পি চিদম্বরম: আমি নিশ্চিত, আপনি আপনার জীবনে এমন কিছু ঘটনার কথা মনে করেন যখন আপনি চেয়েছেন যে কেউ আপনাকে একা ছেড়ে দিয়ে চলে যাবেন, কিন্তু তিনি আপনাকে বাধিত করবেন না। যাঁরা আপনার সঙ্গে লেগে থাকেন তাঁদের বলা হয় ‘লিম্পেট’ (এক ধরনের শামুক)। আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চাইবেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান কিন্তু মিস্টার ট্রাম্প তাঁকে বাধিত করবেন না।
মনে হচ্ছে, গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একটি ‘স্টেকহোল্ডার’ বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন। তিনি যখনই কথা বলেন বা লেখেন, তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি একজন ‘স্টেকহোল্ডার’। এখন পর্যন্ত ‘নীরবতাই’ নরেন্দ্র মোদির উত্তর। আমার সন্দেহ হয় যে মোদিজি বিভ্রান্ত এবং ‘আবকি বার, ট্রাম্প সরকার’ (হিউস্টন, সেপ্টেম্বর ২০১৯) ডাক দিয়েছিলেন যে দিনটিতে তার জন্য তিনি আজ অনুতপ্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে জিতেছেন এবং আরও সাড়ে তিন বছরের জন্য হোয়াইট হাউসে তিনি বহাল আছেন।
২২ এপ্রিল অন্য নেতাদের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিস্ময় প্রকাশসহ ঘটনার নিন্দা করেন। ২৫ এপ্রিল তিনি বলেছিলেন যে, দুই দেশ ‘কোনও না কোনওভাবে এটি খুঁজে বের করবে।’ ভারত প্রতিশোধ নিতে ৭ মে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে পাকিস্তানের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেও স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার কোনও ইচ্ছা ভারতের নেই। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন ‘আমি এটাই আশা করব যে, এই সংঘাতের খুব দ্রুত অবসান হবে।’ যুদ্ধ পরদিনও অব্যাহত থাকায় তিনি প্রস্তাব দেন যে, ‘এবং যদি সাহায্য করার ব্যাপারে আমি কিছু করতে পারি, আমি সেখানে থাকব।’ এই সমস্ত বিবৃতি অবশ্যই যথাযথ ছিল।
হতবাক ও কৌতূহলজনক
৮/৯ মে রাতে কিছু পরিবর্তন দেখা গেল। আমার সন্দেহ হয় যে, চীনের তৈরি সামরিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুরস্কে তৈরি ড্রোন পাকিস্তান মোতায়েন করেছে, এমনটা আবিষ্কার হয়ে থাকবে। আমাদের জন্য ভারতীয় সামরিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বার্তা ছিল যে, পাকিস্তানের সমস্ত ধরনের আক্রমণকে ভারত রুখে দিয়েছে। যদিও দিন দুই পরে ভারতের তরফেও কিছু ‘ক্ষতি’ স্বীকার করা হয়। যুদ্ধে, অনিবার্যভাবেই উভয় পক্ষের কিছু ক্ষতি হয়ে থাকে। ভারতকে অবশ্য তেমন উদ্বিগ্ন বলে মনে হয়নি। ভারতীয় জনগণের মনেও কোনও উদ্বেগ ছিল না। উদ্বেগের সৃষ্টি হল তখন, ১০ মে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া সাইট, ট্রুথ সোশ্যাল-এ যখন একটি টুইট করা হল। সেদিন বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ রাতের আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘এই ঘোষণা করতে পেরে আনন্দিত যে ভারত ও পাকিস্তান অবিলম্বে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে (ফুল অ্যান্ড ইমিডিয়েট সিজফায়ার) সম্মত হয়েছে। দুই দেশকেই অভিনন্দন জানাচ্ছি...।’ কয়েক মিনিট পরে মার্কিন বিদেশ সচিব টুইট করেন যে, ভারত ও পাকিস্তান একটি ‘নিরপেক্ষ স্থানে’ আলোচনার জন্য মিলিত হবে। মিডিয়া রিপোর্ট করেছে যে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্স আগের রাতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টেলিফোনে কথাবার্তার সময়ে কিছু ‘আতঙ্কজনক গোপন তথ্য’ শেয়ার করেছেন।
অন্তত বলতে গেলে, এই টুইটগুলি ছিল আকর্ষণীয় এবং হতবাক করে দেওয়ার মতো।
১০ মে সন্ধ্যা ৬টায় ভারতের বিদেশ সচিব নিশ্চিত করেন যে বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে দুই দেশের ডিজিএমও’দের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বিকেল ৫টা থেকে। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অতএব, তথ্যের ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুল কিছু বলেননি। আমি খুশি যে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছে। তারা সাফল্যও অর্জন করেছে অনেকখানি। এবং, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
লাঠি ও গাজর
১২ মে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে, তিনি একটি ‘পারমাণবিক সংঘাত’ থামিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর হুঁশিয়ারির মতোই তিনি যোগ করেন, ‘আসুন, এটা বন্ধ করি। যদি আপনি এটা বন্ধ করেন, আমরা
বাণিজ্য করব। আর আপনি এটি যদি বন্ধ না করেন, আমরা কোনও বাণিজ্য করব না।’ (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরব এবং কাতার সফরে গিয়েও তাঁর এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।) ১৩ মে নরেন্দ্র মোদি ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি অনুসারে ঘোষণা করেন যে, ভারত কোনও ‘পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের’ সামনে ঝুঁকবে না।
আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপর আস্থা রাখব এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরকারের তরফে গৃহীত যেকোনও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপকে সমর্থন করব। তবে সরকারকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হবে। গণতন্ত্রে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা জনগণের অধিকার।
প্রশ্ন ও উত্তর
কিছু বৈধ প্রশ্ন হল:
১. থ্রি-পয়েন্ট ফর্মুলা বা তিন দফা সূত্রের মধ্যে ‘নতুনত্ব’ কিছু নেই: সন্ত্রাসবাদী হামলার যথাযথ জবাব দেওয়া হবে; পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল সহ্য করা হবে না; এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ (স্টেট টেররিজম) এবং সন্ত্রাসবাদের মূল পরিকল্পনাকারীদের (মাস্টারমাইন্ডস অফ টেররিজম) মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। নরেন্দ্র মোদি কি সুপ্রতিষ্ঠিত মতবাদের নীচে কেবল একটি মোটা লাল রেখা টেনে দেননি?
২. যুদ্ধবিরতি নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স এবং মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও কি ৮ ও ৯ মে ভারতের সঙ্গে কথা বলেছিলেন? যদি তাঁরা একই তারিখে পাকিস্তানের সঙ্গেও কথা বলে থাকেন তাহলে কি তা মধ্যস্থতা হিসেবে গণ্য হবে না?
৩. জে ডি ভ্যান্স কি গত ৯ মে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ‘আতঙ্কজনক গোপন তথ্য’ শেয়ার করেছিলেন? পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পাকিস্তানি হুমকি সম্পর্কে ‘ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘গোয়েন্দা তথ্য’ ছিল কি? যদি না-হয়, তাহলে কেন প্রধানমন্ত্রী (১২ মে) এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী (১৫ মে) পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের কথা উল্লেখ করলেন?
৪. বিকেল ৩টে ৩৫ মিনিটে দুই দেশের ডিজিএমও’র মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে জানতে পারলেন এবং বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে তাঁর টুইটে তিনি তা ঘোষণাও করে দিলেন?
৫. ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল শুল্ক যুদ্ধ শুরু করার পর, ভারত কি তার পাল্টা প্রস্তাব পাঠায়নি? জে ডি ভান্স কি তাঁর ভারত সফরকালে মোদিজির সঙ্গে ‘বাণিজ্য চুক্তি’র বিষয়টি উত্থাপন করেননি? (সূত্র: টাইমস অফ ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস)
৬. যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা এবং বাণিজ্যকে
ব্যবহার করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার যে
উপর্যুপরি দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন, ভারত কি তার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনও
প্রতিবাদ জানিয়েছে?
৭. পাকিস্তানকে আইএমএফ লোন প্রোগ্রাম বিষয়ে ভারত কেন ভোটদানে বিরত ছিল এবং কেন তার বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি?
আরও কিছু প্রশ্ন আছে, কিন্তু সেগুলো উত্থাপনের সময় বা স্থান এটা নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প অদম্য, তিনি চলে যাবেন না, তিনি বিব্রতকর বক্তব্য রাখবেন এবং এমন প্রচুর তথ্য দেবেন যা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকবে। আমরা কি সেসবের জবাব পাব, নাকি নীরবতাই হবে উত্তর?


