সারা বছর ধরে মন দিয়ে পড়াশোনা করা একজন ভালো রাজনীতিককে পরীক্ষার ‘জুজু’ দেখিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই রাজনীতিকের কাছ থেকে উপযুক্ত জবাব পেলেও প্রধানমন্ত্রীর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি! সংসদীয় ব্যবস্থায় বিশ্বাসী যেকোনও দলের পাখির চোখ হল ভোট রাজনীতি। এটাই বাস্তব। প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি ভোট ও আসন পেয়ে ক্ষমতা দখল করা অনেকটা মোক্ষলাভের মতো। এ খেলার লড়াই তাই অনেকটা ‘যুদ্ধে’র মতো। পরিচিত ভাষায়, ভোটযুদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা দখলের সেই ভোট হতে বছরখানেক বাকি। কিন্তু টানা চারদিন ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর হাত ধরে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের জঙ্গি ও বায়ুসেনা ঘাঁটি কার্যত হেলায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেই কৃতিত্বকে প্রধানমন্ত্রীর ‘সাফল্য’ বলে বিজেপি প্রচারও শুরু করে দিয়েছে দেশজুড়ে। বৃহস্পতিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য বঙ্গ সফরে এসে সুকৌশলে সেই প্রচারের সঙ্গে মমতার সরকারকে পঞ্চবাণে বিদ্ধ করে রাজ্য বিজেপির জন্য ভোটযুদ্ধের ‘আবহসঙ্গীত’ শুনিয়ে যান মোদি। এতেই আগুনে ঘি পড়ে। আগামী বছর কোন মাসে ভোট হবে তা কেউ জানে না। কিন্তু সারা বছর পড়াশোনা করা, এক্ষেত্রে জনগণের জন্য কাজ করা নেত্রী যে পরীক্ষাকে ভয় পান না তা বুঝিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদিকে প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরে তিনি জানিয়ে দেন, ‘দম থাকলে বলুন, কালকেই ভোট হোক। আমরা তৈরি, বাংলা তৈরি...। মনে রাখবেন, বাংলা কোনওদিন বিজেপি’র হাতে যাবে না।’ মমতার চ্যালেঞ্জ নম্বর দুই ছিল, ‘টেলিভিশন চ্যানেলে মুখোমুখি বসুন। বোঝা যাবে, কে কত কাজ করেছে।’
প্রশ্নটা নীতিগত। প্রশ্ন ঔচিত্যের। রাজ্য বা কেন্দ্রের ভোট হলে যুযুধান সব পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে বাক্যবাণের গোলাগুলি চালাবে, এর মধ্যে ‘সত্য-মিথ্যায়’ ঠাসা বারুদ থাকবে, প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নপূরণের ফোয়ারা ছুটবে—এটাই দেখতে অভ্যস্ত মানুষ। ‘অপারেশন সিন্দুরের’ সাফল্য, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, পাকিস্তান নিয়ে দেশের বিদেশনীতির হয়ে একজোটে ব্যাট করতে কেন্দ্রের প্রস্তাব মেনে যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘ভারতীয় প্রতিনিধি’ হিসাবে কূটনৈতিক সফর করছেন বিরোধী দলের সাংসদরাও, তখন রাজ্যে এসে সেই বিষয় নিয়েই যেন কোনও দলীয় নেতার ভাষায় কথা বলছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী! এটা কি একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শোভন? সঙ্গত প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। অপারেশন সিন্দুরের সাফল্য যে ভারতীয় সেনার, তা মন থেকে বিশ্বাস করেন দেশের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষ। কিন্তু একমাত্র বিজেপির বিশ্বাস ও প্রচার হল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই সাফল্য এসেছে। অর্থাৎ, ‘ক্রেডিট গোজ টু...’। উরি, বালাকোটের স্মৃতি টেনে আনলে এমনটাই যে হবে—তা অনেকেরই বিশ্বাস ছিল। মমতাও অভিযোগ করেন, ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে এই নাম দেওয়া হয়েছিল। ...সিন্দুরকে অসম্মান করছেন আপনি।’ কোটি কোটি ভারতবাসীর মতো মুখ্যমন্ত্রীও প্রশ্ন তুলেছেন, পহেলগাঁওয়ের আততায়ীরা এখনও কেন ধরা পড়ল না? আমেরিকা কিছু বললে এক সেকেন্ডে চুপ হয়ে যান কেন? ভোটের বাজারে প্রধানমন্ত্রী সিন্দুর বেচতে বেরিয়েছেন কি না সেই প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠেছে। ভাবার কোনও কারণ নেই, মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির কোনও শীর্ষস্থানীয় নেতা বা মন্ত্রী এইসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেবেন বা দিতে প্রস্তুত। যদিও এসব প্রশ্নের উত্তর মোটামুটি সকলেই আন্দাজ করতে পারে।
ভোটের রাজনীতিতে বিস্তর কাদা ছোড়াছুড়ি হবে। এটা প্রায় নিয়মের পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। সেই হিসাবে ২৯ মে মোদি-মমতার চাপানউতোর ‘সবে কলির সন্ধ্যা’ বলা যায়। বাস্তবটা হল, যত দিন গড়াবে, তরজায় ‘গোলা-গুলির’ সংখ্যা বাড়বে। অতীত বলছে, ভোট ঘোষণা হলেই মোদি, অমিত শাহ সহ দলের তাবৎ নেতামন্ত্রীরা রুগ্ন-অসমর্থ বঙ্গ বিজেপির শরীরে পুষ্টিকর খাদ্য জোগাতে ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করবেন। হিন্দুভোটের একাংশকে নির্ভর করে কত আসন জালে উঠবে, কর্মিবাহিনীকে চাঙ্গা করতে সেই সংখ্যাও তুড়ি মেরে হয়তো ঘোষণা করবেন নেতারা। বৃহস্পতিবারের সভায় সেই সুরটাই বেঁধে দিয়ে গেলেন মোদি। তাঁর চোখে, মমতা সরকারের আমলে পাঁচ দফা সঙ্কটে ধুঁকছে রাজ্য। হিংসা ও অরাজকতা, মা-বোনেদের নিরাপত্তা, তীব্র বেকারত্ব, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং গরিবের অধিকার কেড়ে নেওয়া। বাংলার সরকার ‘নির্মম’ বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নরেন্দ্র মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশটা চালান। তাই কোনও রাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আগে তাঁর নিজের দিকে তাকানোটা স্বাস্থ্যকর লক্ষণ। কিন্তু তা কি তিনি করলেন বা করেন? তাঁর জমানায় দেশ কি এসব সমস্যা থেকে মুক্ত? মমতার পাল্টা দাবি হল, এ রাজ্যে কোনও ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়ার বহু নজির আছে। কেন্দ্র বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কি তা হয়? সেখানে তো জেল খেটে বেরিয়ে আসা আসামিকে ফুল-মালায় বরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়! বলা যায়, আগামী প্রায় একবছর এমন অভিযোগ এবং তা ফালাফালা করার লড়াই জারি থাকবে। খেলা হবে, যা শুরু হয়েছে মাত্র।