মূলত অভাবের তাড়নায় স্কুলমুখী হচ্ছে না বহু ছেলেমেয়ে। অনেকে আবার স্কুলে ভর্তি হয়েও মাঝপথে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই ব্যাধি গত কয়েক দশক ধরে গোটা দেশেই জাঁকিয়ে বসেছে। একটা সময় এ রাজ্যের ছবিটাও ছিল তেমনই। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ধীরে ধীরে পরিস্থিতিটা যে বদলাতে শুরু করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যই তার প্রমাণ। গত সপ্তাহে এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানিয়েছেন, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিকে (প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি) বাংলায় কেউ স্কুলছুট নেই। অর্থাৎ স্কুলে ভর্তির পর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একজন পড়ুয়াও স্কুল ছেড়ে চলে যায়নি। একটা উন্নত সমাজ গড়তে হলে সেদেশের নাগরিকদের পড়াশোনার প্রাথমিক পাঠ দেওয়াই যে প্রধান কাজ হওয়া উচিত, সে কথা বলে গিয়েছেন জ্ঞানীগুণীরাই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন রাজ্যের সরকার সেই কথাকে শিরোধার্য করে সেভাবে পদক্ষেপই করেনি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ব্যতিক্রমী পথে হেঁটে যে সাফল্যের মুখ দেখেছে— তা কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যেই পরিষ্কার। আসলে এ রাজ্যে ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করা এবং তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একাধিক প্রকল্প চালু করেছে রাজ্য সরকার। যেমন, ছাত্রীদের জন্য কন্যাশ্রী, সকলের জন্য সবুজসাথী প্রকল্প ইত্যাদি। প্রথমটায় নগদ, দ্বিতীয়টিতে সাইকেল দেওয়া হয়। এছাড়া সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে ঐক্যশ্রী প্রকল্প। তফসিলি জাতির পড়ুয়াদের জন্য রয়েছে শিক্ষাশ্রী প্রকল্প। ওবিসির জন্য মেধাশ্রী প্রকল্প। প্রতি বছর রাজ্যের কয়েক কোটি পড়ুয়া এইসব প্রকল্প থেকে অর্থ সাহায্য পায়, যা গরিব, দুঃস্থ পরিবারগুলির কাছে শিক্ষায় আলোকিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চপ্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের বিনা পয়সায় বই, পোশাক, মিড ডে মিলের ব্যবস্থা তো রয়েছেই। ‘শূন্য স্কুলছুট’ তারই আদর্শ ফল। তবে রাজ্যে মাধ্যমিক স্তর, অর্থাৎ নবম দশমে যে স্কুলছুট এখনও শূন্য হয়নি তা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। এ ব্যাপারেও সরকারকে আরও ধ্যান দিতে হবে।
মুদ্রার অন্য দিকটি হল, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর ‘সুফল’ নিয়ে গোটা দেশে লম্বা-চওড়া ভাষণ শোনা গেলেও স্কুলছুট-এ এগিয়ে থাকার তালিকায় দেখা যাচ্ছে, সেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিরই জয়জয়কার। তালিকায় বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলি কার্যত তাদের ধারেকাছে নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুসারে প্রথম শ্রেণি থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুল শিক্ষার তিনটি স্তর মিলিয়ে স্কুলছুটের তালিকার প্রথম সারিতে রয়েছে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, আরএসএস-এর আশীর্বাদধন্য ডাবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার। রাজ্যগুলির নাম রাজস্থান, অসম, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, বিহার। এই হিসাব ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪—এই তিনটি অর্থবর্ষের। বাংলায় একমাত্র ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে নবম-দশম শ্রেণিতে স্কুলছুটের সংখ্যা ১৭.৮৫ শতাংশ। তবে এই তালিকাতেও পশ্চিমবঙ্গের আগে রয়েছে অসম, কর্ণাটক, মেঘালয়, গুজরাত, লাদাখ, অরুণাচল, সিকিম, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মণিপুর, ঝাড়খণ্ড। আবার কেন্দ্রের দেওয়া অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সারা দেশে স্কুলছুটের সংখ্যা ১১.৭০ লক্ষের বেশি। প্রথম উত্তরপ্রদেশ, তারপর রয়েছে ঝাড়খণ্ড ও অসম।
দেশে স্কুলছুটের মতো সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এক্ষেত্রেও এগিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি। গত বছরের মাঝামাঝি শিক্ষা দপ্তরের তরফে জানানো হয়, ২০১৪-১৫ সালে দেশে সরকারি স্কুল ছিল ১১ লক্ষের কিছু বেশি। ২০২৩-২৪-এ তা প্রায় ৯০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ লক্ষ ১৭ হাজারের মতো। অর্থাৎ সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমেছে ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, এই সময়ে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আবার ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফর্মেশন অন স্কুল এডুকেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষ থেকে পরের চার বছরে (২০২১-২২) দেশে সরকারি স্কুল বন্ধের সংখ্যা সাড়ে ৪ লক্ষের বেশি। এই বন্ধের তালিকায় প্রথম তিনটি রাজ্যের নাম উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশা। এই বন্ধ হওয়া স্কুলের বেশিরভাগ গ্রামীণ এলাকায়। এই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গেও কিছু স্কুল বন্ধ হয়েছে ঠিকই, তবে তার সংখ্যা অনেক কম। প্রশ্ন উঠেছে, এটাই কি তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘নতুন ভারত’-এর আসল ছবি? যেখানে সকলের জন্য শিক্ষার দরজা বন্ধ করে মুষ্টিমেয় একটা অংশের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে! সরকারি পাঠশালার দরজা বন্ধ করে আকাশছোঁয়া খরচের বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে! তাই প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষা কি তাহলে সকলের নয়, যার অর্থ আছে তার। না হলে সরকারি স্কুল বন্ধ হবে কেন? নতুন সরকারি স্কুল খোলার জন্য কোনও পরিকল্পনার দেখা নেই। তার বদলে কখনও পোশাক, কখনও ভাষা, কখনও সিলেবাস নিয়ে বিতর্ক উস্কে দিয়ে আসল সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আসলে মোদি সরকার চায় না দেশের সব অংশের মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে। কারণ মানুষ অশিক্ষিত থাকলে লাভ সরকারেরই। প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না তাদের।