নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: জগদ্ধাত্রী পুজো বাংলার কোথায় আগে শুরু হয়েছিল আর কোথায় পরে, এনিয়ে চর্চা বিস্তর। এই চর্চা ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, জগদ্ধাত্রী পুজো একটি শহরের আত্মার আত্মীয়, পরিচয় চিহ্ন বহন করছে। সেটি চন্দননগর। সাবেক ফরাসি কলোনিতে জগদ্ধাত্রী পুজো তার নিজস্ব পরিচয়কে ফি বছর নতুন করে মেলে ধরে। তেমনই আত্মার উদ্বোধনকে ঘিরে থাকে বৈভবের অনন্ত প্রকাশ। সেই বৈভবের ছটা ফুটে বের হয় পুজোমণ্ডপ থেকে আলো, প্রতিমার দীর্ঘ গড়ন থেকে মোহন রূপে। থিমের বিপুল পসরা সেই বৈভব প্রকাশেরই একটি ভিন্ন মাধ্যম। ফলে, থিমের দাপট চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর শিরা উপশিরায় মিশে গিয়েছে।
চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর বয়স কত, তা নিয়েও নানা চর্চা আছে। কিন্তু ৭৬ বছর ধরে খলিসানি সর্বজনীন যে জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করছে, তার ইতিহাস খোদিত। ৭৭ বছরে পা দেওয়া চন্দননগরের অন্যতম বর্ধিষ্ণু পুজোর এবারের থিম ‘দৃষ্টিকোণ’। মূলত, রঙের মেলা। রঙের আভাসকে কেমন করে দেখে মানুষ বা রং কীভাবে মনকে নির্দিষ্ট ভাবনায় চালিত করে, তাকে ঘিরেই থিমের আধার। নানা রঙের মিশেলে এক অনন্য রংধনুর পসরা সাজিয়ে বসেছে খলিসানি। আদ্যন্ত লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি মণ্ডপ কার্যত রঙের বাগান। যেখানে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে রং। আর রং আছে যখন, তখন তুলি বা ব্রাশ থাকাটাও বাধ্যতামূলক। সেই আয়োজনও আছে খলিসানির মণ্ডপে। একটি বৃহৎ ব্রাশের কাঠামো সহ একাধিক ব্রাশ, বিভিন্ন রঙের কৌটো সহ নানা উপাদানে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। গড়ে উঠেছে রংবাহার। আছে সাত রঙে রাঙানো রামধনুও। ক্লাব কর্তা নিতাইচন্দ্র দাস বলেন, কিছুটা মূর্ত আর কিছুটা অমূর্তের মেলবন্ধনে আমাদের মণ্ডপসজ্জা হয়েছে। রঙের ভাষা খুঁজে দেখতে চাইলে দর্শকদের আমাদের রংবাগানে আসতেই হবে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, খলিসানির প্রতিমা ডাকের সাজে সাজবে। সেই সাজেও থাকবে বাহারি রং। এমনিতেই খলিসানির প্রতিমা দীর্ঘকায়। তাতে চালচিত্র জুড়ল প্রায় ২৯ ফুট উচ্চতা হয়ে যায়। আর থাকছে আলোকসজ্জার অভিনব আয়োজন। সেখানেও থিম, রংবাহার। খলিসানির মতোই বৃহৎ প্রতিমার তালিকায় থাকে চন্দননগরের বেশোহাটা। সেখানকার প্রতিমা চালচিত্র বা সাজ সহ প্রায় ৩৬ ফুট দীর্ঘ। বেশোহাটায় মা জগদ্ধাত্রীর মুকুট রুপো দিয়ে তৈরি। সাবেক ধাঁচার প্রতিমার অঙ্গসজ্জাও বাহারি। এখানে আলোকসজ্জায় বিশেষ আকর্ষণ থাকবে। তবে সেই আকর্ষণকে থিমের সঙ্গে জুড়ে দেখতে হবে। কী থিম বেশোহাটার? চন্দননগর। হ্যাঁ, সাবেক চন্দননগর, ফরাসি চন্দননগরের ইতিহাসকেই তুলে ধরে থিম সাজিয়েছে বেশোহাটা। এখানে মণ্ডপে ঢুকতে হবে ফরাসি-ইংরেজ দ্বৈরথের সময়কার চন্দননগর গেট বা প্রবেশ তোরণ দিয়ে। কাগজ, খড়, হাতে আঁকা ছবি, মডেল সহ নানা উপকরণে ইতিহাসের ধারাকথন দেখা যাবে এই মণ্ডপে। পুজোর উদ্যোক্তা সুদীপ দাস বলেন, অতীতের চন্দননগরকে আমরা তুলে ধরছি। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, পুরনো প্রজন্মের স্মৃতিচারণ হবে। আলোর বাহার আর দেবীর অনবদ্য সাজ সেই আকর্ষণকে বাড়িয়ে দেবে।
অতীতের চন্দননগর নয়, বর্তমানের চন্দননগরের সেজে ওঠাটাই পুজো মরশুমে প্রাসঙ্গিক। সেই প্রসঙ্গকেই নানা সাজে সাজিয়ে তুলে ধরছে থিম। উৎসব নগরী হয়ে উঠছে গঙ্গাপাড়ের ঐতিহাসিক জনপদ।