ফের মুখ থুবড়ে পড়ল ‘মোদি ম্যাজিক’। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনেও মোদির পার্টি ব্যাকফুটে। ১-৪ গোলে পরাজিত হল বিজেপি। গত ১৯ জুন চার রাজ্যে বিধানসভার ৫টি আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার ফলাফল প্রকাশিত হল সোমবার। বিরোধীরা মোট ৪টি আসনে জয়ী হলেও বিজেপি জিতেছে মাত্র ১টি আসনে। ভোট নেওয়া হয় বাংলায় নদীয়ার কালীগঞ্জ আসনে। বাকি চারটি আসন হল—গুজরাতে কাদি ও বিসবদার, কেরলে নীলাম্বুর, পাঞ্জাবে লুধিয়ানা পশ্চিম। ফলাফল হয়েছে এইরকম: দুটি আসনে জিতেছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি বা আপ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে একটিতে। একটি পেয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। একটি আসনে জিতেছে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস সমর্থিত ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের অভিমত, এই গুরুত্বপূর্ণ খেলার রেজাল্ট—বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ৪ এবং শাসক বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ ১। ফলাফলের সংক্ষিপ্তসার এটাই।
ফলাফল বিশ্লেষণে যা বেরিয়ে আসছে তা মোদি-শাহদের জন্য মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। আপের দখলে এল গুজরাতের বিসবদার এবং পাঞ্জাবের লুধিয়ানা পশ্চিম। গুজরাতের কাদিতে জিতেছে বিজেপি। কেরলের নীলাম্বুরে জিতেছে কংগ্রেস। নদীয়ার কালীগঞ্জে জিতল তৃণমূল। কিছুদিন আগে দিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন কেজরিওয়াল। রাজধানীতে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত করেছে মোদি বাহিনী। এই মন্দার বাজারেও দুটি আসন ছিনিয়ে নিল কেজরির আপ। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোয় উঠে এসেছে গুজরাতের বিসবদার আসনটি। গত নির্বাচনেও আপ ওই আসনে জয়ী হয়। তবে সেই বিধায়ক ২০২৩ সালে ভোটারদের সঙ্গে বেইমানি করে বিজেপির ‘উন্নয়নে’ শামিল হন। উপনির্বাচনে এহেন চ্যালেঞ্জিং আসনেও গর্বের জয় হাসিল করলেন কেজরিওয়াল। তাঁদের সঙ্গে বেইমানির টাটকা প্রতিশোধ নিলেন ভোটাররা। এছাড়া পাঞ্জাবেরও একটি আসন ধরে রাখল কেজরির পার্টি। খুশি পাঞ্জাবের আপ ইনচার্জ মণীশ সিসোদিয়ার মতে, ‘এই জয় আসলে সেমি-ফাইনালে জয়। এখনও ফাইনাল ম্যাচ বাকি।’ বুঝতে বাকি থাকে না যে ২০২৭ সালে পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের কথাই মনে করালেন তিনি। তাঁর খুশির আরও কারণ, লুধিয়ানা পশ্চিম বিধানসভা আসনে আপ প্রতীকে লড়াই দেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সদস্য ও শিল্পপতি সঞ্জীব অরোরা। তাঁর কাছে পরাজিত হলেন ‘হাত’ প্রতীকের ভারতভূষণ আশু। জয়ের ব্যবধান হল ১০,৬৩৭ ভোটের। অন্যদিকে, কেরলের নীলাম্বুর বিধানসভা আসনটি বামেদের দখলমুক্ত করে ফেলল রাহুল-প্রিয়াঙ্কার দল। নীলাম্বুরে সিপিএম প্রার্থী এম স্বরাজকে হারালেন কংগ্রেসের আর্যদান শৌকথ। জয়ের পরে প্রিয়াঙ্কা এক্স-এ লেখেন, ‘আমরা একটা টিম হিসেবে কাজ করেছি, লক্ষ্য ছিল একটাই।’ অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে নদীয়ার কালীগঞ্জে জিতলেন তৃণমূলের আলিফা আহমেদ। ৫০,০৪৯ ভোটে তিনি পরাজিত করলেন বিজেপির আশিস ঘোষকে। কংগ্রেসের কাবিল উদ্দিন শেখ ও বিজেপির আশিস ঘোষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে। তবে চূড়ান্ত গণনায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বিজেপি।
সব মিলিয়ে এটাই পরিষ্কার হল যে, বাংলায় ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস তাদের জয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছে। ২০২১-এর পর থেকে বিরোধীরা হাজার কুৎসা করে এবং দিল্লিওয়ালারা বাংলার সঙ্গে বঞ্চনার রেকর্ড গড়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসম্মোহনী ক্ষমতায় একচুলও চিড় ধরাতে পারেনি। বিজেপির অপপ্রচার এবং ধর্মীয় মেরুকরণের ঘৃণ্য রাজনীতি ফের ব্যুমেরাং হয়েছে বাংলায়। গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় কালীগঞ্জে ৮,৭৪১ ভোট বেড়েছে তৃণমূলের। প্রদত্ত ভোটের ৫৫.১৫ শতাংশ তারা পেয়েছে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বিজেপি। সেই নিরিখে কালীগঞ্জ ছিল তাদের জন্য অ্যাসিড টেস্ট। সোমবার ২৩ রাউন্ড গণনা শেষে দেখা গেল, গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির ভোট কমেছে ১০,৫৩৫। এমনকী একুশের তুলনায় পদ্মপার্টির ভোট কমেছে ২.৬২ শতাংশ। কালীগঞ্জে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ছিলেন বামফ্রন্ট সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থীও। ১৫.২১ শতাংশ ভোট পেলেও জামানত গিয়েছে কংগ্রেস-বামের। অন্যদিকে সকল বর্ণ, ধর্ম এবং শ্রেণির মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকেই অকুণ্ঠ আশীর্বাদ করেছেন। তৃণমূল সুপ্রিমো তাঁদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশসহ এক্স-এ লিখেছেন, ‘জনগণই এই জয়ের স্থপতি। কালীগঞ্জে এই জয় নিশ্চিত করার জন্য আমার সমস্ত সহকর্মী তাঁদের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই।’ অন্তত বঙ্গ বিজেপি এর থেকে কোনও শিক্ষা নেবে কি? তাদের এখনও বোঝা উচিত, কোনও ভেলকি দিয়ে কারও পক্ষেই বাংলা দখল সম্ভব নয়। এজন্য তিনটি জিনিস জরুরি—সাংগঠনিক শক্তি, বাংলার উন্নয়নে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ এবং সম্প্রীতির নীতিতে আস্থা।