Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

হেস্টিংস-ফিলিপের গুলির লড়াই, এখনও গল্প শোনায় কলকাতার ডুয়েল অ্যাভিনিউ

১৭৮০ সালের ১৭ আগস্টের ভোরবেলা। আকাশে মেঘ। রাতে ঝেঁপে বৃষ্টি হয়েছে বলে বেশ ঠান্ডা। কলকাতায় তখন প্রচুর গাছ

হেস্টিংস-ফিলিপের গুলির লড়াই, এখনও গল্প শোনায় কলকাতার ডুয়েল অ্যাভিনিউ
  • ৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: কলকাতায় সেই বিখ্যাত ‘ডুয়েল’টি কোথায় হয়েছিল? যেখানে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস আর স্যার ফ্রান্সিস ফিলিপ দু’জনে দু’জনকে গুলি ছুড়েছিলেন? বনেদি দুই ব্রিটিশ পুরুষের দ্বন্দ্বযুদ্ধ কাঁপিয়ে দিয়েছিল কলকাতা এমনকী ইংল্যান্ডকেও। ক্রমে লোকমুখে সে রাস্তার নামই হয়ে যায় ‘ডুয়েল অ্যাভিনিউ’। কিন্তু সেই রাস্তা কলকাতার কোথায়?

Advertisement

১৭৮০ সালের ১৭ আগস্টের ভোরবেলা। আকাশে মেঘ। রাতে ঝেঁপে বৃষ্টি হয়েছে বলে বেশ ঠান্ডা। কলকাতায় তখন প্রচুর গাছ। ওই রাস্তাটিও তো গাছে প্রায় ঢাকা। সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ একগাদা পাখির কিচিরমিচির। স্যার ফ্লান্সিস ফিলিপ বন্দুকটা একবার কক করলেন। আর একবার পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, বারুদ নেতিয়ে গিয়েছে। পাল্টে অন্য একটি পিস্তল নিলেন ‘সেকেন্ড’ কর্নেল ওয়াটসনের হাত থেকে। ওয়াটসন তখন বাংলার চিফ ইঞ্জিনিয়ার। হেস্টিংস এলেন পাক্কা আধঘণ্টা দেরিতে। তাঁর সেকেন্ড বললেন, এখন সাড়ে ৫টাই বাজে। হয়তো আপনাদের ঘড়ি ভুল সময় দিচ্ছে। গুলির লড়াই শুরুর আগেই স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করে দিলেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস। রমাপদ চৌধুরী সম্পাদিত ‘অচেনা এই কলকাতা’ বইয়ে এ লড়াইয়ের বিবরণ লিখেছিলেন সনাতন পাঠক। সেই লেখা অনুযায়ী...  
‘হেস্টিংস খুব শান্ত, তাঁর মুখে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছায়া। সকলে ইলাইজা ইম্পের বাড়ির দিকে এগুতে লাগলেন। পথে, মাঠের মধ্যে বটগাছের তলায় ফাঁকা জায়গা দেখে সেটাই পছন্দ হল। সে সময় বিলেতে ফক্স আর অ্যাডামসের মধ্যে বিখ্যাত দ্বন্দ্ব যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধের নিয়মকানুনই মেনে চলতে রাজি হলেন দু’পক্ষ। চোদ্দ পা দূরে লাইনে দাঁড়াতে হবে—হেষ্টিংস বললেন, বড় দূর, গুলি ঠিক লাগবে না। তারপর সংখ্যা গুণে (নির্দিষ্ট দূরত্ব হেঁটে), দুজনেই নিয়ম মেনে গুলি ছুড়লেন। স্যর ফ্রান্সিস হাঁটু দুমড়ে পড়ে গেলেন...।’
এরপর রাস্তাটি হয়ে উঠল ‘ডুয়েল স্ট্রিট’। তিষ্ঠ... রাস্তাটি নেই। বটগাছটিও নেই। তবে ডুয়েল অ্যাভিনিউ ঠিকানাটি বিলক্ষণ আছে। আলিপুর চিড়িয়াখানার অদূরে আবহাওয়া দপ্তরের অফিস। ঠিকানা লেখা 
বোর্ডে এখনও জ্বলজ্বল করে, ‘রিজিওনাল মেটিওরোলোজিক্যাল সেন্টার, ৪ ডুয়েল অ্যাভিনিউ, আলিপুর, কলকাতা ৭০০০২৭’। আবহাওয়া অফিসের বর্তমান অধিকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এই ঠিকানায় চিঠি আসে। তবে সংখ্যায় অনেকটাই কম। সবাই এখন আলিপুরের আবহাওয়া দপ্তর বলেই জায়গাটি চেনেন। তবে নথিতে অফিসের ঠিকানা ডুয়েল অ্যাভিনিউই আছে।’
কিন্তু কেন হয়েছিল এই ডুয়েল? ফ্রান্সিস ফিলিপ কলকাতায় জাহাজ থেকে নামার পর ২১ তোপধ্বনি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৭ বার তোপ দাগা হয়। ফ্রান্সিস ভাবলেন, এই অপমানের নেপথ্যে আছেন হেস্টিংস। তারপর হেস্টিংসের যুদ্ধনীতির সমালোচনা শুরু করলেন। দু’জনের দূরত্ব বাড়তে শুরু করল। কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতলেন অবশ্য হেস্টিংস। কাউন্সিলের বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ফিলিপের চরিত্র নিয়েও তুললেন প্রশ্ন। তারপরই দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান ফিলিপের। আহ্বান সাদরে গ্রহণ হেস্টিংসের।
মাটিতে লুটিয়ে পড়তে পড়তে স্যার ফিলিপ বললেন, ‘আই অ্যাম আ ডেড ম্যান।’ হেস্টিংস প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘গুড্‌ গড, আই হোপ নট।’ কপাল জোরে ফ্রান্সিস প্রাণে বেঁচে যান। ফিরে যান বিলেতে। তবে সেই ঐতিহাসিক বৈরিতা দু’জনের জীবদ্দশায় কোনওদিনই শেষ হয়নি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ