তন্ময় মল্লিক: নির্বাচন এলেই ধূম পড়ে শিলান্যাসের। বাম আমলেও নির্বাচনের মুখে শিলান্যাসের হিড়িক পড়ত। তবে, অধিকাংশ প্রকল্পই মাথা তুলত না। রাজ্যের ক্ষমতা বদলালেও শিলান্যাসের ট্র্যাডিশন বদলায়নি। ছাব্বিশে বাংলা দখলের ভোট। স্বাভাবিক নিয়মেই নানান প্রকল্পের শিলান্যাস হবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ধমানের প্রশাসনিক সভায় এসে বহু প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন। দুই বর্ধমান জেলার জন্য ৭৫০কোটি টাকা। পাশাপাশি উদ্বোধনও করেছেন বহু প্রকল্পের। তার অর্থমূল্য ৮৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির থেকেও বাস্তবায়িত প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণ বেশি। এমন নজির ভূ-ভারতে নেই বলাটা অত্যুক্তি মনে হতেই পারে। কিন্তু বিরল বলতে বাধা নেই। এত জনমুখী প্রকল্প কোনও রাজ্য সরকার চালু করেনি। তবুও ভোট এলেই কেন তৃণমূল সুপ্রিমোকে গোটা রাজ্যে ছুটতে হয়? কেন করতে হয় প্রাণপাত? অনেকে বলছেন, মমতা সরকারের পরিষেবার লাভের গুড় অনেকটাই সাবাড় করে দিচ্ছে তৃণমূলেরই কিছু ‘পিঁপড়ে’।
ছাব্বিশের নির্বাচন শুধু বাংলার রাজনীতিতে নয়, গোটা দেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্বাচনে বোঝা যাবে, বিজেপির প্রতিহিংসা ও বঞ্চনার রাজনীতির চাপের কাছে বাংলা আত্মসমর্পণ করল, নাকি ছুড়ে দিল পাল্টা চ্যালেঞ্জ। ছাব্বিশের নির্বাচন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এনেছে আরও একটা রেকর্ড গড়ার হাতছানি। ইতিমধ্যেই মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড তিনি করে ফেলেছেন। ছাব্বিশের নির্বাচনে জিতলে হবেন চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সেই রেকর্ড কত দশক অক্ষত থাকবে, সেটা গবেষণার বিষয় হতেই পারে। এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটের উপর দাঁড়িয়ে হতে চলেছে ছাব্বিশের নির্বাচন।
এই মুহূর্তে বাংলায় যা অবস্থা তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা কোনও বিরোধী দলের নেই। বড় কোনও অঘটন না ঘটলে ছাব্বিশে বাংলায় বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে জোট হবে। কিন্তু তাতেও তারা মুর্শিদাবাদ এবং মালদহ ছাড়া অন্য জেলায় কিছু করতে পারবে, সেই বিশ্বাস দলের নেতা কর্মীদের মধ্যেও নেই। একান্ত আলাপচারিতায় তাঁরা বলছেন, ‘এবার আর শূন্য হবে না। কয়েকটি সিট পাব।’ কিন্তু কোন কোন সিট জানতে চাইলেই চুপ। তবে একটা কথা ঠিক, অধীর চৌধুরী নিজে যদি বহরমপুর আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী হন তাহলে খেলা জমে যাবে।
রাজ্য সভাপতি পরিবর্তনের পর বঙ্গ বিজেপির অবস্থা হয়েছে আরও নড়বড়ে। দিলীপ ঘোষের সভাপতিত্বেই এ রাজ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। এখন তিনি শুধু কোণঠাসাই নন, কার্যত একঘরে। প্রধানমন্ত্রীর কোনও অনুষ্ঠানে ডাক পাচ্ছেন না। বঙ্গ বিজেপিতে দিলীপ ঘোষ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ায় আদিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। জেলা কমিটি ঘোষণার পর সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়েছে। জঙ্গলমহলের বহু দলীয় পার্টি অফিসের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমনকী দলীয় নেতার বাড়িতে ঘটছে হামলার ঘটনা, হচ্ছে এফআইআর। বিজেপির এক প্রবীণ নেতার তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘এই অবস্থা চলতে থাকলে ছাব্বিশে নোটায় ভোট বিগত সমস্ত নির্বাচনকে ছাপিয়ে যাবে।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘন ঘন বাংলায় আসছেন। শীতঘুমে থাকা কেন্দ্রীয় এজেন্সি ভোটের আগে আবার গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। শুরু হয়েছে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারি। তাতে বিজেপির লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। কারণ সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে, রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা বঙ্গ বিজেপির নেই। সেই কারণেই ভোটের মুখে ফের কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে সক্রিয় করেছে। উদ্দেশ্য রাজ্যের শাসক শিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি।
বিরোধীরা ছন্নছাড়া। ফলে রাজ্যের শাসক দলের মধ্যে বাড়ছে খেয়োখেয়ি। এই মুহূর্তে প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি ব্লকে একাধিক গোষ্ঠী। কোথাও জেলা সভাপতির সঙ্গে প্রাক্তনের, কোথাও জেলা সভাপতির সঙ্গে মন্ত্রীর দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্ব ব্লক থেকে অঞ্চলস্তরে যত নেমেছে ততই শাখা প্রশাখা বিস্তার করেছে। অধিকাংশ ব্লক সভাপতির সঙ্গেই সেই এলাকার বিধায়কের সম্পর্ক ভালো নয়। দ্বন্দ্ব কোনও নীতি বা আদর্শের নয়, স্বার্থের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিষেবার দৌলতে শাসকের ভিত যত শক্ত হচ্ছে, দলের নেতাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ততই তীব্র হচ্ছে। কারণ রাজনীতি তাঁদের কাছে সমাজসেবা নয়, পেশা। কিছু নেতার ব্যক্তিগত লোভের কারণেই বিরোধীরা তৃণমূল কংগ্রেসকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুযোগ পাচ্ছে।
সন্দেশখালি নিয়ে মিডিয়ার একাংশ বাংলাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছিল, একথা ঠিক। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্যি, শেখ শাজাহানদের শোষণ, অত্যাচার আকাশ ছুঁয়েছিল। জোর করে কম দামে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা, দাবি না মেটালে চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে দেওয়া, পছন্দের লোকদের কাছ থেকে ইট, বালি, সিমেন্ট না কিনলে বাড়ি করতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে আকছার। তাতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল বলেই তাদের বিরিয়ানি ছেড়ে খেতে হচ্ছে জেলের মোটা চালের ভাত।
একই ঘটনা ঘটেছে বর্ধমানের জামালপুরেও। সেখানেও তৃণমূলের এক নেতার বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভ দেখানোটা অবশ্যই পরিকল্পিত এবং সংগঠিত। তাতে দলেরই এক নেতার মদত রয়েছে। কিন্তু, অভিযোগগুলি তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্ষোভ ফুটে না বেরলেও মানুষ জানে, যে কোনও শহরে বহুতল তুলতে গেলে শাসক দলের কাউন্সিলার, চেয়ারম্যান, বিধায়ককে খুশি করতে হয়। হাত পাতলেই টাকা। বাড়ছে লোভ। কেউ কেউ আবার বহুতল নির্মাণ করতে গেলেই আস্ত একটা ফ্ল্যাট দাবি করে বসছে। এদের লোভের কাছে হার মানবে সর্বগ্রাসী আগুনও।
এই সমস্ত তথ্য যে খুব গোপনে জোগাড় করতে হয়, এমনটা নয়। সবাই জানে। জেলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদেরও কিছু অজানা নয়। তা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। কারণ ব্যবস্থা নিলেই উঠবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ। আর সেটা তুলবেন বিরোধী গোষ্ঠীর দাদা। আর অভিযুক্ত ব্লক বা জেলা সভাপতির কাছের লোক হলে তো কথাই নেই। সাত খুন মাফ। তখন মাছের গন্ধ ঢাকার জন্য শাকের বোঝার অভাব হয় না। তাছাড়া আরও একটা ভয় আছে। কী সেই ভয়? নিজের ছেলে পর হওয়ার ভয়। ব্যবস্থা নিলেই বসে পড়বে অন্য গোষ্ঠীর দাদার কোলে। তাই অবাধ প্রশ্রয়। কিন্তু বুঝতে পারছে না, দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষছে। ছোবলটা তাকেই খেতে হবে।
‘দাদা’দের হাত মাথায় থাকায় অনেকেই বেপরোয়া। কেউ দিচ্ছে ফোনে হুমকি, কেউ আবার হাত তুলছে সরকারি অফিসারের গায়ে। বিজ্ঞানের যুগে কিছুই চাপা থাকছে না। ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। সব ঘটনার অ্যাকশন হচ্ছে, এমনটা নয়। কিন্তু সহযোগী সংস্থার হাত ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে যথাস্থানে। তার ভিত্তিতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জেলা নেতাদের বৈঠকে চলছে ‘তুমুল ঝাড়’। কেউ ট্যাঁ-ফোঁ করলেই শুনতে হচ্ছে ব্যক্তিগত ফাইল খোলার হুমকি। তাতেই জোঁকের মুখে পড়ছে নুন।
দলীয় নেতাদের উপর বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল উমপুনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সময়। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় এত জল মেশানো হয়েছিল যে সংশোধন করতে পুলিস প্রশাসনকে কাজে লাগাতে হয়েছিল। আবাস যোজনার তালিকা তৈরির সময়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভরসা করেছিলেন প্রশাসনের উপরেই। তাতে সবটা নির্ভুল হয়েছে, বলা না গেলেও অভিযোগের পরিমাণ অনেকটাই কমেছে। সরকারি সুযোগ সাধারণ মানুষের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই শুরু হয়েছে ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’। এভাবেই নেতাদের মাতব্বরির নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন। তিনি জানেন, নেতাদের মুরুব্বির রাস্তাটা ছোট করে দিলেই ঘর ভরে উঠবে সামাজিক প্রকল্পের ফসলে।
জমিতে কেউ আগাছা চাষ করে না। তবুও আগাছা জন্মায়। আগাছা জমিতে বোনা ফসলের চেয়ে বেশি বাড়ে। ফসলের জন্য দেওয়া জল, সার, খোল আছাগাই বেশি খায়। তাতে ফলন মার খায়।
ভালো ফলন পেতে গেলে দিতে হয় নিড়েন।
উপড়ে ফেলতে হয় আগাছা। রাজনীতির মাঠে না চাইলেও ‘আগাছা’ জন্মায়। ক্ষমতায় থাকলে সার, খোলের জোগান অফুরন্ত। বাংলাতে সেটাই ঘটছে। তাই এখনই দিতে হবে একটা ‘নিড়েন’। তাহলেই সামাজিক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারবে তৃণমূল।