালীন কেন্দ্রের আইনমন্ত্রী এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের নির্দেশ অমান্য করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তারই ফলশ্রুতি আজকের সচিত্র ভোটার কার্ড, যা চালু হয়েছিল সেশন সাহেবেরই আমলে ১৯৯৩ সালে। ভোটার কার্ডের আজ ৩২ বছর হয়ে গিয়েছে। আজ এসআইআর করতে গিয়ে নতুন রূপে সামনে আসা নির্বাচন কমিশন বলছে ভোটার কার্ড নাকি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আধার নিয়েও বিস্তর টালবাহানা চলছে। শেষে অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট আধারকে মান্যতা দেওয়ায় নাম বাদ যাওয়ারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। কিন্তু এই আঘাত বারে বারে নেমে আসবে। আরও সংগঠিতভাবে নেমে আসবে। চ্যালেঞ্জটা এখানেই। এই জন্যই প্রতিবাদী, রুখে দাঁড়ানো বিরোধী রাজ্য সরকারকে নিকেশ করার এত আয়োজন বিজেপির।
সেদিনের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আজ বিস্তর ফারাক। আগে যেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ভার ছিল প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাঁধে, তা এখন চলে গিয়েছে সরকারের হাতেই। এই ভয়টাই পেয়েছিলেন বি আর আম্বেদকর ও তাঁর সতীর্থরা। নির্বাচন কমিশনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করবে দেশের সরকার। ‘It is quite possible that some party in power who wants to win the next election may appoint a staunch party man as chief commissioner.’ একসপ্তাহ আগেই আমরা স্বাধীনতার ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস পালন করেছি। কিন্তু আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কারণ আম্বেদকরদের আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন অনুগত সংস্থায় পরিণত হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক। 
বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অমিত শাহর ঘনিষ্ঠ বলে দিল্লির ক্ষমতার বৃত্তে অনেক দিন ধরেই চর্চিত। তার হয়তো একটা কারণ, তিনি অমিত শাহর মন্ত্রকের সচিব ছিলেন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার হয়। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। রামলালা মূর্তি নির্বাচনের বিচারকমণ্ডলীরও সদস্যও ছিলেন তিনি। এমনকী জ্ঞানেশ কুমারের পরিবার কী ধরনের সুবিধা ভোগ করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। কিন্তু সাধারণের ভয় এই কমিশনের হাতে দেশের ভোট প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ থাকবে তো! বিহারে খসড়া তালিকায় ৬৫ লক্ষের নাম বাদ পড়েছে। এখন আধার কার্ড জমা দিয়ে বাদ পড়াদের কতজন নিষ্কৃতি পাবেন, তা সময়ই বলবে। বিহারের পরই বাংলার পালা। ভয়টা এখানেই।
আঘাতটা কিন্তু আর একমাত্রিক নয়। সব অর্থেই এবার বহুমাত্রিক। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তির বিধান আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় নেই। তাহলে কোন সংবিধানের জোরে ট্রায়াল শুরুর আগেই একজন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চেয়ার হারাবেন? এবং তা করা হবে কেন্দ্রের শাসকদলের অনুগত রাজ্যপালের মাধ্যমে। উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। এ আইন কার্যকর হলে বিধানসভা ভোটের অনেক আগেই শিবু সোরেন-পুত্র হেমন্ত কিংবা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে চেয়ার হারাতে হতো। এ রাজ্যে বঙ্গ বিজেপি’র জমিদাররা প্রায়শই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অবস্থাকে ‘পুলিস স্টেট’ বলে মুচকি হাসেন। তাঁদের বলি, বিচারের আগেই মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীদের পদ কেড়ে নেওয়া কীসের ইঙ্গিত? বিরোধী শাসিত রাজ্যের সরকারকে উল্টে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র নয়? এক কথায় পুলিসসর্বস্ব শাসন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া। এই আইন আম্বেদকরের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সম্পূর্ণ বিরোধী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে কঠিন ও কঠোর আইন সময়ের দাবি। কিন্তু বেছে বেছে বিরোধীদের টার্গেট করে দেশে একদলীয় শাসন কায়েমের ষড়যন্ত্রকে কোনওমতে সমর্থন করা যায় না। কিছুদিন আগেই জরুরি অবস্থার অর্ধশতক উদযাপন করা হয়েছে। তার আগে বাবাসাহেব আম্বেদকরকে স্মরণ করে সংবিধান দিবসও পালিত হয়েছে সংসদের অন্দরে। অথচ  পদে পদে বিরোধীদের কোণঠাসা করা এবং স্বাধীন গণতান্ত্রিক মতামতের টুঁটি চেপে ধরতে কোনও শাসকই পিছপা হন না। ইন্দিরা গান্ধী যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে করেছেন ৫০ বছর আগে, আজ সেই একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে শুধু মুখোশটা বদলে। এক দেশ এক নির্বাচন থেকে শুরু করে ৩০ দিন জেলে থাকলেই মুখ্যমন্ত্রীর অপসারণ এবং রাজ্যপালকে প্রভূত ক্ষমতা প্রদান বহুদলীয় শাসন কাঠামো ভেঙে একদলীয় শাসনের দিকে যাত্রারই ইঙ্গিতবাহী। এত বেশি ক্ষমতা যদি একটি ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় তাহলে বলতেই হবে একশো বছর নয় তার অনেক আগেই আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, সাধারণতন্ত্র এবং সর্বোপরি মুক্ত চেতনার গণতন্ত্রের টিকে থাকার পক্ষে এক সঙ্কটকাল উপস্থিত হতে চলেছে। কাঠামো ধ্বংস হওয়ার অর্থ সংবিধানের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়া। বাংলা দখল নয়, শুধু মমতাকে সরানোই নয়, সুচারুরূপে এই সংবিধান দখলের কাজটাই সম্পন্ন করতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদি। এক দেশ এক নির্বাচনের আড়ালে এক দেশ এক দলের প্রতিষ্ঠা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ